কেন শিশুকে বইমেলায় নিয়ে যাবেন?
প্রতি বছর এই সময়ে বইমেলায় দেখা মেলে নানা বয়সী পাঠকদের। এর মধ্যে ছোটদের অংশগ্রহণে বইমেলা সবসময়ই থাকে প্রাণোচ্ছল। ছোটরা বইমেলার প্রাণ—এ কথা বললে ভুল বলা হবে না। কারণ বইমেলায় ঢুকতেই শিশু চত্বরে বিরাট এক অংশজুড়ে দেখা যায় ছোটদের বইয়ের নানা রকম স্টল। তাদের জন্য পাপেট শোসহ নানা রকম আয়োজনে মুখরিত থাকে বইমেলা।
ছোটদের বই পড়ার জন্য এত রকম আয়োজনের মধ্যেও বর্তমানে কি শিশুরা বইয়ের প্রতি আগ্রহ পাচ্ছে? ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা কিংবা নানা রকম বিনোদনের মাঝে কি আমাদের শিশুরা বইয়ের পাতায় আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছে? বর্তমানে বিনোদনের নানা মাধ্যম থাকায় বই পড়া অবসর কাটানোর একমাত্র উপায় নয়—এটা সত্যি। তবে অনেক বাবা-মা শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করে তাদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলছেন। শিশুদের বইয়ের রাজ্যের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য বাবা-মা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন।
বহুদিন আগে ছোটদের বইয়ের লেখক লীলা মজুমদার বলেছিলেন, ‘বড়রা বই পড়ে সময় কাটাবার জন্য নয়তো প্রবন্ধের মালমসলা জোগাড় করার জন্য, নয়তো সবাই পড়ছে বলে কিংবা বই না পড়লে ঘুম আসে না বলে। আর ছোটরা পড়ে মজা পাওয়ার জন্য। মজা না পেলে পড়ে না। যা পড়ে তাই দিয়ে ওদের মন তৈরি হয়, পরে কাজে লাগে। সত্যিকারের পৃথিবী ছাড়াও ছোটদের কিন্তু নিজস্ব একটা কল্পনার জগত থাকে।’
শিশুদের এই কল্পনার জগতকে বিস্তৃত করতে বাবা-মায়ের এগিয়ে আসতে হবে। ছোটবেলা থেকে শিশুকে বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এই যেমন ৩ বছর বয়সী অরোরাকে খুব ছোটবেলা থেকে ঘুমানোর সময় নানা রকম গল্প শোনানো হতো। সে নিজে বই পড়তে না পারলেও প্রতিটি বইয়ের কাহিনী তার মুখস্থ। বই থেকে সে নানা মানবিক গুণাবলি রপ্ত করেছে, তার কল্পনার জগত প্রসারিত হয়েছে এবং তাকে সৃজনশীল করে তুলেছে। কথা শেখার সময় শিশুদের প্রতিদিন বই পড়ে শোনালে তাদের ভাষা ও শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়। এছাড়া বাচ্চারা যেহেতু অনুকরণপ্রিয়, তাই তার পরিবারের অন্যরাও যদি বই পড়ে, সেটি তাকে বই পড়তে উৎসাহিত করে।
ছোটদের জন্য বর্তমানে কেমন কাজ হচ্ছে জানতে চাইলে এ যুগের লেখক সাদিকা রুমন বলেন, ছোটদের জন্য পূর্বের তুলনায় বেশি কাজ হচ্ছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয় এবং বিস্তৃত, গভীর, সামগ্রিক চিন্তা, গবেষণা ও চিন্তাপ্রসূত নয়। শিশুদের ভেতর যারাও বা বই পড়ে, তারাও পড়ার জন্য কোন বই বেছে নিচ্ছে, তা দেখলেই আমরা এই কথার সত্যতা পেয়ে যাব। না, বাংলা বই নয়, ইংরেজি বই বা ইংরেজিতে অনুদিত বিদেশি বই। বাংলার নির্ভরতা এখনো ক্লাসিক সাহিত্যের ওপর। গুটিকয় প্রকাশনী শিশুদের জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। শিশুরা কোন বই বেছে নিচ্ছে, কেন বেছে নিচ্ছে, তাদের পছন্দের ধরন কী, কোথায় ঘাটতি থাকছে সেই বিষয়গুলো অনুসন্ধান, অনুশীলন জরুরি বলে মনে হয়।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে এখন শিশুদের জন্য বই প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু সেই বইটার খোঁজ তাদের কাছে পৌঁছবে কী করে? বড়দের বইয়ের খোঁজ পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, শিশুদেরটা কিন্তু নয়। তো কোন বইটা ভালো লাগবে সেটা অভিভাবক কিংবা শিশু কী করে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে! কাজেই কাজ বলতে শুধু বই প্রকাশ নয়, বইয়ের সঙ্গে শিশুর সম্পর্কের বিষয়টি আরও বিস্তৃত, আরও গভীর।
কোন বয়সে শিশুরা কোন বই পড়বে—সেটি ঠিক করাও কিন্তু খুব জরুরি। বইয়ের ভাষা, গল্পের মান, ছবি—এগুলো বিবেচনা করে শিশুর হাতে বই তুলে দিন। একটু বড় হলে সে নিজেই নিজের পছন্দ অনুযায়ী বই বেছে নিতে পারবে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে বাবা-মায়ের উচিত শিশুর বয়স অনুযায়ী ভালো মানের বই বাছাই করা। শিশুদের কোনো উপহার দেওয়ার বেলায়ও কিন্তু বইয়ের কথা মাথায় রাখতে পারেন। একটা ভালো বইয়ের কাছে অন্য কোনো উপহারের তুলনা হয় না।
বইমেলায় নিয়ে যাওয়া কীভাবে শিশুদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলে? এ বিষয়ে সাদিকা রুমন বলেন, ‘ঘর, পাঠশালা, বন্ধু, সমাজ মিলে যখন একটা শিশুকে বইয়ের সঙ্গে বন্ধুতা করিয়ে দেবে, তখন তার কাছে বইমেলা হবে উৎসবের মতো। এটা কি দুর্ভাগ্যজনক নয় যে, আমাদের হাতের কাছে শিশুকে হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো একটা লাইব্রেরি নেই এবং স্কুল-সিলেবাস শিশুকে কোনো “অপ্রয়োজনীয়” বই পড়তে উৎসাহিত করে না! আসলে আমাদের মনস্তত্ত্বে আগে অপ্রয়োজনের প্রয়োজনটা প্রবেশ করা জরুরি। আমরা বড্ড প্রয়োজনমুখী হয়ে পড়েছি।’
শহরে গুটি কয়েক বইয়ের দোকান ছাড়া আসলেই শিশুদের বই পড়ার জায়গার অভাব রয়েছে। প্রতিবছর বইমেলার সময় ছোটদের বইমেলায় নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এই দুঃখ কিছুটা দূর হয়। ইকরিমিকড়ি, ময়ূরপঙ্খীসহ নানা প্রকাশনী ছোটদের বই নিয়ে কাজ করে তাদের জন্য খুব ভালো মানের বই প্রকাশ করে যাচ্ছে। ছোটদের বইয়ের সঙ্গে সখ্যতা গড়তে তাদের নিয়ে বইমেলায় যান এবং বই উপহার দিন। বইমেলার শিশু চত্বর শিশুদের প্রাণোচ্ছল কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠুক প্রতি বছর।
