কোন সময়ে কতক্ষণ ঘুমানো ভালো

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

ঘুম মানুষের শরীর ও মনের জন্য অপরিহার্য—খাবার বা পানির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বিশ্রাম নয়, বরং শরীরের ভেতরে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার সময়।

ঘুম না হলে কী হতে পারে, কোন কোন সময়ে কতক্ষণ ঘুমানো শরীরের জন্য ভালো—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।

ঘুমের গুরুত্ব

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ঘুম মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের সব তথ্য গুছিয়ে নেয়। এতে স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগ বাড়ে। ঘুম কম হলে ভুলে যাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়। পর্যাপ্ত ঘুম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

ঘুমের সময় শরীর রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি তৈরি করে, ঘুম ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ঘুম কম হলে ক্ষুধা বাড়ে (ঘ্রেলিন হরমোন বৃদ্ধি পায়) এবং তৃপ্তি কমে (লেপটিন কমে)। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে এবং ওজন বাড়তে পারে। ভালো ঘুম মানসিক শান্তি আনে ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। ঘুমের সময় শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত হয় এবং পেশী শক্তিশালী হয়।

ঘুম না হওয়া (অনিদ্রা) শরীর ও মনের ওপর ধীরে ধীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এক-দুই দিন কম ঘুম হলেও সমস্যা হয়। আর দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব থাকলে তা গুরুতর রোগের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ঘুম না হলে কী হতে পারে

১. মস্তিষ্কের সমস্যা—ঘুম না হলে মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, মনোযোগ কমে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়, সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয়, মাথা ঝিমঝিম বা মাথাব্যথা হয়। দীর্ঘদিন ঘুম কম হলে ডিমনেশিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

২. মানসিক সমস্যা—ঘুমের অভাব সরাসরি মনের ওপর প্রভাব ফেলে। রাগ, বিরক্তি, উদ্বেগ, হতাশা বেড়ে যায়, ছোট বিষয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া হয়।

৩. হৃদরোগের ঝুঁকি—পর্যাপ্ত ঘুম না হলে রক্তচাপ বাড়ে, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।

৪. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়—ঘুম না হলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, সহজেই ঠান্ডা-জ্বর হয়, সংক্রমণ বেশি হয়, অসুখ থেকে সেরে উঠতে সময় বেশি লাগে।

৫. ওজন বৃদ্ধি ও হরমোনের সমস্যা—ঘুম কম হলে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ক্ষুধা বেড়ে যায়, অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা হয়, ওজন বাড়ে এমনকি ডায়াবেটিসেরও ঝুঁকি বাড়ে।

৬. চোখ ও শরীরের ক্লান্তি—চোখ লাল বা জ্বালা করে, শরীর দুর্বল লাগে, কাজ করার শক্তি কমে যায়।

৭. দুর্ঘটনার ঝুঁকি—ঘুম না হলে রিফ্লেক্স কমে যায়, গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, কাজের জায়গায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

বয়সভেদে ঘুমের সময়সীমা কত ঘণ্টা

বয়স অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজনীয়তা আলাদা হয়। কারণ শরীর ও মস্তিষ্কের বৃদ্ধি, হরমোনের কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন কাজের ধরন বয়সভেদে পরিবর্তিত হয়।

১. নবজাতক (০-৩ মাস): নবজাতকের ঘুম প্রয়োজন ১৪-১৭ ঘণ্টা (কখনো ১৮ ঘণ্টাও হতে পারে)। এই বয়সে শিশুর শরীর ও মস্তিষ্ক দ্রুত বিকাশ লাভ করে। তাই বেশি ঘুম দরকার। তারা দিনে-রাতে ভাগ করে ঘুমায়।

২. শিশু (৪-১১ মাস): শিশুদের ১২-১৫ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন, এই সময় শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ খুব দ্রুত হয়। ঘুম তাদের শেখার ক্ষমতা ও মস্তিষ্কের উন্নতিকে সাহায্য করে।

৩. টডলার (১-২ বছর): ঘুম প্রয়োজন ১১-১৪ ঘণ্টা। এই বয়সটা হাঁটা, কথা বলা শেখার সময়। ঘুম তাদের শক্তি পুনরুদ্ধার ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

৪. প্রি-স্কুল (৩-৫ বছর): এসময় ঘুম প্রয়োজন ১০-১৩ ঘণ্টা, এই বয়সে শিশুদের শেখার আগ্রহ বেশি থাকে। পর্যাপ্ত ঘুম তাদের স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়।

৫. স্কুল বয়স (৬-১৩ বছর): এই বয়সে ৯-১১ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন, পড়াশোনা, খেলাধুলা সব মিলিয়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ থাকে। ঘুম তাদের ব্রেইন ফাংশন ও ইমিউনিটি শক্ত রাখে।

৬. কিশোর (১৪-১৭ বছর): কিশোর বয়সে ৮-১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন, এসময় হরমোনাল পরিবর্তন ও মানসিক চাপ বেশি থাকে। কম ঘুম হলে মুড সুইং, মনোযোগের সমস্যা দেখা দেয়।

৭. তরুণ ও প্রাপ্তবয়ষ্ক (১৮-৬৪ বছর): এসময় ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন, এই বয়সে কাজের চাপ বেশি থাকে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কর্মক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

৮. বয়স্ক (৬৫+ বছর): বয়ষ্কদের ঘুম প্রয়োজন ৭-৮ ঘণ্টা, বয়স বাড়লে ঘুম হালকা হয়ে যায়। তবে কম ঘুম হলেও শরীরের বিশ্রাম দরকার, তাই নিয়মিত ঘুম জরুরি।

কোন কোন সময়ে কতক্ষণ ঘুমানো শরীরের জন্য ভালো

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ঘুমানোর সঠিক সময় শুধু মোট ঘণ্টার ওপর নির্ভর করে না—এটা আমাদের শরীরের জৈবিক ঘড়ির (সারকাডিয়ান রিদম) সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শরীর স্বাভাবিকভাবে রাতের অন্ধকারে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়, তাই নির্দিষ্ট সময় মেনে ঘুমানো সবচেয়ে উপকারী।

সবচেয়ে উপযুক্ত সময় রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমাতে যাওয়া। এই সময় শরীরে মেলাটোনিন (স্লিপ হরমোন) নিঃসরণ বাড়ে, মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বিশ্রামের মোডে যায়, গভীর ঘুম (ডিপ স্লিপ) সহজে আসে। রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমালে রাত ১২টা থেকে ৩টার সবচেয়ে কার্যকর ঘুমের সময়টা ভালোভাবে পাওয়া যায়।

অনেকে দেরি করে রাত ১২টা থেকে ২টায় ঘুমায়, এতে ঘুমের গুণগত মান কমে যায়, সকালে উঠতে কষ্ট হয়, শরীর ক্লান্ত থাকে, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। দীর্ঘদিন এমন হলে ওজন বাড়া, মানসিক চাপ এমনকি হরমোনজনিত সমস্যা হতে পারে।

ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে ঘুম থেকে ওঠা সবচেয়ে ভালো অভ্যাস। এই সময় শরীর সতেজ থাকে, মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে, মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।

দুপুরে অল্প সময়ের ঘুম (পাওয়ার ন্যাপ), দুপুর ১টা-৩টার মধ্যে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের ঘুম ক্লান্তি দূর করে, মস্তিষ্ককে সতেজ করে, কাজের শক্তি বাড়ায়। তবে দুপুরে বেশি সময় (১-২ ঘণ্টা) ঘুমালে রাতে ঘুমে সমস্যা হতে পারে।

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস করতে হবে, এটি শরীরের ‘ঘড়ি’ ঠিক রাখে, ঘুম দ্রুত আসে ও গভীর হয়।

রাত ১২টার পরে ঘুমানোর অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। সকালে দেরিতে ওঠা (৯-১০টা), সন্ধ্যার পর দীর্ঘসময় ঘুমানোর অভ্যাগ এড়িয়ে চলতে হবে।