নতুন বইয়ের গন্ধ আর মলাটবাঁধা স্মৃতি

সৈয়দা সুবাহ আলম
সৈয়দা সুবাহ আলম

নতুন বছরে পদার্পণ করে শীতের আমেজে জানুয়ারি মাসটা বেশ আরাম আয়েশেই কেটে যায়। তারপর অনেক আয়োজন নিয়ে আসে ফেব্রুয়ারি। ভাষার মাস, বসন্তবরণ আর ভালোবাসার মাস—এই ফেব্রুয়ারি কিন্তু অমর একুশে বইমেলা ছাড়া চিন্তাই করা যায় না।

মিলেনিয়াল হোক কিংবা একালের জেন-জি, ফেব্রুয়ারি এলেই সবার মধ্যে বইমেলা নিয়ে প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। পুরো মাসজুড়ে দারুণ প্রাণবন্ত একটা সময় কাটে বইপ্রেমীদের। তবে এ বছর চিত্রটা একটু ভিন্ন। রাজনৈতিক পালাবদল, নির্বাচন, সবমিলিয়ে বইমেলা ঠিক ফেব্রুয়ারির এক তারিখে শুরু হয়নি।

সব বাধা-বিপত্তি পার করে, অবশেষে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে শুরু হলো ২০২৬ সালের বইমেলা। বইপ্রেমীদের জন্য এই মেলা সবসময়েই ভীষণ আনন্দের। প্রথমবার বাবা-মায়ের সঙ্গে বইমেলায় যাওয়া, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নেওয়া, ঈদ সালামি কিংবা টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে প্রিয় বই কেনা, বড় হয়ে বন্ধুবান্ধব কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে বইমেলায় যাওয়া এই স্মৃতিগুলো আসলে অমলিন। অনলাইনে বই কেনার এই যুগে বইমেলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন অনেকেই। কিন্তু হাজারো বইপ্রেমীর এই মিলনমেলাকে কেবল বই কেনাবেচায় আটকে ফেললে আসলে বাঙ্গালির এই ঐতিহ্যকেই ছোট করে ফেলা হয়। দেশ ছেড়ে দূর পরবাসে পাড়ি জমিয়েছেন যারা, বইমেলায় না আসতে পারার আবেগ তাদেরও ছুঁয়ে যায়।

এই যেমন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অভীক রেহমানের কাছে তার বইমেলার স্মৃতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছেলেবেলার বইমেলার কথা মনে পড়ে। ক্লাস থ্রি-ফোরের দিককার কথা। ফেব্রুয়ারির শুরু, ছুটির দিনটায় একদম সক্কাল সক্কাল বাবা-নানির হাত গলে খবরের কাগজের নাগাল পাওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। যুদ্ধজয় শেষে দেখা মিলতো সেই পত্রিকার নিচের দিকটায় রঙ-বেরঙের বইয়ের বিজ্ঞাপন আর একটুখানি বিবরণ, ওতেই খুশি! বাকি থাকত চটজলদি লিস্ট করে ফেলা, আর সপ্তাহান্তে বইমেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ঘ্যানঘ্যানানি।’

‘সাদাসিধে ছেলেবেলার সেই বইমেলার স্মৃতিগুলো কেন যেন আজও বড় রঙ্গিন লাগে। সোশ্যাল মিডিয়ার চকমকে অ্যাডভার্টাইজিংয়ের ভিড়ে এখনো মনে পড়ে খবরের কাগজের সেই দিনগুলো। বিদেশ-বিভূঁইয়ে বসে এই আক্ষেপ আরও বাড়ে। ব্যাংকে ডলার জমে, এখন আর বই কিনতে হতাশ হয়ে মানিব্যাগের দিকে তাকাতে হয় না। কিন্তু এখন যে বইমেলাটাই আর পাশে নেই!’

এই প্রজন্মের পাঠক কলেজপড়ুয়া শামাইলা সিরাজ খুব ছোটবেলা থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে বইমেলায় যান। তার অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় প্রতিবছর কয়েকবার করে বইমেলায় যাওয়া হতো। প্রথমদিন আমার কাজ হতো সব স্টল থেকে বইয়ের লিস্ট সংগ্রহ করে বাসায় গিয়ে যাচাইবাছাই করে পরের দিন নিজের পছন্দ অনুযায়ী বই কিনে বাসায় ফেরা। যেহেতু সব বই একাই কেনা সম্ভব নয়, তাই বন্ধু আর কাজিনদের সঙ্গে বই ভাগাভাগি করে কেনা হতো। তারপর সবার সঙ্গে বই শেয়ার করে পড়তে পড়তে পুরো ফেব্রুয়ারিটাই ভীষণ আনন্দে কেটে যেত।’

‘এখন কাজিনরা অনেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। আগের মতো কয়েকবার করেও বইমেলা যাওয়ার সময়ও মেলে না। তবু প্রতিবছর একবার বইমেলা না গেলে হয় না।’

বইমেলার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় আমার প্রিয় লেখকের সঙ্গে একবার বইমেলায় দেখা হয়ে গিয়েছিল। তার সঙ্গে কথা বলে অটোগ্রাফ নেওয়ার স্মৃতি আমি কোনোদিন ভুলবো না। সেদিন তার ইমেইল অ্যাড্রেস নিয়ে পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম আমি। বইমেলা না থাকলে কি এই সুযোগ কখনো হত!’

তবে এখন পত্রিকার পাতায় বইয়ের নাম দেখে বই কেনা না হলেও সোশ্যাল মিডিয়াতে বই বিষয়ক কনটেন্ট দেখে লিস্ট বানায় নতুন প্রজন্মের পাঠকরা। আর বইমেলায় এখন নানা রকমের লেখকের দেখা মেলে। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে অনেকেই বই লেখেন আজকাল। দারুণ বিক্রি-বাট্টাও হয় সেসবের। বইয়ের কাটতি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কতটা পরিচিত, তার ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে।

লেখক সুহান রিজওয়ান বলেন, ‘পত্রিকার পাতা নয়, পাঠকেরা এখন পছন্দের বইয়ের লিস্ট বানায় সোশ্যাল মিডিয়ার বুদবুদ থেকে। সারা বছর যারা বই কেনে, তাদের বই কেনাটাও এখন অনেকটা অনলাইন-ভিত্তিক। নিয়মিত এই ক্রেতাদের জন্য বইমেলাটা এখন বরং একটা মাসব্যাপী আড্ডার মতো, প্রিয়মুখদের সঙ্গে দেখা করার উপলক্ষ।’

অনলাইনের এই যুগে অনেকে ব্যস্ততার ভিড়ে স্বাছন্দ্যকেই বেছে নেন। তবে এখনো বইমেলায় দেখা মেলে অনেক পাঠক এবং লেখকের। ক্ষুদে পাঠক থেকে শুরু করে নানা বয়স-পেশার মানুষ বইমেলায় যান। নিজেদের পছন্দের বই কেনেন। বই কেনার বার্তা ছড়িয়ে দিতে এবং বই পড়ায় উৎসাহ বাড়াতে বিরাট ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে একুশে বইমেলা। তাই বইমেলায় যান, বই কিনুন, বই উপহার দিন এবং বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখুন।