সমুদ্রের তলদেশে হেঁটে বেড়ায় যে মাছ

তারা সাধারণত ছোট মাছ, চিংড়ি এবং কখনো কখনো অন্য ফ্রগফিশও খায়। তাদের পেট প্রসারিত হতে পারে, তাই নিজের সমান এমনকি নিজের চেয়েও বড় শিকারও গিলে ফেলতে পারে।
স্টার অনলাইন ডেস্ক

সাধারণত মাছ মানে আমরা ভাবি, পানিতে সাঁতার কাটবে, ভেসে বেড়াবে। তবে মাছের কিছু প্রজাতি হেঁটে বেড়াতে বেশি পছন্দ করে। এমনই একদল মাছ হলো ফ্রগফিশ। যারা সমুদ্রের তলদেশে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ায়।

ফ্রগফিশ কী

ফ্রগফিশ হলো লোফিফর্মিস বর্গের সদস্য, গভীর সমুদ্রের অ্যাংলারফিশও এই একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রজুড়ে প্রায় ৫০টি ফ্রগফিশ প্রজাতি পাওয়া যায়। তারা নানা ধরনের সামুদ্রিক পরিবেশে বাস করে। প্রবালপ্রাচীর ও পাথুরে জায়গা তাদের পছন্দ। এসব এলাকায় তারা ছদ্মবেশ ধারণ করে আশপাশের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
ফ্রগফিশ দেখতে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তাদের আকার ও চেহারার মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখা যায়।

ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রগফিশ কীভাবে হাঁটে

ফ্রগফিশ তাদের বুকের ও পেটের পাখনা ব্যবহার করে হাঁটে। এই পাখনাগুলোতে অনেক পেশি আছে এবং এগুলো হাত ও পায়ের মতো কাজ করে। এমনকি হাঁটু বা কনুইয়ের মতো বাঁকতেও পারে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিজ্ঞানী হান্না বলেন, তাদের জোড়ায় জোড়ায় দুই সেট পাখনা আছে, যা অনেকটা পায়ের মতো কাজ করে। তারা বড় পেক্টোরাল বা বুকের পাখনা এবং একটু ছোট পেলভিক বা পেটের পাখনা বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে চলাফেরা করে।

তিনি আরও বলেন, তাদের হাঁটার দুইটি ভঙ্গি আছে। একটি সাধারণ হাঁটার মতো। আরেকটি ‘ক্রাচিং’, যেখানে বড় পেক্টোরাল পাখনা শরীরের বেশিরভাগ ওজন বহন করে। মাছটি এই পাখনাগুলো সামনে নিয়ে যায়, তারপর ছোট পেলভিক পাখনায় ভর স্থানান্তর করে, আবার বড় পাখনাগুলো ঘোরায়।

ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত

কিছু ফ্রগফিশ এই দুই ধরনের ভঙ্গি মিলিয়ে ব্যবহার করে। আবার কিছু প্রজাতি একই সঙ্গে হাঁটা ও সাঁতারের ভঙ্গিও ব্যবহার করে।

যখন ফ্রগফিশকে দ্রুত নড়তে হয় তখন ‘জেট প্রপালশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করে। এতে মুখে পানি টেনে নেয় এবং পেক্টোরাল পাখনার পেছনের ছোট গিলের ছিদ্র দিয়ে জোরে বের করে দেয়। ফলে ছোট ছোট লাফের মতো করে সামনে এগিয়ে যায়। বিশেষ করে শিকারির হাত থেকে বাঁচতে তারা এমন করে।

ফ্রগফিশ সাঁতারের চেয়ে হাঁটতে বেশি পছন্দ করে, কারণ তারা ‘অ্যাম্বুশ শিকারি’। তারা শিকারকে তাড়া করে না; বরং ছদ্মবেশে স্থির হয়ে থাকে এবং শিকার কাছে এলেই আক্রমণ করে।

ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রগফিশ ছদ্মবেশে কতটা দক্ষ

ফ্রগফিশের জন্য লুকিয়ে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা চায় শিকার নিজে থেকেই কাছে আসুক। আর এই কাজে তারা অসাধারণ দক্ষ। অনেক প্রজাতি শুধু রঙই নয়, শরীরের গঠনও বদলে আশপাশের সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি মিশে যেতে পারে।

যেমন ওয়ার্টি ফ্রগফিশ স্পঞ্জের মতো দেখাতে পারে। সারগাসাম ফ্রগফিশ ভাসমান সামুদ্রিক শৈবালের সঙ্গে মিশে থাকে, এমনকি স্রোতের সঙ্গে তার নড়াচড়াও অনুকরণ করে। লোমশ ফ্রগফিশ দেখতে শৈবাল বা সামুদ্রিক আবর্জনার মতো লাগে। কিছু ফ্রগফিশ দেখতে একেবারে সমুদ্রের স্পঞ্জের মতো, যেমন ইয়োলো ফ্রগফিশ।

হান্না বলেন, তাদের অদ্ভুত গঠনের জন্য ছদ্মবেশের ওস্তাদ। বিশেষ করে স্ট্রিয়েটেড বা লোমশ ফ্রগফিশ চার ধরনের আলাদা রঙে রূপ বদলাতে পারে। পরিবেশ অনুযায়ী তারা কমলা হতে পারে, যেন প্রবালের মতো লাগে, আবার পুরো কালো হয়ে সি আর্চিনের মতোও দেখাতে পারে।

এই ছদ্মবেশ কেবল শিকার ধরতেই সাহায্য করে না, বরং শিকারিদের চোখ এড়াতেও সহায়তা করে।

ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রগফিশ কীভাবে শিকার করে

ফ্রগফিশ শিকার ধরার জন্য ‘ইল্লিসিয়াম’ ব্যবহার করে। এটি মূলত ডরসাল স্পাইন, যা মাছ ধরার ছিপের মতো কাজ করে। এর মাথায় থাকে ‘এসকা’ নামে মাংসল টোপ, যা দেখতে শিকারের খাবারের মতো। দেখতে অনেক সময় কেঁচো, চিংড়ি বা ছোট মাছের মতো লাগে। শিকার এই টোপে আকৃষ্ট হয়ে কাছে আসে।

হান্না বলেন, ইল্লিসিয়াম মূলত একটি পাখনা। এটি মাছ ধরার ছিপের দণ্ডের মতো কাজ করে এবং এর মাথায় থাকে এসকা, যা টোপের মতো, এটি দেখতে কেঁচো, চিংড়ির মতো। ফ্রগফিশ এই অংশটি বিশেষভাবে নড়িয়ে শিকারকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে।

এই ইল্লিসিয়াম ও এসকা শিকারকে কাছে টেনে আনে।

ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রগফিশ। ছবি: সংগৃহীত

শিকার কাছে এলেই ফ্রগফিশ অবিশ্বাস্য দ্রুততায় আঘাত হানে, মাত্র প্রায় ছয় মিলিসেকেন্ডে তার মুখ খুলে যায়।

তারা সাধারণত ছোট মাছ, চিংড়ি এবং কখনো কখনো অন্য ফ্রগফিশও খায়। তাদের পেট প্রসারিত হতে পারে, তাই নিজের সমান এমনকি নিজের চেয়েও বড় শিকারও গিলে ফেলতে পারে।

হাঁটা মাছ শুনতে যেন সায়েন্স ফিকশনের গল্পের মতো লাগে। কিন্তু বাস্তবে এই অদ্ভুত প্রাণীগুলো হয়তো এখন সমুদ্রের তলদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই পরেরবার যখন সমুদ্রে যাবে একবার কল্পনা করো, ঢেউয়ের নিচে হয়তো আরও কত অজানা, অদ্ভুত প্রাণী লুকিয়ে আছে।