অন্তু ও রবির গল্প
একটা খেলনা দোকান খুলেছে অন্তু। সঙ্গে আছে রবি। অন্তুর ছোটভাই। রবিকে নিয়ে খেলতে একটুও ভালো লাগে না অন্তুর। লাগবে কী করে বলো! ঠিক মতো দৌড়াতেই তো পারে না। কেবল পেছনে পড়ে যায়। তারপরই কান্না জুড়ে দেয়, ভ্যা!
কিন্তু মা যে কী! শুধু রবির সঙ্গে খেলতে বলেন। রবি কী কম মিচকে! অন্তু যেখানে যাবে, যা যা করবে, তাই তাই করতে চাইবে! সঙ্গে না নিলে অমনি মাকে ডেকে হাত পা ছুড়ে কাঁদতে বসে!
খেলনা দোকান পেয়ে তো রবির ভারি মজা হয়েছে! এতোগুলো কাঁঠাল পাতা কুড়িয়ে টাকা বানিয়েছে। বসে বসে গুনছে সেই টাকা। ভালো করে গুনতে তো জানেই না! অন্তুর একটুও ভালো লাগছে না এসব। মনটা শুধু যাই যাই করছে।
দেখতে দেখতে অন্তুর রাগ হয় মায়ের ওপর। সে ভাবে, বা রে, আমি এখন বড় হয়েছি না! রবিকে নিয়ে খেলব কেন? আমি তো এখন বড়দের মতো থাকব। হাতে শলা নিয়ে ঘুরব। চিকন পাড়ের লুঙ্গি পরব। আর মাথায় বাঁধব টুকটুকে লাল গামছা। ওই সফি ভাই যেমন বাঁধে।
সফিটা আবার কে? অন্তুদের চাচাতো ভাই। স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে। চুলে টেরি কাটে। হাতে পরে ঘড়ি। যা মানায় না! অন্তুরও মন চায় ওসব করতে।
সফি ভাইয়ের কথা মনে হতেই অন্তু তাকে খুঁজতে লাগল। ওই তো সফি ভাই! বারান্দায় দাঁড়িয়ে কী যেন খুঁজছে। খুঁজে খুঁজে বের করে আনল ধাঁ চকচকে কোদালটা। নাড়ুনি গুঁজল বাঁশের ঝুড়িতে। মাথায় মাথালখানি দিয়ে যেই বের হবে, অন্তু একটা দুষ্টু বুদ্ধি পাকাল। চট করে দিল দোকানটা ভেঙে। রবি আকাশ ফাটিয়ে কেঁদে উঠলো, ভ্যা…..।
‘কী হলো রে, কী হলো?’ ছুটে এলেন মা।
‘সফি ভাই কই যায়! আমিও সঙ্গে যাব। আমি আর খেলব না এই দোকান দোকান খেলা,’ ঠোঁট ফুলিয়ে বলল অন্তু।
‘আর আমিও যাব। ভাইয়ের সঙ্গে,’ হঠাৎ কান্না থামিয়ে বলে উঠল রবি।
‘সফি তো যাচ্ছে মাঠে। ধান খেতের মাটি কোপাবে। সেচ দিবে।’
‘তাহলে আমিও তাই করব।’
‘ওরে আমার বীর পালোয়ান রে! পারবি তোরা মাটি কোপাতে? তার চেয়ে বসে বসে যা খেলছিলি, তাই খেল!’ মা শাসালেন অন্তুকে।
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল অন্তুর কান্না। বড় ভাইটির দেখাদেখি ছোটভাইও কাঁদে। ও কী আর অতশত বুঝে! ওরা যাবেই যাবে সফি ভাইয়ের সঙ্গে।
মা আবার এলেন তেড়ে। এবার সফি ভাই আগলে দাঁড়াল।
‘আসুক তো চাচি! ওদের আমি সামলে রাখব!’
‘কী বলো, কাজ করবে, না ওদের সামলাবে? যা দুষ্টু ওরা!’
‘সে দেখা যাবে। নিয়ে যাই, না হয় কেঁদে কেটে দিন কাবার করবে!’
‘নিয়ে যাবে যাও। বুঝবে ঠেলা পরে!’ ঠোঁট উল্টে বললেন মা।
এবার আনন্দ দেখে কে! অন্তুর হাত ধরে রবি হই হই করে চলল সফি ভাইয়ের সঙ্গে।
মাঠে এসে সফি ভাই সাবধান করে বলল, ‘এই যে পিচ্চিরা, এক পাশে চুপটি করে বসে থাক। নড়বি-চড়বি না কিন্তু। আর ওই কাদা মাড়াবি না। ওখানে এই এত বড় বড় কাঁকড়া থাকে। কাদা খায় দলা দলা। পেলে মানুষও খাবে!’ দাঁত খিঁচিয়ে, আঙুল বাঁকিয়ে দেখাল সফি ভাই। কী অদ্ভুত দেখাল সফি ভাইকে! খিলখিল করে হেসে উঠল ওরা।
‘তোরা তো দেখছি আসলেই দুষ্টু! কই একটু ভয় পাবি, তা না। হেসে গড়াগড়ি দিচ্ছিস। এখানে কিন্তু ঢোড়া সাপও আছে। বেশি খচখচ করলেই ফুঁস।’ এই বলে সফি ভাই মাটি কোপাতে শুরু করে।
অন্তু শুয়ে পড়ল চষা খেতের ওপর। ওর দেখাদেখি রবি। খেতের পাশেই ছোট্ট টিলা। ওখানে একটা গোলগাল হিজল গাছ। কত পাখি যে বসে আছে ডালে। পাখিরা বোধহয় সভা করছে। একটা শালিক বসে বসে মাটি খুঁটছে।
‘অ্যাই রবি, হা কর। তোর আলজিহ্বটা দেখি।’
অন্তুর কথায় রবি চোখ পাকিয়ে তাকাল একবার। তারপর আস্তে আস্তে হা করল।
‘শোন, একটা গোপন কথা বলি!’ অন্তু দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে হাত এগিয়ে নিলো রবির মুখের কাছে।
‘কাঁকড়া মাটি খায়, শালিকও মাটি খায়। তুই একটু মাটি খেয়ে দ্যাখ তো, কেমন লাগে! মজা লাগলে আমিও খাব!’ এই বলেই রবির হা করা মুখে এক টুকরো মাটি ছেড়ে দিল ও। তারপর একছুটে দৌড়ে পালাল।
রবি ছ্যা ছ্যা করে থুতু ফেলতে লাগল। আরেকটু হলেই গলায় ঢুকে যেত মাটির দলা! খুব রাগ হলো অন্তুর ওপর। অভিমানে বুজে এলো গলা। চোখে পানি এসে গেল!
অন্তুর চোখে পড়লো সবটা। ওতো একটু মজা করতে চেয়েছিল। রবি এমন কেঁদে দেবে, ভাবেনি তো!
একটু পর অন্তু গিয়ে রবির হাতটা ধরল। রবি গাল ফুলিয়ে বসেছে। এক টানে হাতটা সরিয়ে নিলো। ঘুষি পাকিয়ে যেই ভাইকে মারতে যাবে, দেখে ও জিহ্বাটা বের করে রেখেছে। ওর পুরো মুখে মাটি! গলে গিয়ে জিহ্বাটা কালো হয়ে আছে!
‘তুই না বললি, মাটি খেতে কেমন। তাই খেয়ে দেখলাম। ভালোই মজা!’ বলল অন্তু।
শুনে রবি ফিক করে হেসে দিল। কিটকিট করে হাসতে লাগল অন্তুও। তারপর ছোট ভাইয়ের গলাটা জড়িয়ে ধরে বাড়ি চলল। সফি ভাইকে ডেকে বলল, ‘বাড়ি গেলাম ভাই। পিঠে খুব রোদ লাগে!’
সফি ভাই হাত নাড়ল, ‘যা যা, খেয়ে দেয়ে পড়তে বস। বিকেলে ঘুড়ি উড়াতে নিয়ে যাব!’
‘শুনলি রে ভাই, তোকে নাকি ঘুড়ি উড়াতে নিয়ে যাবে!’ বলল রবি। দেখে অন্তুর খুব মায়া হলো। ছোট ভাইয়ের গলা জড়িয়ে বলল, ‘অতো ভাবিস কেন? তোকেও নিয়ে যাব সঙ্গে করে!’
রবি অবাক হয়ে তাকায় অন্তুর দিকে। সত্যি? ভাই তাকে মাঠে নিয়ে যাবে? খুশিতে সে লাফিয়ে উঠল অন্তুর কাঁধে। অন্তুও রবিকে কাঁধে চড়িয়ে দুলতে দুলতে চলে এলো বড় রাস্তায়।


