লিসা থেকে ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’, যেভাবে বিশ্বজুড়ে ছড়াচ্ছে থাইল্যান্ডের প্রভাব
সংস্কৃতিকে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে থাইল্যান্ড। জাপানের অ্যানিমে ও দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপের মতো সাংস্কৃতিক রপ্তানি বিশ্বজুড়ে এশিয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পর্যটক আকর্ষণের প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য ছিল থাইল্যান্ড। তবে অবকাঠামোর উন্নয়ন, নমনীয় ভিসানীতি এবং আকাশপথে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোও পর্যটন খাতে এগিয়ে এসেছে।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক ভ্রমণ করা দেশের তালিকায় থাইল্যান্ডকেও ছাড়িয়ে যায় মালয়েশিয়া। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটন খাতে গতি ফেরাতে সাংস্কৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে নতুনভাবে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছে থাই সরকার ও দেশটির নাগরিকেরা।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডের সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের এই প্রবণতাকে ‘টি-ওয়েভ’ বলা হচ্ছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে। একসময় থাইল্যান্ডের সফট পাওয়ার বলতে মূলত দেশটির খাবারকেই বোঝানো হতো। তবে ২০২৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্রেথা থাভিসিনের আমলে গঠন করা হয় ন্যাশনাল সফট পাওয়ার স্ট্র্যাটেজি কমিটি। খাবার, উৎসব, সংগীত, চলচ্চিত্র, ফ্যাশন ও পর্যটনসহ ১৩টি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করে কমিটি।
লিসা ও হলিউডে বাড়ছে থাইল্যান্ডের প্রভাব
কমিটি গঠনের পর থেকে চলচ্চিত্রশিল্পের বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা দিয়ে আসছে থাই সরকার। দেশটিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যয় এবং স্থানীয় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগদ প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে। এসব নীতির ফলে এইচবিওর ধারাবাহিক ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর তৃতীয় মৌসুম এবং ইউনিভার্সাল পিকচার্সের ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড: রিবার্থ’-এর মতো বড় বাজেটের প্রযোজনাকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে থাইল্যান্ড। এসব চলচ্চিত্র ও সিরিজে দেশটির গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে পর্যটনেও। কো সামুই দ্বীপে চিত্রায়িত ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’ মুক্তির পর দ্বীপটি নিয়ে অনলাইনে অনুসন্ধান বেড়ে যায় ৮৮ শতাংশ। একই সময়ে দ্বীপটিতে পর্যটকের সংখ্যা ৩০০ শতাংশ বেড়ে যায় বলে জানিয়েছে সিএনএন।
থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষের নিউইয়র্ক কার্যালয়ের কর্মকর্তা স্টিভ জনসন সিএনএনকে বলেন, বিনোদনভিত্তিক গণমাধ্যমের জনপ্রিয়তা থাইল্যান্ডের পর্যটনকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে বড় ভূমিকা রাখছে।
থাইল্যান্ডের বিনোদনশিল্পের কথা উঠলে উঠে আসে লালিসা মানোবালের নাম। বিশ্বজুড়ে ‘লিসা’ নামে পরিচিত এই সংগীত তারকা ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর তৃতীয় মৌসুমে অভিনয়ে অভিষেক ঘটান। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি তৈরি হয়েছিল আরও আগেই, জনপ্রিয় নারী সংগীতদল ব্ল্যাকপিংকের সদস্য হিসেবে। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তার একক গান ‘সাওয়াদিকা’ ইউটিউবে মাত্র দুই দিনে ১০ কোটির বেশি বার দেখা হয়েছে। গানটির নাম নেওয়া হয়েছে থাই নারীদের প্রচলিত সম্ভাষণ ‘সাওয়াদিকা’ থেকে।
থাইল্যান্ডের মাহিদোল বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারন্যাশনাল কলেজের প্রভাষক ড্যানিয়েল কারমিনাতি সিএনএনকে বলেন, পৃথিবীর প্রায় যে কাউকে থাইল্যান্ড সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা সম্ভবত লালিসার নাম উল্লেখ করবেন। সফট পাওয়ার ও জনকূটনীতি নিয়ে কাজ করা এই শিক্ষকের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার বিটিএসের মতো লিসাও দেখিয়েছেন, সাংস্কৃতিক তারকারা কীভাবে নিজ দেশের পরিচিতি আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে দিতে পারেন।
‘সাওয়াদিকা’ গানের ভিডিওতে মুয়াই থাইয়ের যোদ্ধা, টুকটুক এবং ঐতিহ্যবাহী থাই পোশাকের মতো পরিচিত সাংস্কৃতিক উপাদান তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক পপসংগীতের জনপ্রিয় ধারাকে কাজে লাগিয়ে লাখো মানুষের কাছে থাইল্যান্ডের সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীতের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের সংস্কৃতি পৌঁছে যাচ্ছে নতুন দর্শকের কাছে। অন্যদিকে, সুস্থতা ও শরীরচর্চাভিত্তিক নানা আয়োজনও দেশটিতে অভিজ্ঞ পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কারণ। থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষের মতে, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় এটি দেশটির বড় একটি সুবিধা।
স্টিভ জনসনের ভাষ্য, সুস্থতা ও শরীরচর্চাভিত্তিক পর্যটনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড। ৬ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক সুস্থতা অর্থনীতিতে দেশটি দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোর মধ্যে সপ্তম।
থাইল্যান্ডে রয়েছে উষ্ণ পানির প্রাকৃতিক ঝরনা, শরীরকে সুস্থ রাখতে বিশেষ অবকাশকেন্দ্র এবং ভেষজ চিকিৎসার নানা ব্যবস্থা। ফলে বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্রে ম্যাসাজ বা যোগব্যায়ামের বাইরেও দেশটির সুস্থতাভিত্তিক পর্যটনের পরিসর বিস্তৃত। জনসন বলেন, চিয়াং মাই থেকে হুয়া হিন পর্যন্ত থাইল্যান্ডের প্রতিটি জায়গারই সুস্থতাভিত্তিক পর্যটনে আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
২০২৫ সালে এক ভাষণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা বলেন, ‘আমরা থাইল্যান্ডকে বৈশ্বিক সুস্থতা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছি। এখানে শুধু চিকিৎসা নয়, বরং আরও ভালোভাবে সুস্থ থাকার অভিজ্ঞতাও দেওয়া হবে।’
কতটা বদলাবে অর্থনীতি
তবে প্রশ্ন হলো, সংস্কৃতির প্রতি এই আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারবে কি না। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কে-ওয়েভ’ বা কোরীয় সাংস্কৃতিক প্রভাবের আদলে থাইল্যান্ডের ‘টি-ওয়েভ’ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনৈতিক সাফল্য থাইল্যান্ড অর্জন করতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
মাহিদোল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উইলিয়াম জে জোনস সিএনএনকে বলেন, থাইল্যান্ডের সম্ভাবনা অনেক। ঐতিহাসিকভাবে দেশটির অন্যতম শক্তি হলো উন্মুক্ত সমাজ ও অর্থনীতি এবং বিদেশিদের স্বাগত জানানোর সংস্কৃতি। এসব বৈশিষ্ট্য পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভঙ্গুর হতে পারে। পর্যটনের বাইরেও অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন বৃহত্তর উন্নয়ন, সরকারি বিনিয়োগ এবং নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন।
জোনস বলেন, থাইল্যান্ড নিজেকে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোরও একই ধরনের লক্ষ্য রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে কোন দেশ কতটা কার্যকরভাবে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, তার ওপর।
প্রযুক্তি ও পর্যটন খাতে নানা উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও থাইল্যান্ডের সবচেয়ে স্বতন্ত্র শক্তি হতে পারে এমন একটি বিষয়, যা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা কঠিন। সেটি হলো, দেশটিতে ভ্রমণকারীদের সরাসরি সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ। এই আকর্ষণকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাবে রূপ দিতে হলে থাইল্যান্ডকে তার বিদ্যমান সাংস্কৃতিক শক্তির ওপর আরও জোর দিতে হবে।
উইলিয়াম জে জোনসের ভাষ্য, থাইল্যান্ডের দীর্ঘস্থায়ী শক্তি এখনো ‘তার সংস্কৃতি, খাবার ও প্রাকৃতিক দৃশ্য’।