খেলার মাঠে মাসকট এলো যেভাবে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মাঠে বৃষ্টি ঝরছে। প্রিয় দল তিন গোল পিছিয়ে। গ্যালারিতে চাপা উত্তেজনা। এমন সময় হঠাৎ দেখা যায় এক অদ্ভুত চরিত্র! ফোম ও রঙিন পোশাকে মোড়ানো প্রাণী বা কার্টুনের মতো চরিত্র নাচছে, হাত নাড়ছে এবং দর্শকদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।

সে কিন্তু খেলোয়াড় নয়, কোচও নয়। সে হলো মাসকট। যাকে বলা হয়, দলের আনন্দ, শুভকামনা ও ভক্তির প্রতীক।

খেলাধুলার দুনিয়ায় মাসকট কেবল বিনোদন নয়, অনেক সময় দলের ‘লাকি চার্ম’ হিসেবেও ধরা হয়।

২০২২ সালে অনুষ্ঠিত কাতার বিশ্বকাপের মাসকট। ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালে অনুষ্ঠিত কাতার বিশ্বকাপের মাসকট। ছবি: সংগৃহীত

মাসকট শব্দের শুরু কোথা থেকে

‘মাসকট’ শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ mascotte থেকে, যার অর্থ ‘ভাগ্য বা সৌভাগ্যের প্রতীক’।

ধারণাটি জনপ্রিয় হয় ১৮৮০ সালের একটি ফরাসি অপেরা থেকে। সেখানে একটি চরিত্রকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছিল। পরে এই ধারণাই ধীরে ধীরে খেলাধুলার জগতে ছড়িয়ে পড়ে।

দর্শকদের আনন্দ দিচ্ছে ফুটবল ক্লাব আর্সেনালের মাসকট। ছবি: সংগৃহীত
দর্শকদের আনন্দ দিচ্ছে ফুটবল ক্লাব আর্সেনালের মাসকট। ছবি: সংগৃহীত

প্রথম দিকে অনেক খেলায় মাসকট হিসেবে সত্যিকারের প্রাণী ব্যবহার করা হতো।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বেভো’ নামের গরু, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত বুলডগ ‘হ্যান্ডসাম ড্যান’।

এই বুলডগটি এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, আজ পর্যন্ত তার বহু ‘উত্তরসূরি’ দলকে প্রতিনিধিত্ব করছে। এমনকি এখন তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টও আছে!

২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত রাশিয়া বিশ্বকাপের মাসকট। ছবি: সংগৃহীত
২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত রাশিয়া বিশ্বকাপের মাসকট। ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে মাসকট

ইংল্যান্ডের কিছু ক্লাবে মাসকটের সঙ্গে ক্লাবের প্রতীকের মিল থাকে। যেমন ক্রিস্টাল প্যালেস ক্লাবের প্রতীক ঈগল। তাই তাদের মাসকটও ঈগল-থিমে তৈরি চরিত্র। আগে তাদের একটি আসল ঈগল ছিল, যে মাঠে উড়ে বেড়াত। পরে আসে কস্টিউম পরা মাসকট ‘পেতে’।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ব্রাজিল বিশ্বকাপের মাসকট। ছবি: সংগৃহীত
২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ব্রাজিল বিশ্বকাপের মাসকট। ছবি: সংগৃহীত

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই আসল ঈগল ‘কায়লা’ ২০২০ সালে মারা যায়।

বিশ্বকাপের প্রথম মাসকট

বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রথম মাসকট আসে ১৯৬৬ সালে। তখনকার আয়োজক দেশ ছিল ইংল্যান্ড। এই মাসকটের নাম ছিল ওয়ার্ল্ড কাপ উইলি।

সিংহের মতো দেখতে এই চরিত্রটি ব্রিটেনের জাতীয় প্রতীককে প্রতিনিধিত্ব করত। সারা বিশ্বে তখন এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয় মাসকট উইলি। এটি ছিল টুর্নামেন্টের জন্য তৈরি করা প্রথম মাসকট। ছবি: সংগৃহীত
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয় মাসকট উইলি। এটি ছিল টুর্নামেন্টের জন্য তৈরি করা প্রথম মাসকট। ছবি: সংগৃহীত

এরপর বিশ্বকাপ আয়োজনকারীরা নিজেদের সংস্কৃতি তুলে ধরতে নানা ধরনের মাসকট তৈরি করেছে। ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে ছিল কমলা ফল ‘নারানজিত’, ১৯৭২ মিউনিখ অলিম্পিকে ছিল কুকুর ‘ওয়েলডি’, ১৯৬৮ শীতকালীন অলিম্পিকে ছিল স্কিয়ারের চরিত্র ‘শুস’।

প্রতিটি মাসকটই সেই দেশের পরিচয় ও সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছিল।

সব মাসকটের ভিড়ে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হলো কিংসলে।

কাঁটার মতো চুলওয়ালা সেই মাসকট কিংসলে, যে পার্টিক থিসলের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই শিরোনামে উঠে এসেছিলে। ছবি: সংগৃহীত
কাঁটার মতো চুলওয়ালা সেই মাসকট কিংসলে, যে পার্টিক থিসলের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই শিরোনামে উঠে এসেছিলে। ছবি: সংগৃহীত

স্কটল্যান্ডের পার্টিক থিসল ক্লাবের এই মাসকটটি দেখতে অনেকটা রাগী সূর্যমুখী ফুলের মতো। ডিজাইনার ডেভিড শ্রিগলি এটিকে এমনভাবে তৈরি করেছিলেন যে, ফুটবল ভক্তদের আবেগ, চাপ ও অস্থিরতাকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে।
শুরুতে অনেকেই এটিকে অদ্ভুত মনে করলেও পরে এটি ক্লাবের পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।

মাসকট কেবল মজার চরিত্র নয়। এটি ভক্তদের আবেগ, সংস্কৃতি ও দলের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।

কখনো এটি প্রাণী, কখনো ফল, আবার কখনো একেবারে কল্পনার অদ্ভুত চরিত্র। তবে তার কাজ একটাই দর্শকদের হাসানো, উৎসাহ দেওয়া ও খেলার আনন্দ বাড়ানো।

স্টেডিয়ামের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ফিলাডেলফিয়ার মাসকট। ছবি: সংগৃহীত

সূত্র: বিবিসি