নিজের কথাগুলো গানে গানে শোনাতেন যিনি

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

ঢাকা শহরের একটা সময় ছিল—যখন একদিকে এটা দ্রুত আধুনিক হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের ভেতরের নিঃসঙ্গতা, প্রেম, অপেক্ষার অনুভূতি ঠিক আগের মতোই রয়ে যাচ্ছে।

সেই সময়টার একটা নিজস্ব সাউন্ড ছিল, এক ধরনের আবহ— যা কানে না, বাজে অন্তরের ভেতরে। আমরা যখন সেই সময়ের গানগুলোর দিকে ফিরে তাকাই, খুব নিঃশব্দে, কিন্তু বারবার ফিরে আসে একটি নাম—লাকী আখান্দ। তিনি শুধু গান বানাননি; তিনি শহরের ভেতরের জীবনটাকে ধরে রেখেছিলেন নিজের সুরে।

লাকী আখান্দের সংগীতকে ‘শহুরে’ বলাটা তাই ক্লিশে না, বরং যথার্থ। কিন্তু এই শহুরে সুর কংক্রিটের মতো শক্ত না; বরং বহুস্তরীয়। এখানে জ্যাজের নরম ঢেউ আছে, রিদম অ্যান্ড ব্লুজের মসৃণ গতি আছে, আছে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকালের শৃঙ্খলা, আবার দেশীয় আবেগের কোমল টানও পাওয়া যায় এতে।

এই সবকিছুকে তিনি এমনভাবে মিশিয়েছেন, চাইলেও আলাদা করে কিছু বোঝা যায় না। সব অনুষঙ্গ একসঙ্গে মিলেই একটা সম্পূর্ণ অনুভূতি হয়ে ওঠে।

‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটি শুনলেই আমরা বুঝতে পারি—জ্যাজ শুধু কোনো বিদেশি ধারার নাম নয়, এটা একটা আবহ। পিয়ানোর কর্ডগুলো যেভাবে ধীরে ধীরে এগোয়, তার মধ্যে একটা নিঃশব্দ বিষণ্নতা কাজ করে।

যখন দিন শেষ হয়ে আসে, আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে শহরটা কিছুক্ষণ থেমে থাকে— এই গানটা যেন ঠিক সেই সময়ের। আমরা এই গান শুনতে শুনতে নিজেদের অজান্তেই সেই থেমে থাকা সময়ের অংশ হয়ে যাই।

‘নীল নীল শাড়ি পরে’—এখানে রিদম অ্যান্ড ব্লুজের প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু সেটা কোনো স্পষ্ট অনুসরণ নয়। বরং একেবারে নিজের মতো করে নেওয়া। বিটের ভেতরে যে মৃদু দোল, গানের ভেতরের মসৃণতা—এসব মিলিয়ে আমরা একটা শহুরে প্রেমের ভাষা পাই। যেখানে আবেগ প্রকাশ পায় ধীরে, সংযতভাবে।

‘তুমি আমার প্রথম প্রেমের গান’—এই গানটি মেলো রকের এক অসাধারণ উদাহরণ। এখানে গিটার আছে, কিন্তু সেটা কখনোই জোর করে সামনে আসে না। বরং একটা নরম আবেগকে ধরে রাখে। এই গানটার শেষের কী-বোর্ডটা শুনলে মনে হয়—অনেক কিছু বলা হয়নি, কিন্তু তবুও সব বলা হয়ে গেছে। শহরের ভেতরে যে নীরব প্রেমগুলো থাকে, এই গান তাদেরই প্রতিনিধি।

অন্যদিকে ‘মামনিয়া’ চপল, হালকা, মেলোডির খেলায় ভরা। এখানে আমরা লাকী আখান্দের আরেকটি দিক দেখি। তিনি শুধু গভীরতা বা বিষণ্নতা না, আনন্দকেও সমান দক্ষতায় সুরে ধরতে পারেন। এই গানটা সহজেই মুখে লেগে থাকে। কিন্তু গানটির ভেতরের সুরের বুনন খেয়াল করলে বোঝা যায়—এটা তৈরি করতে কত সূক্ষ্ম কাজ করা হয়েছে।

লাকী আখান্দ। ছবি: সংগৃহীত


ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল আর পপের মেলবন্ধনে লাকী আখান্দ ছিলেন সত্যিই অনন্য। ‘এই নীল মনিহার’, ‘নীলা কেন চোখ দুটি আঁখিজলে উঠেছে ভরে’, ‘পলাতক আমি’—গানগুলোতে আমরা একটা পরিপাটি, শৃঙ্খলাবদ্ধ কম্পোজিশন পাই। প্রতিটা নোট যেন হিসেব করে বসানো, তবুও কোথাও কৃত্রিম লাগে না। এই ভারসাম্য তৈরি করা খুব সহজ কাজ নয়।

‘আগে যদি জানিতাম’—এই গানটি সেই মিশ্রণকে আরও একধাপ এগিয়ে নেয়। এখানে মেলো রকের সঙ্গে দেশীয় ও ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল এমনভাবে মিশেছে, যেন কোনো সীমানাই নেই। গানটা ব্যক্তিগত, আবার একইসঙ্গে বিস্তৃত। শুনতে শুনতে আমরা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোর সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাই।

‘রীতিনীতি জানি না’—এই গানটিতে রক, জ্যাজ ফ্লেভার ও ক্লাসিকাল উপাদান একসঙ্গে মিশে গেছে। এখানে একটা স্পষ্ট স্বাধীনতার অনুভূতি কাজ করে। যেন নিয়ম ভাঙার মধ্যেই তিনি নিজের ভাষা তৈরি করেছেন। গানটা শুনলে মনে হয়—এটা কোনো নির্দিষ্ট ধারার মধ্যে আটকে নেই, বরং নিজেই একটা ধারা।

‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’—একটি নিখুঁত সফট ব্যালাড। এখানে অতিরিক্ত কোনো কিছু নেই, আবার কিছু কমও নেই। শব্দ আর সুর একে অপরকে জায়গা দেয়। এই গানটা যেন রাতের শেষভাগের—যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, আর আমরা নিজের ভেতরের কথাগুলো শুনতে পাই।

লাকী আখান্দের সংগীতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ব্যান্ড সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে তার কাজ। আইয়ুব বাচ্চু-র গাওয়া ‘কী করে বললে তুমি’—এখানে পপ আর মেলোডিক রকের দারুণ সমন্বয়। গিটার আছে, কিন্তু সেটা কখনোই অতি জোরালো নয়। বরং এর দায়িত্ব যেন আবেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে সাপোর্ট দিয়ে যাওয়া।

জেমস এর ‘লিখতে পারি না কোনো গান’—মেলোডিক রকের সঙ্গে একটি সূক্ষ্ম ক্লাসিকাল টাচ রয়েছে এতে। জেমসের কণ্ঠের ভাঙাচোরা আবেগ লাকী আখান্দের সুরে এক ধরনের গভীরতা পায়, যা সহজে ভোলা যায় না।

হাসান এর ‘এত দূরে যে চলে গেছ’—এখানে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল আর মেলোডিক রকের মিশ্রণ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। গানটি শুরু হয় সংযতভাবে, তারপর ধীরে ধীরে আবেগের বিস্তার ঘটে—একটা অবিস্মরণীয় যাত্রার মতো।

শুধু শহুরে আবহ নয়, লাকী আখান্দের সুরে ‘নীলাঞ্চলে ভাসি আমি’ গানটিতে আমরা ফোক ফ্লেভারও পাই। তবে সেটাও সরাসরি গ্রামীণ সুর নয়। বরং শহরের মানুষ যখন দূরের কোনো গ্রামকে মনে করে—সেই নস্টালজিয়া।

লাকী আখান্দ। ছবি: সংগৃহীত

‘কেমন আছ সন্ধ্যাতারা’ ও ‘তারাভরা রাত বৃষ্টির দিগন্তে তুমি’—এই গানগুলো মেলোডিয়াস আধুনিক গানের দারুণ উদাহরণ। এখানে কোনো জটিলতা নেই, কিন্তু একটা দীর্ঘস্থায়ী আবেশ আছে। এই গানগুলো খুব সহজেই আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। জড়িয়ে যায় কোনো নির্দিষ্ট সময়, মানুষ বা মুহূর্তের সঙ্গে।

আর আলাদা করে বলতেই হয় ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানটির কথা। এতে দেখা যায় দেশীয় ক্লাসিকাল, পপ এবং সফট রকের অনবদ্য মিশ্রণ। গানটি শুনলে মনে হয়—সবকিছু একসঙ্গে এসে একটা পূর্ণাঙ্গ অনুভূতি তৈরি করছে। এটা শুধু একটা গান নয়, বরং একটা আলাদা অনুভূতি, সম্পূর্ণ এক অভিজ্ঞতা।

এই যে এত রকম জঁরা—জ্যাজ, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ, মেলো রক, ফোক, ক্লাসিকাল, পপ; সবকিছু নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। কিন্তু কোথাও কোনো বাড়তি প্রদর্শনী মনোভাব নেই। তিনি জঁরাকে ব্যবহার করেছেন ভাষা হিসেবে। যে অনুভূতিটা তিনি বলতে চেয়েছেন, সেটার জন্য যে সুর দরকার—সেটাই বেছে নিয়েছেন।

এই কারণেই তার গানগুলো এত ব্যক্তিগত লাগে। আমরা শুনতে শুনতে মনে করি—এই গানটা যেন আমাদেরই জন্য তৈরি। শহরের ভিড়ের মধ্যেও যে একাকিত্ব, সেই অনুভূতিটাকে তিনি এত নিখুঁতভাবে ধরেছেন যে, তা সময় পেরিয়েও পুরোনো হয় না।

বাংলা গানে অনেক বড় কণ্ঠ এসেছে, অনেক জনপ্রিয় সুরকারও। কিন্তু লাকী আখান্দের জায়গাটা আলাদা। কারণ তিনি শব্দের চেয়ে নীরবতাকে, উচ্চারণের চেয়ে অনুভূতিকে, আর ভিড়ের চেয়ে একাকিত্বকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

ঢাকার রাত যখন একটু থেমে যায়, যখন দূরের কোনো আলো স্থির হয়ে থাকে, আর আমরা নিজের ভেতরের কথাগুলো শুনতে শুরু করি—সেই মুহূর্তে যে গানটা ভেসে আসে, সেটার পেছনে খুব সম্ভবত লাকী আখান্দই থাকেন।