ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা: দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর রান্নাঘরের লড়াই
দক্ষিণ আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। ফুটবল মাঠে এই দুই দেশ মুখোমুখি হলে যেন গোটা পৃথিবী থমকে যায়! কিন্তু রান্নাঘরে? সেখানে লড়াইটা আরও পুরোনো, আরও চুপচাপ চলে। একই মহাদেশে জন্ম, একই ঔপনিবেশিক ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে দুটো দেশ। তবু তাদের খাবার দেখলে মনে হয় না তারা পাশাপাশি থাকে। আর্জেন্টিনার থালায় আগুনের গন্ধ, ব্রাজিলের হাঁড়িতে সমুদ্রের রঙ। একটাকে বুঝতে হলে আগে অন্যটাকে আলাদা করে চিনতে হয়।
আর্জেন্টিনা: পাম্পার আগুন থেকে যে রান্না জন্মেছে
আর্জেন্টিনার খাবার বুঝতে হলে প্রথমে পাম্পায় যেতে হবে। সেই বিশাল তৃণভূমি, দিগন্তজোড়া ঘাস, রাতে খোলা আকাশের নিচে জ্বলা আগুন। ষোলো শতকে স্প্যানিশ উপনিবেশকারীরা গবাদিপশু নিয়ে এলো। পাম্পার মাটি এতটাই উর্বর যে পশুপাল বাড়তেই থাকল, ছড়িয়ে পড়ল। আর সেই পশু দেখাশোনার দরকারে জন্ম নিলো গাউচো—আর্জেন্টিনার কাউবয়। স্প্যানিশ, আদিবাসী আর আফ্রিকান রক্তের মিশেলে তৈরি এই মানুষগুলো পাম্পায় যাযাবরের মতো ঘুরত, সঙ্গে থাকত শুধু একটা ছুরি আর কয়েক টুকরো মাংস।
গাউচোরা রান্না করত সহজভাবে। কাঠ জ্বালাত, কয়লা হতে দিত, তারপর সেই কয়লার ওপর বসাত মাংস। লবণ ছাড়া আর কিছু লাগত না। মাংসই ছিল সব। সেই আদিম পদ্ধতি থেকে জন্ম নিলো ‘আসাদো’। কিন্তু এটা শুধু একটা রান্নার নাম নয়। আসাদো মানে মাংস, আর আসাদো মানে জড়ো হওয়া—দুটো একসঙ্গে। বন্ধু আসে, পরিবার আসে, কয়লার আঁচে ধীরে ধীরে রান্না হয়, ঘণ্টা কেটে যায় গল্পে। গ্রিলমাস্টারকে বলে ‘আসাদোর’—তার কাজে কেউ হাত দেয় না, পরামর্শও দেওয়া বারণ। রান্না শেষ হলে আসে ধাপে ধাপে—আগে চোরিসো, মোরসিয়া, তারপর মূল মাংস। পুরো ব্যাপারটা একটা আচারের মতো। তাড়া নেই, সময় নেই কোনো।
আসাদোর পাশে দাঁড়িয়ে আছে ‘চোরিপান’। চোরিসো আর পান—গ্রিলড সসেজ আর রুটি। স্টেডিয়ামের বাইরে, রাস্তার মোড়ে, যেকোনো বড় জমায়েতে চোরিপান ছাড়া আর্জেন্টিনা ভাবাই কঠিন। উপর থেকে ঢালা হয় চিমিচুরি—পার্সলে, রসুন, ভিনেগার, অলিভ অয়েল আর শুকনো মরিচের সস। একটু ঝাঁঝালো, একটু টক, একটু ঘাসের গন্ধ। সহজ খাবার, কিন্তু আর্জেন্টিনার রাস্তার যে প্রাণটা আছে, সেটা এই এক খাবারেই ধরা পড়ে।
‘এম্পানাদা’ আলাদা ধরনের গল্প বহন করছে। মধ্যযুগে মুর শাসনের সময় ইবেরীয় উপদ্বীপে প্রথম দেখা দেয় এই ভরাট পেস্ট্রি। ষোলো শতকে স্প্যানিশ অভিবাসীরা রেসিপিটা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। আর্জেন্টিনায় এটা হয়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন খাবার—একটা এম্পানাদায় পুরো একটা ভালো খাবার ধরে, পকেটে নিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়া যায়। প্রদেশ বদলালে ভেতরের পুর বদলায়। উত্তরে জুজুয়ে লামার মাংস, কর্ডোবায় কিশমিশ আর চিনির সঙ্গে গরুর মাংসের অদ্ভুত মিষ্টি-নোনতা স্বাদ। তুকুমান প্রদেশে এম্পানাদার জন্য বছরে একটা আস্ত উৎসব হয়, সারাদেশ থেকে মানুষ আসে। স্পেন থেকে আনা রেসিপি এতদিনে এতটাই আর্জেন্টিনার নিজের হয়ে গেছে যে এখন কেউ আর উৎস নিয়ে ভাবে না।
ব্রাজিল: যে রান্না বেঁচে থাকার জন্য শিখতে হয়েছিল
ব্রাজিলের খাবারের পেছনে যে ইতিহাস, সেটা পড়তে বসলে একটু থামতে হয়। এখানে বেশিরভাগ বড় খাবারের জন্ম হয়েছে অভাব, বঞ্চনা ও টিকে থাকার একরোখা জেদ থেকে। যারা রান্নাগুলো তৈরি করেছিল তারা সেটা পছন্দ করে করেনি, করতে বাধ্য হয়েছিল। আর সেই বাধ্যতার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে এমন কিছু স্বাদ, যেগুলো আজ পুরো দেশের পরিচয়।
‘ফেইজোয়াদা’ নিয়ে আগে বলা যাক। কালো শিম আর নানান কাটের শূকরের মাংস দিয়ে তৈরি ঘন স্টু। সঙ্গে ভাত, কুচানো কেল, কমলালেবুর ফালি আর ফারোফা—কাসাভা আটা ভেজে তৈরি করা মুচমুচে সঙ্গী। এটা ব্রাজিলের জাতীয় খাবার। কিন্তু শুরুটা কোথায়? পর্তুগিজরা উপনিবেশে শিম আর মাংসের স্টু রান্নার রীতি এনেছিল। আখের বাগানে, খনিতে কাজ করা আফ্রিকান দাসরা পেত সেসব যা মালিকেরা ফেলে দিত: শূকরের কান, পা, নাক, লেজ। অখাদ্য বলে এসব তাদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হতো। সেই ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র কালো শিমের সঙ্গে একসঙ্গে হাঁড়িতে পড়ত, দীর্ঘক্ষণ জ্বলত। বেরিয়ে আসত এক গভীর স্বাদ। উনিশ শতকে রিও দে জেনেরিওর রেস্তোরাঁয় এই খাবার পৌঁছাল, তারপর ধীরে ধীরে হয়ে উঠল দেশের প্রতীক। যারা এটা তৈরি করেছিল, ইতিহাস তাদের নাম মনে রাখেনি।
ব্রাজিলে শনিবার ফেইজোয়াদার দিন। পরিবার একসঙ্গে বসে, কমলার গন্ধ ছড়িয়ে থাকে টেবিলে, তাড়া নেই কোনো।
‘পাঁও দে কেইজো’ দেখতে ছোট, গোলাকার। বাইরে সামান্য মচমচে, ভেতরে নরম আর একটু টানটান—চুইংগামের মতো প্রসারিত হয়। এর পেছনেও একই গল্পের ছায়া। মিনাস জেরাইস রাজ্যে সোনা-হীরার খনি আবিষ্কারের পর আঠারো শতকে পাঁচ লাখেরও বেশি আফ্রিকান মানুষকে দাস বানিয়ে আনা হয় শুধু এই অঞ্চলেই। তারা গমের আটা পেত না। কাসাভা মূল থেকে নিজেরাই স্টার্চ তৈরি করতে শিখল, সেই স্টার্চ জলে ভিজিয়ে বল বানাত, আগুনে সেঁকত। উনিশ শতকের শেষে দাসপ্রথা উঠে যাওয়ার পর মিনাস জেরাইসের সমৃদ্ধ দুগ্ধশিল্পের পনির আর দুধ মিশল সেই স্টার্চে। হলো পাঁও দে কেইজো। এখন ব্রাজিলের প্রতিটি সকালে এটা আছে—রাস্তার ভ্যানে, বাড়ির রান্নাঘরে, ব্যস্ত অফিসের ব্রেকফাস্টে। একটা খাবার কতটা পথ পেরিয়ে আসতে পারে।
‘মোকেকা’ দেখলে বোঝা যায় তিনটা সংস্কৃতি একসঙ্গে রান্নায় মিশলে কী হয়। আদিবাসী তুপি মানুষেরা পাতায় মুড়িয়ে মাছ রান্না করত, সেই পদ্ধতিকে তুপি ভাষায় বলত ‘মোকেম’—এই শব্দ থেকেই এলো মোকেকা। পর্তুগিজরা এলো, সঙ্গে আনল রসুন, পেঁয়াজ, ধনেপাতা। আর আফ্রিকান দাসরা যোগ করল দেন্দে তেল আর নারকেল দুধ। বাইয়া অঞ্চলের মোকেকায় এই দেন্দে তেল দেয় গভীর কমলা রঙ, একটা তীব্র মাটির গন্ধ। পাশের রাজ্য এস্পিরিতু সান্তোর মোকেকায় পাম অয়েল নেই, অনেক হালকা, মাছের নিজস্ব স্বাদটা বেশি টের পাওয়া যায়। কোনটা আসল মোকেকা—এই বিতর্ক ব্রাজিলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে, কেউ হার মানছে না।
পাশাপাশি দেশ, তবু রান্না এত আলাদা কেন
দুটো দেশ পাশাপাশি, তবু রান্না এত আলাদা—এই প্রশ্নের উত্তর একটা সরল জায়গায় নেই।
ভূগোলের কথা আগে বলা দরকার। ব্রাজিল বিশাল দেশ, তার ভেতরে একটা মহাদেশের সমান বৈচিত্র্য। উত্তরে আমাজনের নদীর মাছ আর কাসাভা, উত্তর-পূর্বে সমুদ্রের কাছে আফ্রিকান রান্নার প্রভাব তীব্র, দক্ষিণে ইউরোপিয়ান অভিবাসীদের ছাপ। আর্জেন্টিনায় পাম্পার বিস্তার গরু পালনের জন্য প্রায় অলৌকিক। এই জমি গাউচোর, এই জমি মাংসের। ব্রাজিলের উপকূলের মানুষ যখন মাটির পাতিলে মাছ আর নারকেল দুধ রান্না করছে, আর্জেন্টিনার পাম্পায় তখন কয়লার আঁচে গোটা পশু ঝলসানো হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে।
উপনিবেশের ধরনটাও আলাদা ছিল। ব্রাজিল পর্তুগিজ, আর্জেন্টিনা স্প্যানিশ। ব্রাজিলে আখবাগান আর খনির শ্রমের জন্য বিপুল সংখ্যায় আফ্রিকান মানুষকে দাস বানিয়ে আনা হয়েছিল—পুরো আমেরিকা মহাদেশে ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র ছিল দুটি সবচেয়ে বড় দাস-সমাজ। সেই লাখো মানুষ রান্নাঘরে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া দুনিয়ার স্বাদটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। দেন্দে তেল, কালো শিম, কাসাভা রান্নার কৌশল—এসব আফ্রিকান উত্তরাধিকার ব্রাজিলের রান্নায় এতটাই গভীরে গেছে যে সরানোর কথা ভাবাই যায় না।
আর্জেন্টিনায় আফ্রিকান দাসের সংখ্যা তুলনায় কম ছিল। বরং উনিশ ও বিশ শতকে ইতালি, স্পেন থেকে বড় ঢেউয়ে ইউরোপিয়ান অভিবাসী এসেছে। সেই রান্নার ধারা—মাংস কেন্দ্রিক, সরল উপকরণ, খুব কম মশলা—আর্জেন্টিনার রান্নাঘরে থিতু হয়ে বসেছে। আদিবাসী প্রভাব আছে, কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তি তার অনেকটাই ঢেকে দিয়েছে।
ব্রাজিলে উল্টো। তুপি-গুয়ারানি আদিবাসী মানুষদের কাসাভা চাষের ইতিহাস হাজারো বছরের পুরোনো। আমাজন অঞ্চলে এই মূল ফসল ১০ হাজার বছর ধরে চাষ হয়ে আসছে। পাঁও দে কেইজো থেকে ফারোফা, তাপিওকা থেকে ভিনাগ্রেতি—কাসাভা ব্রাজিলের রান্নার ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে একটা নদীর মতো।
এক টেবিলে দুটো গল্প
এই দুই দেশের খাবার পাশাপাশি রাখলে একটা ব্যাপার টের পাওয়া যায়। আর্জেন্টিনার রান্নায় একটা উন্মুক্ততা আছে—খোলা আগুন, খোলা মাঠ, বড় টেবিলে অনেক মানুষ, কয়লার ধোঁয়া উঠছে আকাশে। ব্রাজিলের রান্নায় একটা ভেতরমুখী গভীরতা—মাটির পাতিলে ঢাকা, ধীরে রান্না করা, স্বাদ তৈরি হচ্ছে ভেতরে ভেতরে, বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
আর্জেন্টিনার আসাদোয় সেই গাউচোর পাম্পার রাত মিশে আছে—কয়লার আলোয় মুখ, হাতে ওয়াইন, কথা বলতে বলতে ভোর। ব্রাজিলের ফেইজোয়াদায় আছে যাদের নাম ইতিহাস মনে রাখেনি তাদের রান্নাঘর, তাদের হাত, তাদের মাটির হাঁড়ি। মাঠে দুই দেশ যতই শত্রু হোক, এই খাবারগুলো আসলে একই কথা বলে—মানুষ যখন কিছু হারায়, রান্নাঘরে গিয়ে সেটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। সবসময় পারে না, কিন্তু চেষ্টাটা থাকে। আর সেই চেষ্টার স্বাদই বেঁচে থাকে সবচেয়ে বেশিদিন।