কোন সময় ঘুমালে রোগ বা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ে?

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ঘুমের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অসময়ের ঘুম বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। শরীর প্রকৃতির সময় মেনে চলে। নিয়মিত সেই সময়ের বিপরীতে চলার কারণে ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে সমস্যা তৈরি হবেই। 

বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলেছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।

কোন সময়ে ঘুমালে রোগ বা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ে

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ঘুমানোর সবচেয়ে নিরাপদ সময় হচ্ছে রাত ১০টা থেকে ১১টা এবং ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে ঘুম থেকে ওঠা। ঘুমের সময় শুধু ‘কত ঘণ্টা’ নয়, ‘কখন ঘুমাচ্ছেন’—এটাও স্বাস্থ্যের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের জৈবিক ঘড়ি (সারকাডিয়ান রিদম) যদি বার বার ভেঙে যায়, তাহলে নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ে। যেমন:

১. রাত ১২টার পর নিয়মিত ঘুমানো সবচেয়ে বড় ঝুঁকির সময়। নিয়মিত রাত ১২টার পর ঘুমাতে যাওয়ার কারণে মেলাটোনিন হরমোন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ঘুমের গভীরতা কমে যায়, শরীরের ‘রিপেয়ার সিস্টেম’ ব্যাহত হয়। এর ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়, ডায়াবেটিস, মানসিক চাপ বা ডিপ্রেশন ও হরমোনের সমস্যা দেখা দেয়।

২. ভোরের দিকে (রাত ২টা-৪টা) ঘুমানো শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের সময়ের সম্পূর্ণ বিপরীত। এই সময়ে ঘুমালে সকালে উঠতে দেরি হয়, সারাদিন ক্লান্তি লাগে ও কাজের দক্ষতা কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকির বাড়ে ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

৩. দিনে বেশি সময় বিশেষ করে সকাল ৯টার পর ঘুমানোর কারণে শরীরের ঘড়ি এলোমেলো হয়ে যায়, রাতে ঘুম কমে যায়। এর ফলে ইনসমনিয়া, মেটাবলিক সমস্যা (ওজন, সুগার) দেখা দিতে পারে।

৪. সন্ধ্যার পরে দীর্ঘ সময় ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই বিকেলে কিংবা সন্ধ্যায় ১-২ ঘণ্টা ঘুমান। এতে করে রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়, ঘুমের চক্র নষ্ট হয়। যার ফলে ক্রনিক ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়।

৫. প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমানো, যেমন: একদিন রাত ১০টায়, আরেকদিন রাত ২টায় এভাবে অনিয়মের কারণে শরীরের সারকাডিয়ান রিদম ভেঙে যায়, ঘুমের গুণগত মান কমে যায়। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, হতাশা, উদ্বেগ, স্থায়ী অনিদ্রার ঝুঁকি বাড়ে।

৬. নাইট শিফটে নিয়মিত কাজ করেন যারা তারা রাতে কাজ করে, দিনে ঘুমায়। তাদের শরীর স্বাভাবিক নিয়মে চলতে পারে না, সূর্যালোকের অভাব দেখা দেয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হজমের সমস্যা, মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।

৭. খুব কম বা খুব বেশি ঘুম (সময় যাই হউক), যেমন: ৫ ঘণ্টার কম বা ৯ থেকে ১০ ঘণ্টার বেশি ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। কম ঘুম হওয়ার কারণে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে বেশি ঘুম অলসতা, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

অসময়ে ঘুমের প্রভাব কাদের ওপর বেশি পড়ে, কেন

  • ঘুমের প্রভাব সবার ওপর পড়ে। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট মানুষ বা বয়সের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি তীব্রভাবে দেখা যায়। কারণ তাদের শরীর, মস্তিষ্ক বা হরমোনগত অবস্থা অন্যদের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল।

  • শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ঘুমের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। কারণ তাদের মস্তিষ্ক ও শরীর দ্রুত বিকাশমান এবং গ্রোথ হরমোন ঘুমের সময় বেশি নিঃসৃত হয়। এই বয়সে ঘুম কম হলে উচ্চতা ও শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা কমে, আচরণে খিটখিটে ভাব আসে।

  • পড়াশোনার চাপ, রাত জাগার অভ্যাসের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসময়ে ঘুম ও অনিদ্রার প্রভাব বেশি। যার কারণে মনোযোগ কমে যায়, পরীক্ষায় খারাপ ফল, শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

  • মানসিক চাপগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ঘুমের নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ে। মস্তিষ্ক সবসময় সক্রিয় থাকার কারণে তাদের ঘুমের সময়সূচি ব্যাহত হয়।

  • কর্মজীবী বিশেষ করে যারা রাতের শিফটে কাজ করেন তাদের ঘুমের রুটিন ঠিক থাকে না, যা শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ তৈরি করে।

  • হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারীর ঘুমের সময়সূচি বদলে যায়। এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, ওষুধের প্রভাব, যাদের স্ক্রিন টাইম বেশি তাদের মধ্যে অসময়ে ঘুম বা অনিদ্রার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ঘুমের প্রভাব কারো ক্ষেত্রে হালকা, কারো ক্ষেত্রে গুরুতর হতে পারে। কিন্তু যাদের ওপর বেশি প্রভাব পড়ে, তাদের জন্য সঠিক ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

ঘুমের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নিয়মিত রুটিন মেনে ঘুমানোর অভ্যাস, মানসিক নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ২ থেকে ৩ সপ্তাহ ধরে নিয়মিত ঘুম না হলে, দিনে অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকলে, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া বা বারবার জাগা—এমন উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।