ধুলো জমা ক্যাসেটে হারানো দিনের ঈদের সুর

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

নব্বই দশকে ঈদ যেন আসা শুরু করেছিল অন্য এক মাত্রা নিয়ে। ঈদের আনন্দ মানে তখন শুধু নতুন জামা নয়, বরং ছিল নতুন গানও।

সে সময়ের তরুণদের কাছে ঈদের প্রস্তুতির একটা বড় অংশ ছিল ক্যাসেট কেনা। একেকটা ক্যাসেট যেন ছিল ঈদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ‘গিফট’।

৩৫ টাকা দিয়ে শুরু, পরে ৫০, ৬০ করে দাম বাড়লেও আগ্রহ কমেনি একটুও। বরং ঈদের আগের কয়েকদিন, বিশেষ করে চাঁদরাতে, ক্যাসেট দোকানগুলোর সামনে যে ভিড় জমত, তা ছিল উৎসবেরই অংশ।

ঢাকায় মিরপুর বা মোহাম্মদপুরে খুঁজে না পেলে শেষ ভরসা ছিল এলিফ্যান্ট রোড। চাঁদরাতের সেই ব্যস্ততায়, দোকানের আলো-ঝলমলে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নতুন অ্যালবাম খোঁজার একটা আলাদা রোমাঞ্চ ছিল।

কেউ খুঁজছে প্রিয় ব্যান্ডের নতুন রিলিজ, কেউবা মিক্সড অ্যালবামের খোঁজে—যেখানে একসঙ্গে পাওয়া যেত কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পীর গান।

দোকানদারদেরও যেন আলাদা ব্যস্ততা থাকত। 'এই অ্যালবামটা নতুন এসেছে', 'এটা বেশি চলছে'—এমন কথায় ভরপুর থাকত চারপাশ। ক্যাসেটের কভার খুলে ভেতরের লিরিক শিট দেখার আনন্দ, গানগুলোর নাম পড়ে কল্পনায় সুর ভেসে ওঠা—এসবই ছিল অভিজ্ঞতার অংশ।

অনেক সময় একটাই ক্যাসেট কিনতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ৫-১০ মিনিট, শুধু ঠিক করার জন্য—কোনটা নেব, নাকি আরেকটা? কারণ সব তো আর একসঙ্গে কেনা সম্ভব না। তাই বেছে নিতে হতো—কোনটা এবারের ঈদে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেবে।

চাঁদরাতের আরেকটা দৃশ্য ছিল—ঘরের ভেতর ব্যস্ততা, রান্নাবান্না চলছে, কেউ মেহেদি দিচ্ছে, আর পেছনে বাজছে নতুন কেনা ক্যাসেট। একটা টেপ রেকর্ডার বা ডেক—যেখানে নতুন অ্যালবাম ঢুকিয়ে প্লে বাটন চাপা মানেই যেন উৎসবের শুরু।

রান্নাঘরে মায়ের সেমাই ভাজার গন্ধ, পাশে বসে বোন বা কাজিনদের মেহেদি দেওয়ার হাসি-ঠাট্টা, আর পেছনে বাজতে থাকা কোনো জনপ্রিয় ব্যান্ডের গান—এই পুরো পরিবেশটাই তৈরি করত ঈদের আবহ।

নতুন ক্যাসেট একবার নয়, বারবার বাজানো হতো। একটা গান ভালো লাগলে রিওয়াইন্ড করে আবার শোনা—এই ছোট ছোট কাজগুলোতেই ছিল আনন্দ। 
তখন ছিল না এখনকার মতো স্কিপ করার সুবিধা, কিন্তু সেই অপেক্ষাটাই যেন গানকে আরও মূল্যবান করে তুলত।

চাঁদরাতের কেনাকাটা শেষ হলেই শুরু হতো আরেক পর্ব—বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। কোনো বন্ধুর বাসায় জড়ো হতো সব বন্ধুরা, কখনো আবার বাইরে। নতুন কেনা ক্যাসেট নিয়ে সবাই বসে যেত। গান প্লে করা হতো, আর সঙ্গে সঙ্গে গলা মেলাতো সবাই।

কে কতটা সুরে গাইতে পারে, সেটা বড় বিষয় ছিল না—গুরুত্ব ছিল একসঙ্গে গাওয়া। একটা গান শেষ হলে শুরু হতো আলোচনা—'এই গানটা সবচেয়ে ভালো', 'না, ওটার লিরিক বেশি শক্তিশালী', 'এই সুরটা অন্যরকম'—এমন তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকত।

বিশেষ করে ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবামগুলো নিয়ে তর্ক জমত বেশি। কোন সুরকারের কম্পোজিশন ভালো হলো, কোন ব্যান্ডের গান বেশি হিট হবে—এসব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলত।

কেউ কেউ আবার নিজের পছন্দের গানকে ‘ডিফেন্ড’ করতে গিয়ে প্রায় ঝগড়ার মতো অবস্থাও তৈরি করত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা হাসি-আনন্দেই গড়াতো।

ঈদের দিন সকালে নামাজ শেষে বাসায় ফিরে সেমাই, মিষ্টি, রুটি বা  পরোটা—এই খাবারের সঙ্গে ছিল আরেকটা স্থায়ী সঙ্গী—ক্যাসেটের গান। সকালের সেই নিরিবিলি সময়টায় গান বাজানো মানেই ছিল একটা শান্ত, আনন্দময় শুরু।

পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাচ্ছে, কেউ কেউ আবার গুনগুন করে গান গাইছে—এই দৃশ্যগুলো এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। তখনকার দিনে গান শুধু শোনার জন্য ছিল না, সেটা ছিল এক ধরনের পারিবারিক অভিজ্ঞতা।

অনেকেই ঈদের সকালে নতুন অ্যালবাম প্রথমবারের মতো পুরোটা শুনত। একটা গান থেকে আরেকটা গান—পুরো অ্যালবামটা শেষ না করা পর্যন্ত যেন শান্তি মিলত না।

ঈদের আনন্দ শুধু ঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকত না। বন্ধুবান্ধব মিলে সাউন্ডবক্স ভাড়া করে বাইরে গান বাজানোর একটা আলাদা ট্রেন্ড ছিল। পাড়ার কোনো খোলা জায়গা, ছাদ, কিংবা কাছের কোনো স্পটে ছোটখাটো পিকনিকের আয়োজন হতো। সেখানে সেই একই ক্যাসেট আবার নতুন করে বাজত—কিন্তু এবার একটু জোরে, একটু বেশি উচ্ছ্বাস নিয়ে। কেউ নাচছে, কেউ গাইছে, কেউ শুধু বসে শুনছে—সব মিলিয়ে একটা ছোট্ট উৎসব।

এই সাউন্ডবক্স কালচারটা আসলে একটা কমিউনিটি ফিলিং তৈরি করত। পাশের বাসার মানুষরাও শুনত, কেউ কেউ এসে যোগ দিত। একটা ক্যাসেট যেন পুরো পাড়ার আনন্দের অংশ হয়ে উঠত।

ক্যাসেটের ভেতর লুকানো স্মৃতি

আজকের দিনে যখন সব গান এক ক্লিকেই পাওয়া যায়, তখন সেই ক্যাসেটের যুগটা অনেক দূরের মনে হয়। কিন্তু যারা সেই সময়টা পার করেছে, তাদের কাছে ক্যাসেট মানেই শুধু গান নয়—একটা স্মৃতি, একটা সময়, একটা অনুভূতি।

একটা নির্দিষ্ট ক্যাসেট শুনলেই মনে পড়ে যায় সেই ঈদের কথা—কোথা থেকে কেনা হয়েছিল, কার সঙ্গে বসে শোনা হয়েছিল, কোন গানটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি তর্ক হয়েছিল। এই স্মৃতিগুলোই ক্যাসেটকে আলাদা করে দেয়।

তখন হয়তো প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না, কিন্তু অনুভূতিগুলো ছিল অনেক বেশি সরল, অনেক বেশি গভীর। একটা ছোট্ট টেপের ভেতর বন্দি ছিল একটা পুরো প্রজন্মের আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বন্ধুত্বের গল্প।

আর সেই গল্পগুলোই আজও বেঁচে আছে—কোনো পুরোনো ড্রয়ারে পড়ে থাকা ক্যাসেটের মতো, একটু ধুলো জমেছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরের সুর এখনো অমলিন।