পুরোনো সম্পর্ক বলেই কি থেকে যেতে হবে?
একটা সম্পর্ক যখন অনেক দিনের, তখন সেটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে যায়। পাঁচ, সাত কিংবা দশ বছর একসঙ্গে থাকার পর যদি মনে হয়, সম্পর্কটায় আর ভালো নেই, তখনো সহজে বেরিয়ে আসা যায় না। মনে হয়, এত দিনের সম্পর্ক কি এভাবে শেষ করা যায়?
কারণ দীর্ঘদিনের সম্পর্কে শুধু ভালোবাসা নয়, আরও অনেক কিছু জড়িয়ে যায়। অসংখ্য স্মৃতি থাকে, একসঙ্গে গড়ে ওঠা অভ্যাস থাকে, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় থাকে, থাকে ভবিষ্যৎ নিয়ে করা নানা পরিকল্পনা। তাই এমন সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবলেও মনে হতে পারে, জীবনের একটা বড় অংশই বুঝি ফেলে দিতে হচ্ছে। কিন্তু একটি সম্পর্ক অনেক দিনের, এটিই কি সেখানে থেকে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ?
‘এত বছর দিয়েছি’ ভাবনা
ধরুন, কেউ ছয় বছর ধরে একটি সম্পর্কে আছেন। প্রথম কয়েক বছর ভালো কেটেছে। কিন্তু এখন নিয়মিত ঝগড়া হচ্ছে, একজন আরেকজনের কথা বুঝতে চাইছেন না, ভবিষ্যৎ নিয়েও দুজনের চাওয়া আলাদা। তারপরও সম্পর্ক শেষ করার কথা ভাবলেই মনে হচ্ছে, ‘ছয়টা বছর দিলাম, এখন ছেড়ে দিলে সবই তো নষ্ট।’
এই ভাবনার সঙ্গে অর্থনীতির ‘সাঙ্ক কস্ট’ ধারণার মিল আছে। কোনো কিছুতে ইতোমধ্যে অনেক সময়, অর্থ বা শ্রম দিয়েছি বলে সেটি আর আমাদের জন্য ভালো না হলেও আমরা তা ছেড়ে দিতে চাই না।
কিন্তু সম্পর্কে কত বছর কেটেছে, তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে সামনে কী আছে। নিজেকে তাই প্রশ্ন করা যায়, এই সম্পর্কটা ঠিক আজ যেমন আছে, তেমনই যদি আগামী পাঁচ বছর থাকে, আমি কি তাতেও থাকতে চাই?
মানুষটাকে চাই, নাকি পরিচিত জীবনটা?
দীর্ঘ সম্পর্ক একসময় দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যায়। সকালে কার মেসেজ আসবে, মন খারাপ হলে কাকে ফোন করবেন, ছুটির দিনে কার সঙ্গে বের হবেন, সবই প্রায় ঠিক করা থাকে। তাই সম্পর্ক শেষ হওয়ার ভয় সব সময় শুধু মানুষটিকে হারানোর ভয় নয়। এর সঙ্গে পরিচিত একটা জীবন হারানোর ভয়ও থাকে। আবার নতুন করে একা থাকা, বন্ধুদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, পরিবারকে জানানো কিংবা ভবিষ্যৎ নতুন করে ভাবার ঝামেলাও আছে। এসবের কারণে কখনো কখনো আমরা সম্পর্কটি চাই কি না, আর সম্পর্কের বাইরের জীবনকে ভয় পাচ্ছি কি না, দুটো আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমি কি সত্যিই এই মানুষটির সঙ্গে থাকতে চাই, নাকি তাকে ছাড়া জীবনটা কেমন হবে, সেটাই আমাকে বেশি ভয় দেখাচ্ছে?
মানুষ বদলায়, সম্পর্কও বদলায়
পাঁচ বছর আগে দুজন মানুষ যে জায়গায় ছিলেন, পাঁচ বছর পরও যে ঠিক সেখানেই থাকবেন, এমন নয়। কারও ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনা বদলাতে পারে, কেউ অন্য দেশে থাকতে চাইতে পারেন, কারও বিয়ে বা সন্তান নিয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারে। জীবনযাপন, মূল্যবোধ কিংবা ভবিষ্যতের লক্ষ্যও বদলাতে পারে।
এই পরিবর্তন মানেই কেউ খারাপ হয়ে গেছেন, তা নয়। কখনো কখনো দুজন ভালো মানুষও সময়ের সঙ্গে এমন দুই দিকে এগিয়ে যেতে পারেন, যেখানে একসঙ্গে ভবিষ্যৎ তৈরি করা কঠিন। এখানে পুরোনো স্মৃতি দিয়ে বর্তমানের অমিল মেটানো সব সময় সম্ভব হয় না। একসময় দুজন খুব ভালো ছিলেন, সেটি সত্যি। একইসঙ্গে এখন আর আগের মতো মানানসই নন, সেটিও সত্যি হতে পারে।
সমস্যা আর সম্পর্কের ধরন এক নয়
কোনো সম্পর্কেই সব সময় সবকিছু ঠিক থাকবে না। কাজের চাপ, দূরত্ব, অর্থনৈতিক সমস্যা, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত কঠিন সময় সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। এমন সময় পাশে থাকা এবং সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করাটাই স্বাভাবিক। তবে সাময়িক কঠিন সময় আর দীর্ঘদিন ধরে চলা একই সমস্যার মধ্যে পার্থক্য আছে।
একই অসম্মান বারবার হচ্ছে কি না, কথা বলেও কিছু বদলাচ্ছে কি না, একজনই সব সময় সমঝোতা করছেন কি না, নিজের প্রয়োজন বা মতামত বলতে ভয় হচ্ছে কি না, এগুলো দেখা জরুরি। বিশেষ করে সমস্যা নিয়ে কথা বলার পর দুজনের আচরণে পরিবর্তন আসছে কি না, সেটি অনেক কিছু বলে দেয়। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব একজনের হতে পারে না।
সম্পর্ক শেষ হওয়া মানেই কি ব্যর্থতা?
এখানেই হয়তো সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি। দীর্ঘ সম্পর্ক শেষ হলে অনেকেরই মনে হয়, এত বছরের চেষ্টা তাহলে ব্যর্থ হলো। কিন্তু সব সম্পর্কের সাফল্য কি শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকা দিয়ে মাপতে হবে? কোনো সম্পর্ক হয়তো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বছর সুন্দর করেছে। সেই সম্পর্ক থেকে কেউ নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছেন, কঠিন সময় পার করেছেন, ভালোবাসা পেয়েছেন এবং দিয়েছেন। পরে সেই সম্পর্ক আর কাজ না করলেও আগের বছরগুলো অর্থহীন হয়ে যায় না। সম্পর্ক শেষ হওয়া আর সম্পর্কটি কখনোই মূল্যবান ছিল না, এই দুটো এক কথা নয়।
সিদ্ধান্তটা বর্তমানেরও
পুরোনো সম্পর্ককে হুট করে ছেড়ে দেওয়া যেমন সমাধান নয়, তেমনি শুধু পুরোনো বলেই আঁকড়ে থাকাও সমাধান নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাই সম্পর্কের বয়সের পাশাপাশি বর্তমানটাও দেখা দরকার। এখন কি দুজনের মধ্যে সম্মান আছে? কথা বলার জায়গা আছে? ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন কোনো মিল আছে, যার ওপর দুজন এগোতে পারেন? সবচেয়ে বড় কথা, দুজনই কি এই সম্পর্কটায় থাকতে এবং এর জন্য কাজ করতে চান?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে সম্পর্কটিকে আরেকটু সময় দেওয়া, সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এবং দুজন মিলে সমাধানের চেষ্টা করাই হতে পারে ভালো সিদ্ধান্ত। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে খারাপ সময় আসতেই পারে। সেই সময়টুকু পার করার চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্ককে আরও শক্তও করতে পারে। আর যদি দেখা যায়, চেষ্টা শুধু একজনই করে যাচ্ছেন, একই সমস্যা বারবার ফিরে আসছে, কিংবা সম্পর্কটিতে সম্মান ও স্বস্তির জায়গাটাই আর নেই, তখন শুধু ‘এত বছর একসঙ্গে আছি’ এই একটি কারণে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাও নতুন করে ভাবা যেতে পারে।






