স্ক্রিপ্টে না থাকা বিড়াল যেভাবে বদলে দিয়েছিল দৃশ্যের আবহ

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

১৯৭২ সালে মুক্তির পর থেকে আজ পর্যন্ত ‘দ্য গডফাদার’-এর সেই বিখ্যাত বিড়াল বারবার ফিরে এসেছে—নতুন রূপে, নতুন প্রেক্ষাপটে, নতুন ভাষ্যে। কখনো কার্টুনে প্যারোডি হয়েছে, কখনো ‘দ্য সিম্পসন্স’-এর কোনো দৃশ্যে অল্প সময়ের জন্য হাজির হয়ে পুরোনো সেই আবহকে মনে করিয়ে দিয়েছে। আবার কখনো রেডিটের অসংখ্য মিমে সে নতুন করে বেঁচে উঠেছে।

মাফিয়া গল্পের ভিডিও গেম, টি-শার্ট, পোস্টার—সব জায়গাতেই আছে সেই বিড়ালের ছাপ। এক সময়ের নামহীন, ভবঘুরে একটি বিড়াল আজ সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় প্রতীক, যাকে দেখলেই দর্শক ফিরে যায় সেই প্রথম দৃশ্যে।

এখানেই আসল বিস্ময়। ‘দ্য গডফাদার’ যতটা নিখুঁত স্ক্রিপ্ট আর পরিকল্পনায় তৈরি, তার অনেক আইকনিক মুহূর্ত এসেছে একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে, কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই। সেই বিড়াল তার সবচেয়ে স্মরণীয় উদাহরণ।

কীভাবে সিনেমায় বিড়ালটি এলো, তা নিয়ে দুটি মত প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন, শুটিংয়ের সময় সেটের মধ্যেই ঘুরছিল একটি বিড়াল। হঠাৎই সেটিকে কোলে তুলে নেন মার্লন ব্রান্ডো। না কোনো রিহার্সাল, না কোনো নির্দেশনা। ক্যামেরা তখনো চলছে। সংলাপ এগোচ্ছে। দৃশ্য তৈরি হচ্ছে নিজের মতো করে। আর স্ক্রিপ্টের বাইরের এই মুহূর্তটাই হয়ে ওঠে সিনেমার ইতিহাসে অমর এক দৃশ্য।

আবার কেউ কেউ বলেন, পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা বিড়ালটি দেখে দৃশ্যের একদম আগ মুহূর্তে সেটি ব্রান্ডোর হাতে দেন। প্রাণী-প্রেমী ব্রান্ডোও সেটি নিয়েই সাবলীলভাবে নিজের অভিনয় চালিয়ে যান। এভাবেই জন্ম নেয় সেরা সেই দৃশ্যটি। পিটার কাউয়ির লেখা 'দ্য গডফাদার বুক' (১৯৯৭) বইয়ে তিনি এই মতকেই সমর্থন করেছেন।

দৃশ্যে বিড়ালকে আনার এই ছোট্ট সংযোজন ছবিটিকে শুধু আলাদা করেনি। এটি ছবির ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে এক ধরনের জীবন্ত অনুভূতি। দৃশ্যটি আর নিখুঁতভাবে সাজানো মনে হয় না। বরং মনে হয় বাস্তবের মতো—কিছুটা অনিশ্চিত, কিছুটা অপ্রস্তুত। ডনের কোলের ওপর বিড়ালটির অনায়াস বসে থাকা, নিজের মতো নড়াচড়া করা—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি আরও বাস্তব লাগে। একইসঙ্গে আরও অস্বস্তিকরও হয়। এই অনিশ্চয়তাই ছবির শুরুতেই তৈরি করে চাপা, ভৌতিক আবহ। যেখানে ক্ষমতা, ভয় আর নীরবতা একসঙ্গে মিশে থাকে।

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—চলচ্চিত্র শুধু পরিকল্পনার শিল্প নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া। এখানে অনিয়ন্ত্রিত ঘটনাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিড়ালটি স্ক্রিপ্টে ছিল না। তার জন্য কোনো প্রস্তুতিও নেওয়া হয়নি। এমনকি সেটিকে অভিনয় করানোরও চেষ্টা করা হয়নি। তবু সেটিই হয়ে উঠেছে দৃশ্যের প্রাণ, যা দর্শকের মনে গেঁথে গেছে। এই একটিমাত্র হঠাৎ সিদ্ধান্তের উপস্থিতি পুরো দৃশ্যের ভারসাম্য বদলে দেয়। পরিকল্পনার ভেতরে ঢুকে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত বাস্তবতা।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয়—বিড়ালটি নিজেই জানত না সে কী করছে। সে কোনো নির্দেশনা অনুসরণ করেনি, ক্যামেরা বোঝেনি। স্থির হয়ে বসে থাকারও চেষ্টা করেনি। তবু সেই এক মুহূর্তে—এক মাফিয়া পিতৃতন্ত্রের প্রতীক ডনের কোলের ওপর বসে সে তৈরি করে ফেলে এক অদ্ভুত কনট্রাস্ট। একদিকে নির্মম ক্ষমতা, শীতল সিদ্ধান্ত, সহিংসতার ইঙ্গিত, অন্যদিকে এক নিরীহ, শান্ত প্রাণী, প্রায় উদাসীন। এই দ্বৈততাই দৃশ্যটিকে গভীর করে। শুধু সুন্দর নয়, অর্থবহও করে তোলে।

বিড়ালের গুনগুন শব্দটিও ছিল না স্ক্রিপ্টে। কিন্তু সেটি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ছিল সেই শব্দ। যেন কোনো সংগীত নয়, তবু এক ধরনের অশুভ সুর। এটি দৃশ্যকে আরও অর্থবহ করে তোলে। দর্শক অনুভব করে—এখানে কিছু একটা অস্বাভাবিক। কিন্তু ঠিক কী, তা বোঝা যায় না। এই অনির্দিষ্ট অস্বস্তিই দৃশ্যটিকে আরও মনে রাখার মতো করে তোলে।

নিশ্চয়ই দ্য গডফাদারের শক্তি তার গল্প, সংলাপ আর অভিনয়ে। কিন্তু একে চিরকালীন করেছে অন্য একটি বিষয়ও। সেটি হলো—অসম্পূর্ণতাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা। অপ্রত্যাশিতকে জায়গা দেওয়া। এবং সেই মুহূর্তগুলোকে শিল্পে পরিণত করা। অনেক সময় পরিকল্পনার বাইরে থাকা জিনিসই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।

সব ম্যাজিক পরিকল্পনা করে আসে না। কখনো কখনো তা নিঃশব্দে হেঁটে আসে, ক্যামেরার অগোচরে তৈরি হয়। তারপর হঠাৎই দৃশ্যের কেন্দ্রে বসে পড়ে। যেমন, সেই বিড়ালটি। যে এসে বসেছিল মার্লন ব্রান্ডোর কোলের ওপর। নিজের মতো করে গুনগুন করছিল। আর উঠেও যেতে চাইছিল না। সেই না-ওঠার মধ্যেই হয়তো তার স্থায়িত্ব লুকিয়ে আছে। একটি ছোট্ট, অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি—যা শেষ পর্যন্ত পুরো একটি চলচ্চিত্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।