বৃক্ষনিধনের সঙ্গে কি মানসিক অবসাদের কোনো সম্পর্ক আছে?
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকায় গাছ কাটার সংবাদ গণমাধ্যমে আসে। আধুনিকায়ন বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য হয়তো গাছ কাটা হয়। তখন স্থানীয়দের কেউ কেউ প্রতিবাদ করেন। স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত জায়গার গাছ কাটলে খারাপ লাগে।
কিন্তু প্রশ্নটা হলো, এই ‘খারাপ লাগা’ কি শুধু আবেগ? নাকি এর পেছনে কোনো জৈবিক বা মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে?
গবেষকরা ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই কাজ করছেন। শুধু মন খারাপ না—ক্লিনিক্যাল অর্থে ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটির সঙ্গে বনভূমির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির পরিমাপযোগ্য কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন।
২০২৫ সালে বিজে সাইক ওপেন জার্নালে একটা বড় গবেষণা বেরিয়েছে। ২৩০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যেখানে বনভূমি বেশি, সেখানে ডিপ্রেশন-অ্যাংজাইটির প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক কম।
শরীরের ভেতরে কী ঘটছে
জাপানে ‘শিনরিন ইয়োকু’ বলে একটা ধারণা আছে—বনে গিয়ে সময় কাটানো, ফরেস্ট বাথিং। পার্ক বিওয়ান-জু, সুনেতসুগু ইয়োশিফুমি এবং মিয়াজাকি ইয়োশিফুমি জাপানের ২৪টি বনে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালান। দেখা যায়, বনে সময় কাটালে অ্যাংজাইটি কমে, মেজাজ ভালো থাকে, ক্লান্তির অনুভূতিও কমে। এটা একটা-দুটো স্টাডিতে না, বারবার দেখা গেছে।
নিউরোকেমিক্যাল দিক থেকে সেরোটোনিন আর অক্সিটোসিনের কথা আসে, যদিও এই সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না—ফলাফলে অনেক সময় তারতম্য থাকে, মেথডেও সীমাবদ্ধতা আছে। তবে কর্টিসলের ব্যাপারটা একটু বেশি পরিষ্কার। একাধিক মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, সবুজ পরিবেশে থাকা মানুষের কর্টিসল লেভেল কম থাকে। কর্টিসল দীর্ঘদিন বেশি থাকলে হিপোক্যাম্পাসে প্রভাব পড়ে—স্মৃতি আর আবেগ নিয়ন্ত্রণের জায়গাটায়। এটা একদিনের ব্যাপার না, দীর্ঘ এক্সপোজারের ফল।
গাছ কমলে বায়ু দূষিত হয়, সেই দূষণ মাথায় যায়
এই জায়গাটা আলোচনায় কম আসে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না—বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণাও আটকায়। এই কণাগুলোকে বলা হয় পার্টিকুলেট ম্যাটার, সংক্ষেপে পিএম২.৫। নামের ‘২.৫’ মানে হলো এগুলোর ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম—মানুষের চুলের প্রস্থের প্রায় ৩০ ভাগের এক ভাগ। এতটাই ছোট যে নাক-মুখের স্বাভাবিক ফিল্টার পার হয়ে সরাসরি ফুসফুসে, এমনকি রক্তে ঢুকে যায়। গাছ কমলে বাতাসে এই কণার পরিমাণ বাড়ে, আর শরীর সেটা আটকাতে পারে না।
বায়ুদূষণ এখন আর শুধু ফুসফুসের সমস্যা না। পিএম২.৫ আর ভারী ধাতু শরীরে ঢুকে সিস্টেমিক ইনফ্ল্যামেশন তৈরি করতে পারে, যেটা ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার পার হয়ে নিউরোইনফ্ল্যামেশন ঘটায়। এই নিউরোইনফ্ল্যামেশনকে ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি এবং কিছু নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের সঙ্গে একাধিক গবেষণা এখন যুক্ত করছে। জুন্ডেল এবং তার সহকর্মীরা ২০২২ সালে নিউরোটক্সিকোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটা সিস্টেমেটিক রিভিউতে দেখান, ৯৫ শতাংশ গবেষণায় বায়ুদূষণ ও মস্তিষ্কের কাঠামোগত বা কার্যগত পরিবর্তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হিপোক্যাম্পাস সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও আবেগ সামলানোর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা অ্যামিগডালা আর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
চেনা জায়গা বদলে যাওয়ার বেদনা
অস্ট্রেলিয়ার দার্শনিক গ্লেন অ্যালব্রেখট ২০০৭ সালে একটা শব্দ চালু করেছেন—সোলাস্টালজিয়া। নস্টালজিয়া হলো অতীতের জন্য মনকেমন করা। সোলাস্টালজিয়া হলো বর্তমানে দাঁড়িয়ে নিজের চেনা জায়গাটাকে বদলে যেতে দেখার কষ্ট। বন উজাড় হওয়া, নদী শুকিয়ে যাওয়া, পাড়ার পরিচিত গাছটা কাটা পড়া—এগুলো দেখলে মানুষের মধ্যে যে অস্বস্তি, যন্ত্রণা, অসহায়ত্ব তৈরি হয়, সেটারই নাম সোলাস্টালজিয়া।
আমার এক সহপাঠীর একবার এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ছোটবেলায় সে যে মাঠের পাশে বড় হয়েছে, সেখানে একদিন বুলডোজার দেখলো। অনুভূতিটা ঠিক দুঃখের না, একটা অদ্ভুত শূন্যতার। অ্যালব্রেখটের ভাষায় সেটাই সোলাস্টালজিয়া।
কানাডার নর্দার্ন ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিন্ডা পি গ্যালওয়ে এবং তার সহকর্মীরা ২০১৯ সালে এই বিষয়ে একটা স্কোপিং রিভিউ করেছেন। কিছু গবেষণায় সোলাস্টালজিয়া আর ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটির মধ্যে মাঝারি মাত্রার সম্পর্ক পাওয়া গেছে—কোরিলেশন কোয়েফিশিয়েন্ট দশমিক ৩৫ থেকে দশমিক ৫৩। সংখ্যাটা ছোট নয়, আবার অকাট্য প্রমাণও বলা যাচ্ছে না। তবে বিষয়টা গবেষণার মাঠে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।
শহরের গাছ আর মানসিক চাপ
শহরের ভেতরে সবুজের উপস্থিতি নিয়েও গবেষণা আছে। ডেনমার্কের অরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস্টিন এনগেম্যান এবং তার সহকর্মীরা প্রায় ১০ লাখ ডেনিশ নাগরিকের তথ্য এক দশক ধরে বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, শৈশবে তুলনামূলকভাবে কম সবুজ পরিবেশে বড় হওয়া মানুষদের মধ্যে পরবর্তী জীবনে ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটিসহ বিভিন্ন মানসিক রোগের ঝুঁকি ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কো হেলবিখ এবং তার সহকর্মীরা আলাদা একটা গবেষণায় দেখিয়েছেন, যেসব এলাকায় সবুজ বেশি, সেখানে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রেসক্রিপশনের হার তুলনামূলক কম।
এখানে একটা সৎ স্বীকারোক্তি দরকার—শুধু গাছের কারণে এটা হচ্ছে কি না নিশ্চিত না। আয়, জীবনযাত্রার মান, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা—এগুলোও একসঙ্গে কাজ করে। কনফাউন্ডিং ভ্যারিয়েবলের সমস্যাটা এই গবেষণাক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। তবু প্যাটার্নটা বারবার দেখা যাচ্ছে।
ইকো-অ্যাংজাইটি: ভবিষ্যতের ভয়
আরেকটা বিষয় আলোচনায় আসছে—ইকো-অ্যাংজাইটি। জলবায়ু পরিবর্তন আর পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে যে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে এটাই ইকো-অ্যাংজাইটি৷ ইউনিভার্সিটি অব বাথের গবেষক ক্যারোলিন হিকম্যান ২০২১ সালে ১০টা দেশের ১০ হাজারের বেশি তরুণের ওপর একটা জরিপ চালান। দেখা যায়, ৫৯ শতাংশ তরুণ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ‘অত্যন্ত উদ্বিগ্ন’, আর ৪৫ শতাংশ জানিয়েছেন এই উদ্বেগ তাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে।
তরুণদের মধ্যে এটা বেশি দেখা যাচ্ছে, কারণ তারা প্রতিদিনই সংবাদ আর সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিবেশগত সংকটের খবর পাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীনতার অনুভূতি, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—এই দুটো মিলিয়ে যে চাপ তৈরি হয়, সেটা অনেক সময় সাধারণ উদ্বেগ ছাড়িয়ে ক্লিনিক্যাল সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। তথ্যের ধারাবাহিক প্রবাহ অনেক সময় উদ্বেগ কমানোর বদলে উল্টো বাড়িয়ে দেয়—গবেষণায় এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।
ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা যা বলছে
এ ব্যাপারে ‘দ্য সাইকিউর অর্গানাইজেশন’-এর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ফারজানা আক্তার শ্রাবণী বলেন, গবেষণার সংখ্যার পাশাপাশি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় রোগীদের মুখ থেকে শোনা বর্ণনা।
‘আমার ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতায় একটা প্যাটার্ন বারবার দেখতে পেয়েছি। যারা দীর্ঘদিন ঘিঞ্জি, গাছহীন এলাকায় থাকেন, তাদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী খিটখিটে মেজাজ আর মাঝেমধ্যে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন, এমন অস্বস্তির অভিযোগ বেশি আসে। কিন্তু যেসব রোগী নিয়মিত পার্কে যান বা সবুজ পরিবেশে সময় কাটান, তাদের মধ্যে থেরাপির সাড়া একটু ভালো। অবশ্য এটা এখনো পর্যন্ত আমার নিজের পর্যবেক্ষণ, কোনো নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার ফল না।'
তবে গবেষণা যা বলছে, তার সঙ্গে ফারজানা আক্তারের এই পর্যবেক্ষণ মিলে যাচ্ছে।
স্ট্রেস-রেগুলেশনের বিষয়ে তিনি বলেন, 'দীর্ঘ সময় ধরে শব্দদূষণ, তাপ আর সবুজের অনুপস্থিতি—এই তিনটা একসঙ্গে থাকলে অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম একটা দীর্ঘমেয়াদি অ্যালার্ট স্টেটে থাকে। শরীর বারবার স্ট্রেস রেসপন্স চালু করে, কিন্তু রিকভারির সুযোগ পায় না। এই অবস্থাটাই ধীরে ধীরে উদ্বেগ আর মুড ডিসরেগুলেশনের ভিত্তি তৈরি করে।'
বনভূমি বা সবুজ পরিবেশকে কীভাবে দেখা উচিত—এই প্রশ্নের উত্তরে ফারজানা বললেন, 'আমরা সাধারণত পরিবেশকে পটভূমি মনে করি, মানসিক স্বাস্থ্যের আসল কারণ মনে করি না। কিন্তু গবেষণা বলছে, সবুজ পরিবেশ একটা প্রোটেকটিভ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে—যেভাবে ঘুম বা সামাজিক সম্পর্ক কাজ করে। এটাকে সেভাবেই দেখা দরকার।'
শেষপর্যন্ত যা দাঁড়াল
বৃক্ষনিধন আর মানসিক অবসাদের সম্পর্কটা একটা সরল সূত্রে ব্যাখ্যা করার মতো ব্যাপার নয়। এখানে একসঙ্গে কাজ করছে জৈবিক কারণ—সেরোটোনিন, কর্টিসল, নিউরোইনফ্ল্যামেশন; পরিবেশগত কারণ—বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা, পিএম২.৫; আর মনোসামাজিক কারণ—পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কের অনুভূতি, নিয়ন্ত্রণের বোধ, পরিচিত জায়গা হারানোর কষ্ট।
বেশিরভাগ গবেষণাই কোরিলেশনাল। কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করা এখনো কঠিন। দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষামূলক গবেষণা, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে নগরায়ণ আর বৃক্ষনিধন একসঙ্গে ঘটছে দ্রুতগতিতে। সেই গবেষণা এদেশে এখনো তেমন নেই।
তবু এটুকু বলা যাচ্ছে—গাছ কাটা শুধু পরিবেশের ক্ষতি না। এটা ধীরে ধীরে একটা জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিচ্ছে, যেটার পুরো মাত্রাটা আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। প্রশ্নটা তাই শুধু ‘কতটা বন বাঁচাব’ না—প্রশ্নটা হলো, নগর পরিকল্পনায়, স্বাস্থ্যনীতিতে, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সবুজ পরিবেশকে আমরা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে ধরব। বাংলাদেশে সেই আলোচনা এখনো জোরেশোরে শুরু হয়নি বললেই চলে।