নতুন বছরে ক্যারিয়ার-অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা গোছাবেন যেভাবে

অনিন্দিতা চৌধুরী
অনিন্দিতা চৌধুরী

ক্যালেন্ডারের দিনকাল ঘুরেফিরে আসে। বদলে যায় বছরের সংখ্যা। মনে মনে যখন অনেকেই পড়ে আছে নাইন্টিস কিডদের শৈশব কিংবা গ্রাজুয়েশনের ঠিক আগেকার সময়টাতে—তখন সময় পাল্টে বছরের ঘর এখন এক বছরের জন্য ২০২৬। নতুন বছরে নতুন জল্পনা-কল্পনায় ভরপুর থাকে। সেইসঙ্গে পুরোনো ব্যর্থতা, হতাশাকে পাড়ি দিয়ে মনে হয় যেন আরেকটা সুযোগ পাওয়া গেল, নতুন করে নিজের পড়াশোনা, কাজকর্ম ও ব্যক্তিজীবনটাকে গুছিয়ে তোলার।

কিন্তু কীভাবে? ইচ্ছে তো শতভাগ পাকা, কিন্তু বাস্তবায়নটা কীভাবে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেওয়া যাক।

অ্যাকাডেমিক জীবন

আপনার কি গত বছরের কোনো ব্যাকলগ পড়ে আছে? এমন কোনো কোর্সের ইমপ্রুভমেন্ট, যা সরিয়ে রাখতে রাখতে মাথার ওপর বিশাল এক বিপদ হয়ে ঝুলছে? আর দেরি না করে, বছরের শুরুতেই প্রস্তুতি নিয়ে ফেলুন। কীভাবে কী করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফিসে খোঁজ নিয়ে নিন। প্রয়োজন হলে জুনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে তাদের ক্লাসের আপডেট জেনে নিন।

এমন অনেক কিছুই আমরা ফেলে রাখি, শুধু করা হয় না বলে। একে আলসেমি বলা যায়, উদাসীনতা বলা যায়—আসলে নাম দিলে অনেক নামই দেওয়া যায়। কিন্তু নামকরণের আতিশয্যে না গিয়ে এবার বরং অ্যাকাডেমিক জীবনের নিয়ন্ত্রণটা নিজের হাতে নেওয়া জরুরি। যতই আমরা নিজেকে ছাত্রজীবনে যাচ্ছেতাই করে বেড়ানোর স্বাধীনতা দিয়ে রাখি না কেন, মনে রাখতে হবে, পরবর্তী জীবনের অনেকটাই নির্ভর করছে এই সময়টার ফলাফলের ওপর। তাই সে ফলাফল আকাশচুম্বী না হোক, অন্তত নিজের যোগ্যতার সাপেক্ষে যেন সন্তোষজনক হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

আবার অনেকেই হয়তো পোস্ট-গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন বেশ কয়েক বছর হলো। খণ্ডকালীন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকলেও মনে ইচ্ছে, দেশের বাইরে পড়তে যাবেন। কিন্তু ইচ্ছের সঙ্গে প্রস্তুতি একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কবেকার কিনে রাখা আইএলটিএস বা জিআরইর বইগুলো থেকে ধুলো ঝেড়ে ফেলে পূর্ণ উদ্যমে শুরু করুন। সময় বেঁধে দিন নিজেকে, এ বছর শেষের আগে নিজেকে অনেকটা ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আর যা-ই হোক, এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাটা ভালোভাবে করবেন।

ক্যারিয়ার

কাজের ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই হয়তো অনেক বছর ধরে এক জায়গায় আটকে থাকি। কোথাও একটা কমফোর্ট জোন এসে যায়, সেখানে ঠিকঠাক মর্যাদা বা প্রাপ্তি না জুটলেও একধরনের জড়তা কাজ করে অন্য কোথাও আবেদনপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও। এই জড়তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কেননা কর্মক্ষেত্রে যদি প্রতি বছর দৃশ্যমান কিছু উন্নতি না হয়, সেক্ষেত্রে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—আমি কি ঠিকভাবে কাজ করছি? নাকি এই জায়গাটাই আমার জন্য নয়?

স্থবিরতা নয়, গতিময়তাই হচ্ছে জীবনের মূলকথা। প্রায় সব সিনেমাটিক ভাইভাতেই দেখা যায়, প্রার্থীকে প্রশ্ন করা হচ্ছে—পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখেন? এই প্রশ্নটির পেছনের মনস্তত্ত্বটি খুব স্পষ্ট। আসলে তারা প্রার্থীর দূরদর্শিতা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওজনটা যাচাই করেন। ঠিক একইভাবে প্রতি বছরের শুরুতে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এ বছরের শেষে ক্যারিয়ার গ্রাফে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি, স্থানান্তর—নাকি অন্য কিছু? এমনও হতে পারে, আপনি হয়তো নতুনভাবে ক্যারিয়ারকে পরখ করে দেখতে চাচ্ছেন। এ প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে সেটিও দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং আপনি স্পষ্টভাবে দেখতে পারবেন, আপনার নির্দিষ্ট লক্ষ্য কোন জায়গায় সবচেয়ে বেশি মানানসই আপনার জন্য।

ব্যক্তিগত জীবন

আসলে পড়াশোনা, কাজকর্ম, স্বপ্ন দেখা, তা পূরণ করা—এসবই আদতে একজন ব্যক্তির সামগ্রিকতার বিভিন্ন আলাদা অংশ। এগুলোর বাইরেও যা থাকে, তা হচ্ছে নিজের মন-মেজাজ, আশপাশের প্রিয়জনকে ঘিরে থাকা একান্ত ব্যক্তিগত একটি জীবন। সেই জীবনেও নতুন বছরে ভিন্ন ভিন্নভাবে এগোনো যায়। হয়তো বছরের ছুটিগুলো দেখে এখন থেকেই ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনাটা সেরে ফেলতে পারেন, কিংবা কীভাবে পারিবারিকভাবে আর্থিক সঞ্চয় করবেন, সে ছকটাও কষে ফেলা যায়।

এ ছাড়া মনের খোরাক, শারীরিক যত্নের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতেও ছোটবড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা যায়। হতে পারে, এ বছর আপনি কয়টি বই পড়বেন বা কয়টি নতুন জায়গায় ঘুরতে যাবেন—কত কেজি ওজন কমাবেন, কতটা পথ হাঁটবেন ইত্যাদি।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন হাস্যরসাত্মক পোস্টে দেখা যায়, বছর বদল সম্পর্কে এক ধরনের হতাশাজনক মনোভাব। 'আগেও যা ছিলাম, এখনো তা-ই আছি' কিংবা 'শুধু রাত ১২টাই নিউ ইয়ার, বাকি সব বোগাস'—এমন সব কথাবার্তা। কথাগুলো একেবারে ভুল, তা নয়। কিন্তু কেউ যদি এই ক্যালেন্ডারের মাইলফলককেই নিজের জীবন গোছানোর ক্ষেত্রে খুব চৌকসভাবে ব্যবহার করতে পারে, তবে তার জন্য অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়। বছরবদলের এই পাঁয়তারায় নিউ ইয়ারের স্পিরিট এখনো ভালোমতোই বজায় আছে। তাই, এই শীত শীত আবহাওয়ায়, বাসার সামনের মাঠে কাঠকয়লার আগুন পোহাতে পোহাতে ঠিক করে নিন, আপনার এ বছরের পরিকল্পনা।