কেন একই ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে আসে
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিলেই চোখে পড়ে পরিচিত দৃশ্য—ফেসবুকের নিউজফিড, ইউটিউবের রিকমেন্ডেশন, টিকটকের শর্ট ভিডিও।
প্রতিদিনই যেন একই গল্প, একই সুর, একই মত। যে রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি, সেই রাজনীতির পোস্টই বেশি ভেসে ওঠে। যে গান ভালো লাগে, তার মতো গানই বারবার সামনে আসে। যে মতাদর্শে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, সেই কথাই ঘুরে ফিরে সামনে আসে।
এটা কি কাকতালীয়? না—এটাই অ্যালগরিদমের কাজ।
অ্যালগরিদম কীভাবে আমাদের চিনে ফেলে
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের প্রতিটি ডিজিটাল আচরণ লক্ষ করে। কোন পোস্টে আমরা থামি, কোন ভিডিও শেষ পর্যন্ত দেখি, কোথায় লাইক দিই, কী এড়িয়ে যাই—সবকিছুই নোট করা হয়।
এই তথ্য দিয়েই তৈরি হয় আমাদের একটি ডিজিটাল প্রোফাইল।
আমরা কী পছন্দ করি, কী অপছন্দ করি, কোন বিষয়ে আমরা উত্তেজিত হই—সবই সেখানে জমা থাকে। অ্যালগরিদমের লক্ষ্য খুব সরল—আমাদের যত বেশি সময় স্ক্রিনে আটকে রাখা যায়।
আর সেটার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, যেটা আমরা আগেও পছন্দ করেছি, সেটারই আরেকটা সংস্করণ দেখানো।
নতুন বা ভিন্ন কিছু দেখানোর ঝুঁকি নেওয়ার দরকার পড়ে না। নিরাপদ পথই বেছে নেয় অ্যালগরিদম।
ফিল্টার বাবল: নিজের বানানো অদৃশ্য দেয়াল
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক ফল হলো ফিল্টার বাবল। এটি একটি অদৃশ্য বলয়, যার ভেতরে আমরা শুধু নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনি। আর ভিন্নমত, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, ভিন্ন বাস্তবতা ধীরে ধীরে আমাদের টাইমলাইন থেকে হারিয়ে যায়।
আমাদের মনে হতে থাকে—'সবাই তো আমার মতোই ভাবে।' কিন্তু বাস্তবতা হয়তো ঠিক উল্টো।
মতাদর্শিক বিভাজন বাড়াচ্ছে অ্যালগরিদম
রাজনীতি, ধর্ম, সামাজিক ইস্যু—সব ক্ষেত্রেই অ্যালগরিদম বিভাজনকে আরও গভীর করে তুলছে। একই ঘটনার দুই রকম ব্যাখ্যা, দুই রকম 'সত্য'—ভিন্ন ভিন্ন মানুষ দেখছে ভিন্ন ভিন্ন ফিডে।
এর ফলাফল স্পষ্ট—যুক্তির জায়গা নেয় আবেগ, আলোচনার জায়গা নেয় ঝগড়া আর মতভেদের জায়গা নেয় ঘৃণা।
আমরা ভাবি মানুষ বদলে গেছে। অথচ অনেক সময় বদলে গেছে শুধু আমাদের ফিড।
সংবাদ দেখার অভ্যাসও বদলে গেছে
একসময় মানুষ খবর খুঁজে নিত। এখন অ্যালগরিদমের হাত ধরে খবর নিজেই আমাদের খুঁজে নেয়। কিন্তু সেই খবর কতটা পূর্ণাঙ্গ?
অ্যালগরিদম 'গুরুত্বপূর্ণ' খবর দেখায় না, দেখায় 'আকর্ষণীয়' খবর। যেটা বেশি রিঅ্যাকশন, শেয়ার বা ক্ষোভ তৈরি করবে—সেটাই এগিয়ে আসে। ফলে আমরা গুরুত্ব নয়, উত্তেজনার পেছনে দৌড়াই।
এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া কি সম্ভব
পুরোপুরি হয়তো নয়। কিন্তু সচেতন হলে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্নমত অনুসরণ করা জরুরি।
শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতেই নয়, নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম পড়তে হবে। রিকমেন্ডেশনের বাইরে গিয়ে কনটেন্ট খোঁজার মতো কাজও করতে হবে।
'সবাই এমনই ভাবে'—এই ধারণাকে প্রশ্ন করার অভ্যাসও তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি—নিজের চিন্তাকে অ্যালগরিদমের হাতে তুলে না দেওয়া। অ্যালগরিদম আমাদের শত্রু নয়। কিন্তু অন্ধভাবে তার ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে বড় বিপদ।
সচেতন না হলে অ্যালগরিদম শুধু আমাদের কনটেন্ট নয়—আমাদের চিন্তাভাবনাও নিয়ন্ত্রণ করবে।
আর তখন প্রশ্ন থাকবে একটাই—আমরা কি সত্যিই নিজের মতো করে ভাবছি, নাকি আমাদের ভাবানো হচ্ছে?