গল্প

যে মেয়েটি মেঘ ভাড়া দিত

dipu mahmud
দীপু মাহমুদ

শহরে অদ্ভুত এক দোকান আছে। ছোট্ট দোকান। সাইনবোর্ডে দোকানের নাম লেখা, মেঘেদের দোকান। ইশকুলে যাওয়া-আসার পথে তিশা অবাক হয়ে সেই দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাইনবোর্ডে দোকানের নামের নিচে লেখা, এখানে আজকের মেঘ ভাড়া দেওয়া হয়।

তিশা বুঝতে পারে না মেঘ কীভাবে ভাড়া হয়! সে কখনো কাউকে ওই দোকানে ঢুকতে দেখেনি।

একদিন ইশকুল থেকে ফেরার পথে তিশা সাহস করে মেঘেদের দোকানে ঢুকে পড়ল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই মনে হলো সেখানে কেমন যেন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। তাকের ওপর সারিসারি কাচের জারে ভরা মেঘ।

কোনোটা গোলাপি।
কোনোটা ধূসর।
কোনোটা দেখতে তুলোর মতো।

কাউন্টারের ওপাশে গম্ভীর মুখের মেয়ে বসে আছে। চোখে সোনালি রঙের গোল ফ্রেমের চশমা। তার বয়স বোঝা যাচ্ছে না। মাথার চুলগুলো ধবধবে সাদা। দেখে মনে হচ্ছে যেন রোদে ফিকে হয়ে গেছে।
তিশার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর চেহারার মেয়েটি অতিনরম গলায় জানতে চাইল, ‘কোন ধরনের মেঘ চায়?’

বিস্ময়ে হতভম্ব তিশা। তাহলে এরা সত্যি মেঘ ভাড়া দেয়! বলল, ‘মেঘ আবার ভাড়া হয় নাকি!’

মনে হলো মেয়েটি বিরক্ত হয়েছে। তার গলার আওয়াজ বদলে খরখরে হয়ে গেছে। সে বলল, ‘অবশ্যই হয়। সবাই মেঘ কিনতে পারে না বলে আমরা ভাড়া দিই।’

তিশার সামনে সোনালি ফ্রেমের চশমা পরা মেয়েটি মোটা একখানা খাতা খুলল। খাতার কভার টকটকে লাল কাপড় দিয়ে বাঁধানো। তার গলা আবার মোলায়েম শোনাচ্ছে। সে বলল, ‘কান্নার দিনের জন্য আলাদা মেঘ আছে। ঘুমের জন্য অন্য মেঘ। পরীক্ষা খারাপ হলে যে মেঘ লাগে, সেটাও আছে। তবে সেই মেঘ আজ নেই। স্টক আউট।’

মাথায় সাদা চুলের মেয়েটির কথা শুনে তিশা হেসে ফেলেছে। তবে মেয়েটি হাসল না। সে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি হাসির মেঘ নিতে এসেছ?’

তিশা একটু ভেবে বলল, ‘না… আমি অদৃশ্য হওয়ার মেঘ চাই।’

আচমকা আশপাশ শান্ত হয়ে গেল। ঘরটা চুপ হয়ে আছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। মেঝেতে পাখির পালক পড়লেও আওয়াজ শোনা যাবে এমন চুপচাপ।

সাদা চুলের মেয়েটি এবারই প্রথম তিশার দিকে ভালো করে তাকাল। তারপর আদর মেশানো গলায় বলল, ‘ইশকুলে আজ খারাপ দিন গেছে?’

তিশা কাঁধ ঝাঁকাল। আজ ক্লাসে সবাই তার আঁকা ছবি দেখে হাসাহাসি করেছে। কারণ সে আকাশ সবুজ রং করেছিল। ক্লাসের সবাই তার আঁকা ছবি দেখে হাসছিল আর বলছিল, ‘আকাশ কখনো সবুজ হয়?’

সোনালি ফ্রেমের চশমা পরা মেয়েটি ধীরে ধীরে নিচের তাকে হাত ঢুকিয়ে ছোট এক জার বের করে আনল। জারের ভেতরে একটুখানি কালো মেঘ ঘুরছে। মেয়েটি বলল, ‘এটা নাও। তবে সাবধানে খুলবে।’

তিশা জানতে চাইল, ‘এটার কাজ কী?’

মেয়েটি আগের মতো আদর মাখানো গলায় বলল, ‘এটা তোমাকে কিছু সময়ের জন্য অদৃশ্য করে দেবে।’

কথা শুনে তিশার চোখ গোল হয়ে গেল। হতবাক হয়ে বলল, ‘সত্যি?’

মাথায় সাদা ঘন কোঁকড়া চুলের মেয়েটি বলল, ‘মেঘ কখনো ভুল কথা বলে না।’

তিশা জারটা ব্যাগে ভরে নিয়ে বাসায় চলে এলো।

রাতের খাবার খেয়ে তিশা নিজের ঘরে এসে মেঘের জারের ঢাকনা খুলল। অমনি জার থেকে ফস করে এক টুকরো জমাট কালো মেঘ বের হয়ে এলো। জার থেকে কালো মেঘ বেরিয়ে এসে তিশার মাথার ওপর ভাসতে লাগল।

তখন তিশা তার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকাল। কী আশ্চর্য! আয়নায় তাকে দেখা যাচ্ছে না! তার মানে সে সত্যি অদৃশ্য হয়ে গেছে!

ঘটনা দেখে তিশা ভীষণ মজা পেয়েছে। সে চুপিচুপি রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলল। ফ্রিজ থেকে চকলেট নিয়ে খেলো। আইসক্রিম বের করে ভাইয়াকে ভয় দেখাল। ভাইয়া দেখল ফ্রিজের দরজা একা একাই খুলে যাচ্ছে, আবার একাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম শূন্যে ভেসে বের হয়ে এসে আবার ভাসতে ভাসতে ফ্রিজে ঢুকছে। ভাইয়া এত ভয় পেয়েছে যে, কাউকে কিছু বলল না। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।

তিশা তখন বাবার ফোন নিয়ে কিছুক্ষণ গেম খেলল। বাবা মনোযোগ দিয়ে টিভিতে নিউজ শুনছেন। তিনি কিছু খেয়াল করলেন না।

খানিক সময় পর তিশা থেমে গেল। সে বুঝতে পারছে কেউ তাকে খেয়াল করছে না। একদম না। মা পাশ দিয়ে চলে গেলেন। বাবা হাই তুলে সোফা থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে উঠে চলে গেলেন। ভাইয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এদিকওদিক তাকিয়ে টেলিভিশনে কার্টুন দেখছে। কেউ তিশাকে দেখল না, তিশার নাম ধরে ডাকল না।

তিশা হঠাৎ খুব একা লাগছে। তার কাছে কেউ নেই। মন খারাপ করে তিশা দৌড়ে ছাদে গেল। তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কালো মেঘও তিশার মাথার ওপর ভেসে ভেসে ছাদে গেছে।

ছাদে গিয়ে তিশা আরও অবাক! সেখানে সাদা চুলের মেয়েটি বসে আছে। যেন সে জানত তিশা আসবে।

সাদা চুলের মেয়েকে দেখে তিশা রাগ করে বলল, ‘তোমার মেঘ বিচ্ছিরি! আমি চাই না অমন মেঘ। তোমার মেঘ তুমি ফিরিয়ে নাও।’

এই প্রথম সাদা চুলের মেয়ের গম্ভীর মুখে হাসি দেখা গেল। সে হাসিমুখে বলল, ‘কেন, কী হয়েছে?’
ঠোঁট ফুলিয়ে তিশা বলল, ‘অদৃশ্য হওয়া মোটেও মজার নয়।’

সাদা চুলের মেয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘তুমি একদম ঠিক বলেছ। অদৃশ্য হওয়া মোটেই ভালো নয়। তবে বেশিরভাগ মানুষ সেটা দেরিতে বুঝতে পারে।’

বাতাসে ছোট কালো মেঘ উড়ছিল। তিশা আস্তে করে বলল, ‘তুমি কখনো অদৃশ্য হয়েছিলে?’

মেয়েটি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। খানিকক্ষণ পর বলল, ‘একবার। তারপর আর কেউ আমাকে দেখতে পায়নি। আমার নাম ধরে ডাকেনি।’

তিশা আর কিছু বলল না। সে শুধু ধীরে ধীরে তার মাথার ওপর ভেসে থাকা কালো মেঘের টুকরোকে আবার জারের ভেতর ভরল। আর ঠিক তখনই দূর থেকে মায়ের গলার আওয়াজ ভেসে এলো, ‘তিশা, কই তুমি, কোথায় গেলে?’

মায়ের ডাক শুনে তিশার মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর শব্দ নিজের নাম।

মা ছাদে এসেছেন। তিশাকে দেখে বললেন, ‘বাসার কোথাও তোমাকে না দেখে ঠিক বুঝেছি ছাদে এসেছ।’

তিশা মাকে জড়িয়ে ধরল। সে বুঝতে পারছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে আনন্দ হলো কাছে থাকা।