নতুন বছরে সলো ট্যুরে যেতে পারেন যে ১২ জায়গায়

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

একলা ভ্রমণ এখন আর কোনো সমঝোতা বা সিঙ্গেল সাপ্লিমেন্টের সমস্যা নয়। বরং এটি এক ধরনের মুক্তি, ক্ষমতায়ন আর নিজের জীবনের ওপর পূর্ণ অধিকার নেওয়ার অভিজ্ঞতা। একা ভ্রমণ মানে হলো—কোথায় যাবেন, কখন খাবেন, কী দেখবেন, কতক্ষণ চুপ করে থাকবেন—সব সিদ্ধান্ত আপনার।

আপনি যদি সূর্যের আলো চান, সংস্কৃতির স্বাদ চান, লং-হল অ্যাডভেঞ্চার চান বা নিছক কয়েকদিনের নিস্তব্ধতা—২০২৬ সালে একা ভ্রমণের জন্য দারুণ কিছু গন্তব্য অপেক্ষা করছে৷ চলুন, দেখে নেওয়া যাক এমন ১২টি জায়গা, যেখানে আপনি একাই ঘুরতে যেতে পারেন।

১. লিসবন 

একা ভ্রমণের প্রথম অভিজ্ঞতার জন্য পর্তুগালের রাজধানী লিসবন একেবারে আদর্শ শহর। ইউরোপের অন্যান্য শহরের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, রোদেলা এবং মানুষের ব্যবহার উষ্ণ। শহরটি হাঁটাচলার জন্য খুবই আরামদায়ক। ফলে একা ঘোরার সময় অচেনা লাগার সুযোগ কম। সকাল শুরু হতে পারে টাইম আউট মার্কেটে, যেখানে খাবার, কফি আর স্থানীয় জীবনের ছন্দ একসঙ্গে পাওয়া যায়। ভিনটেজ ট্রামে চড়ে শহরের উঁচু মিরাদোরোগুলোতে উঠলে লাল ছাদের লিসবন একা দাঁড়িয়ে দেখার অনুভূতিটা গভীর হয়। প্রিন্সিপে রিয়াল এলাকায় ছোট বুটিক, শিল্পকর্ম আর সুগন্ধির দোকান ঘুরে সময় কেটে যায়। সন্ধ্যায় বাইরো দো অ্যাভিলেয বা সারভেজারিয়া রামিরো-তে ডিনার একা হলেও অস্বস্তিকর নয়। স্থানীয়রা সহানুভূতিশীল, ইংরেজি বোঝে, আর দিনভ্রমণে সহজেই সিন্ত্রা বা ক্যাসকাইসে যাওয়া যায়—যা একা ভ্রমণকারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

২. কোস্টা রিকা

ল্যাটিন আমেরিকার নাম শুনে অনেক একা ভ্রমণকারী দ্বিধায় পড়েন। কিন্তু কোস্টা রিকা সেই ভয় কাটানোর জায়গা। 'পুরা ভিদা' দর্শন এখানে শুধু কথার কথা নয়—মানুষের আচরণেই তা ধরা পড়ে। ছোট গ্রুপভিত্তিক সংগঠিত ভ্রমণ একা যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক। মন্টেভার্দের ক্লাউড ফরেস্টে জিপলাইনে উড়ে যাওয়া, ঝুলন্ত সেতুতে হাঁটা কিংবা ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও উদ্যানে বন্যপ্রাণী দেখা—সবকিছু পরিকল্পিত হওয়ায় চিন্তা কম। আরেনাল অঞ্চলের উষ্ণ প্রস্রবণে দিনশেষে শরীর ও মন দুটোই আরাম পায়। সকালে টুকান পাখির দেখা বা ভোরে বানরের ডাক—এগুলো একা থাকলে আরও গভীরভাবে অনুভব করা যায়। চাইলে দলের সঙ্গে মিশবেন, চাইলে একা সূর্যাস্ত দেখবেন। প্রকৃতির ভেতরে থেকেও নিজেকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত মনে হয়—এটাই কোস্টা রিকার সবচেয়ে বড় শক্তি।

৩. লোয়ার ভ্যালি

ভিড়, সময়সূচি আর চেকলিস্টের বাইরে গিয়ে যদি সত্যিকারের বিশ্রাম চান, লোয়ার ভ্যালি আপনার জায়গা। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে অল্প দূরত্বে বনভূমির ভেতরে ছড়িয়ে থাকা কাঠের লজগুলো একা ভ্রমণকারীর জন্য এক ধরনের আশ্রয়। এখানে সকাল শুরু হয় দড়িতে ঝুলে আসা নাশতায়, যা একাই উপভোগ করার মতো শান্ত। দিন কাটে ফরেস্ট বাথিং, সাইক্লিং, স্থানীয় খামার দেখা আর ধীরে ধীরে হাঁটাহাঁটিতে। শীতকালে নর্ডিক বাথ বা গরম পানিতে বসে চারপাশের গাছপালা দেখার অভিজ্ঞতা গভীর প্রশান্তি দেয়। সন্ধ্যায় কাঠের আগুন, ফরাসি খাবার আর নীরবতা—এখানে কথোপকথনের চেয়ে ভাবনাই বেশি। একা থাকা এখানে নিঃসঙ্গতা নয়, বরং নিজের ভেতরে ঢোকার সুযোগ। যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্ত, তাদের জন্য এই জায়গা মানসিক পুনর্গঠনের মতো কাজ করে।

৪. মরক্কো

মরক্কো একা ভ্রমণকারীদের জন্য সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা। মারাকেশের মদিনায় প্রথম দিন কিছুটা বিভ্রান্তিকর লাগলেও স্থানীয় গাইডের সঙ্গে ঘুরলে শহরের ছন্দ ধরা পড়ে। সুকের রঙ, মশলার গন্ধ আর ছাদের ওপর বসে চা খাওয়ার মুহূর্ত একা হলেও একঘেয়ে নয়। রিয়াদে থাকা মানে ব্যক্তিগত পরিসরের ভেতর সামাজিক উষ্ণতা পাওয়া। কয়েকদিন পর আটলাস পর্বতে যাত্রা করলে দৃশ্যপট বদল যায়—শান্ত পাহাড়ি পথ, বারবার গ্রাম আর ধীরে রান্না হওয়া ট্যাজিন। অনেক ট্যুরেই সাহারা মরুভূমির বালিয়াড়িতে উটের পিঠে চড়া আর আকাশভরা তারার নিচে রাত কাটানোর সুযোগ থাকে। একা ভ্রমণকারী হিসেবে এখানে আপনি নিরাপদ বোধ করবেন, আবার একইসঙ্গে সংস্কৃতির গভীরতাও উপভোগ করবেন—যা এই অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে তোলে।

৫. টোকিও

জাপানের রাজধানী টোকিও সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে একাকীত্ব-বান্ধব শহর। এখানে একা খাওয়া, একা ঘোরা বা একা বসে থাকা—কিছুই অস্বাভাবিক নয়। রামেন দোকানে ব্যক্তিগত বুথ, সুশি কাউন্টারে নীরব খাবার—সবই একা মানুষের জন্য তৈরি। শিবুয়া ক্রসিংয়ের বিশাল ভিড়েও আপনি বিচ্ছিন্ন বোধ করবেন না, বরং শহরের ছন্দে মিশে যাবেন। দাইকানইয়ামার বইয়ের দোকান, ছোট ক্যাফে আর ডিজাইন স্টোর একা সময় কাটানোর জন্য আদর্শ। চাইলে বুলেট ট্রেনে চড়ে কিয়োটো গিয়ে মন্দির আর চা-ঘরের শান্ত পরিবেশে ডুবে থাকা যায়। নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা আর সৌজন্যের কারণে টোকিওতে একা ভ্রমণ মানে চাপমুক্ত থাকা। এখানে আপনাকে কেউ প্রশ্ন করে না কেন একা—এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি।

৬. উগান্ডা

উগান্ডা সাফারি মানে ভিড়ের বাইরে গিয়ে প্রকৃতির মুখোমুখি হওয়া। এখানে অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে শান্ত ও ব্যক্তিগত। বিউইন্ডি অরণ্যে গরিলা ট্র্যাকিং একা ভ্রমণকারীর জন্য এক গভীর অনুভূতির মুহূর্ত—নীরবতা, শ্বাসের শব্দ আর চোখে চোখ রাখার অভিজ্ঞতা। কুইন এলিজাবেথ উদ্যানে গাছে ওঠা সিংহ বা সূর্যাস্তে নদীতে জলহস্তী দেখা ধীর গতির, কিন্তু তীব্র। ছোট, পারিবারিক লজগুলোতে থাকা মানে অতিথির মতো যত্ন পাওয়া। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংরক্ষণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ এই ভ্রমণকে শুধু দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং বোঝার জায়গায় নিয়ে যায়। একা ভ্রমণকারী হিসেবে এখানে আপনি নিরাপদ, কিন্তু একইসঙ্গে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি—যা আফ্রিকার এই অভিজ্ঞতাকে আলাদা করে তোলে।

৭. থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই একা ভ্রমণকারীদের প্রিয় গন্তব্য। ব্যাংককের মন্দির, রাস্তার খাবার আর জীবন্ত রাতের শহরের পর উত্তরাঞ্চলের চিয়াং মাই একেবারে ভিন্ন অনুভূতি দেয়। এখানে পাহাড়ঘেরা পরিবেশে যোগা, ধ্যান আর ধীর জীবনের ছন্দ পাওয়া যায়। কাঁচা মাটির কুটিরে থাকা, ভোরের ধ্যান, উদ্ভিদভিত্তিক খাবার—সব মিলিয়ে মন ধীরে হয়। ডিটক্স প্রোগ্রাম, প্রকৃতির ভেতর হাঁটা আর নীরব বিকেল শরীর ও মনের ক্লান্তি ঝরিয়ে দেয়। এরপর চাইলে নিরিবিলি দ্বীপে গিয়ে সমুদ্র, সূর্যাস্ত আর হালকা ম্যাসাজে দিন কাটানো যায়। থাইল্যান্ডে একা ভ্রমণ মানে কখনোই নিজেকে অসহায় মনে না করা—কারণ পরিবেশটাই এমনভাবে গড়ে ওঠা যে একা থাকাও এখানে স্বাভাবিক ও আরামদায়ক।

৮. ন্যাক্সোস

গ্রিসের ন্যাক্সোস দ্বীপ একা ভ্রমণকারীদের জন্য শান্ত আর বন্ধুসুলভ। এখানে পার্টির চেয়ে জীবনের ধীরগতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো শহরের সরু গলিতে হাঁটা, দোকানের সামনে বসে কফি খাওয়া বা বন্দরের পাশে চুপচাপ বসে থাকা—সবই একা উপভোগ্য। পোর্টারা-তে সূর্যাস্ত দেখা একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি তৈরি করে। দিনের বেলায় পরিষ্কার জলে সাঁতার আর বিকেলে সমুদ্রপাড়ে হাঁটা ক্লান্তি দূর করে। ন্যাক্সোসে একা ডিনার করা খুব স্বাভাবিক; পরিবার চালিত রেস্তোরাঁয় অতিথি হিসেবে আপনাকে স্বাগত জানানো হয়। চাইলে রান্নার ক্লাস বা গ্রামের ভেতরে ভ্রমণে অংশ নিয়ে স্থানীয় জীবনের কাছাকাছি যাওয়া যায়। একা হলেও এখানে আপনি কখনো বিচ্ছিন্ন বোধ করবেন না—বরং দ্বীপের ধীর ছন্দে নিজেকে খুঁজে পাবেন।

৯. আমস্টারডাম

নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম এমন এক শহর যেখানে একা ঘোরা খুবই সহজ। শহরটি সমতল, হাঁটার উপযোগী এবং সাইকেলবান্ধব। ক্যানালের ধারে হাঁটা বা সাইকেলে শহর ঘোরা একা থাকলেও ক্লান্তিকর নয়। ভনডেলপার্কে বসে বই পড়া কিংবা ছোট ক্যাফেতে জানালার পাশে কফি খাওয়া একা সময় কাটানোর দারুণ উপায়। শিল্পপ্রেমীদের জন্য ফটোগ্রাফি জাদুঘর বা ছোট গ্যালারি ঘোরার সুযোগ আছে। ডে পাইপ এলাকার দোকান আর খাবারের জায়গাগুলোতে একা অতিথি খুব সাধারণ দৃশ্য। হোস্টেল বা বুটিক হোটেলের কমন স্পেস চাইলে সামাজিক হওয়ার সুযোগ দেয়, আবার একা থাকার জায়গাও থাকে। আমস্টারডাম একা ভ্রমণকারীদের জন্য এমন এক শহর, যেখানে নিজের গতি নিজেই ঠিক করা যায়।

১০. ডেভন

ইংল্যান্ডের কাউন্টি ডেভনের দ্য বার্লে স্টোর একা ভ্রমণের সবচেয়ে চরম কিন্তু আরামদায়ক রূপ। এখানে কোনো ইন্টারনেট নেই, নেই ফোনের সিগন্যাল। চারপাশে শুধু মাঠ, পাখির ডাক আর দূরে সমুদ্র। সকাল শুরু হয় খামারের তৈরি খাবারে, দিন কাটে হাঁটা আর প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটিয়ে। বই পড়া, আকাশ দেখা বা নিঃশব্দে বসে থাকা—সবকিছুরই এখানে সময় আছে। সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত আর রাতের আকাশ এক ধরনের ধীরতার শিক্ষা দেয়। এখানে এসে অনেকেই প্রথমে অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই বিচ্ছিন্নতাই আরাম হয়ে ওঠে। একা ভ্রমণ মানে সবসময় চলাফেরা নয়—কখনো কখনো থেমে থাকাও জরুরি। ডেভন সেই থেমে থাকার জায়গা।

১১. মিসর

ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য মিসর একা ভ্রমণের দারুণ গন্তব্য। কায়রোর কোলাহল প্রথমে কিছুটা চাপ তৈরি করলেও গাইডসহ ঘোরালে শহরের গল্প খুলে যায়। পিরামিড, জাদুঘর আর পুরোনো বাজার একা দেখলেও একঘেয়ে লাগে না। লুক্সরে প্রাচীন মন্দির আর রাজাদের উপত্যকা ইতিহাসের ভারে নীরব করে দেয়। নীল নদে ক্রুজ একা ভ্রমণকারীদের জন্য নিরাপদ ও সংগঠিত অভিজ্ঞতা—দিনে মন্দির দেখা, রাতে নদীর ওপর ভেসে থাকা। চাইলে অন্য অতিথিদের সঙ্গে কথা বলা যায়, আবার চাইলে নিজের মতো থাকা যায়। আসওয়ানের শান্ত পরিবেশে এসে পুরো ভ্রমণটা ভারসাম্য পায়। মিসরে একা ভ্রমণ মানে ইতিহাসকে নিজের গতিতে অনুভব করা।

১২. কিরগিজস্তান

যারা প্রচলিত গন্তব্যের বাইরে কিছু চান, কিরগিজস্তান তাদের জন্য। তিয়েন শান পর্বতমালায় ট্রেকিং মানে পাহাড়, খোলা আকাশ আর নীরবতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। ছোট গ্রুপে হাঁটা, ইয়ুর্টে থাকা আর স্থানীয় মানুষের সঙ্গে চা খাওয়া অভিজ্ঞতাকে মানবিক করে তোলে। দিনের শেষে পাহাড়ি বাতাস আর তারাভরা আকাশ একা ভ্রমণকারীর মনে গভীর ছাপ ফেলে। পথ কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও গাইড আর সংগঠনের কারণে নিরাপত্তা বজায় থাকে। এখানে জীবন সহজ, খাবার সাধারণ, কিন্তু অভিজ্ঞতা গভীর। একা ভ্রমণকারী হিসেবে আপনি এখানে শুধু দর্শক নন—হয়ে যাবেন পথের অংশ।