গাছ কমে গেলে মানসিক স্বাস্থ্যে যে প্রভাব পড়ে

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

শহরে গাছ কমে যাওয়ার পেছনে আমরা কে কতখানি দায়ী, সেটি কি কখনো ভেবে দেখেছি? হয়তো ভেবে দেখার বিষয়টি মনে হয়নি। কিন্তু গাছ কমে যাওয়ার প্রভাবে সৃষ্ট মানসিক চাপে কমবেশি সবাই ভুগছি।

গাছের অনুপস্থিতি মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলে, বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

শহরে গাছের পরিমাণ কমছে কি না, এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, এই শহরে গাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে কি না বা কতটুকু কমছে, তার সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যান নগর পরিকল্পনাবিদ বা পরিবেশ অধিদপ্তর দিতে পারবে। তবে শহরের চারিদিকে একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, গাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে বিশেষ করে মূল শহরের ভেতরে। বর্তমানে ছাদে ও বারান্দায় বাগান করার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছুটা সবুজ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত অর্থে শহরের গাছ বাড়ছে না, বরং অনেক জায়গায় কমে যাচ্ছে।

এর অন্যতম কারণ হলো দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। আবাসন সংকটের কারণে এক টুকরো জায়গা খালি না রেখে বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে, যেখানে গাছ লাগানোর বা বেড়ে ওঠার পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হচ্ছে না। এছাড়া বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, রাস্তা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে গাছ কাটা পড়ছে। জনসংখ্যা বাড়ছে, শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু জমির পরিমাণ বাড়ছে না। ফলে সীমিত জায়গায় মানুষের বসতি ও অবকাঠামোর চাপ ক্রমশ বাড়ছে এবং গাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

আরেকটি বিষয় হলো একটি গাছ বড় হতে কয়েক বছর লাগে কিন্তু কেটে ফেলতে এক ঘণ্টাও লাগে না। এছাড়া যে পরিমাণ গাছ কাটা হয় সে অনুপাতে নতুন গাছ লাগানো হয় না; আর নতুন গাছ লাগানো হলেও সেটি বড় হতে এবং পরিবেশগত ভূমিকা রাখতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়।

মানসিক স্বাস্থ্যে গাছ কমার প্রভাব

শহরে গাছ কমে গেলে শুধু পরিবেশের ওপরই নয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ধীরে ধীরে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গাছপালা ও সবুজ প্রকৃতি আমাদের মানসিক প্রশান্তি দেয়, যখন সবুজের অভাব ঘটে ও প্রকৃতি ধূসর হয়ে যায় তখন মানসিক চাপ বাড়ে।

  • সবুজের দিকে তাকালে, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকলে স্ট্রেস হরমোন কম থাকে। ফলে মানসিক চাপ কম থাকে। অন্যথায় গাছের অনুপস্থিতির কারণে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যাওয়ায় মানসিক চাপও বেড়ে যায়। সবুজ পরিবেশের সঙ্গে মানুষের মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক নিবিড়। শহরে গাছপালা কমে যেতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ বাড়তে পারে, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

  • গাছপালা ছায়া দেয় এবং শহরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রাখে। শহরে গাছ কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত গরমে মানুষ অস্বস্তি ও বিরক্তি অনুভব করে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, মানসিক অশান্তি বেড়ে যায়, মন খারাপ লাগে। অনেক সময় এর কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের অবনতি হতে পারে।

  • গাছপালা শব্দ প্রতিরোধক হিসেবেও কাজ করে, গাছ শব্দ ও বায়ুদূষণ কমায়। অতিরিক্ত শব্দ ও বায়ু উভয় দূষণই দীর্ঘমেয়াদে আমাদের মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। শহরে গাছপালা কমে গেলে এসব পরিবেশগত চাপ বাড়তে পারে, যা মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করবে।

  • পার্ক, খোলা জায়গা ও গাছপালা আচ্ছাদিত সবুজ পরিবেশ মানুষকে হাঁটতে, ব্যায়াম করতে ও বাইরে সময় কাটাতে উৎসাহিত করে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম মস্তিষ্কে ডোপামিন সিক্রেশন বাড়ায়, যা আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখে, মেজাজ ভালো রাখে, সামাজিক দক্ষতা বাড়ায়। গাছপালা কমে গেলে, প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে গেলে মানুষ বাইরে বের হতে চায় না। হাঁটা, ব্যায়াম না করায় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এটি শরীর ও মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

  • প্রকৃতির সংস্পর্শ মানসিক ক্লান্তি কমায়, মনোযোগ বাড়ায়। গাছ কমে যাওয়ায় দীর্ঘসময় নগর জীবনে বিরক্তিকর ও একঘেয়ে উদ্দীপকের কারণে মানসিক ক্লান্তি বাড়তে পারে। ফলে মনোযোগ কমে যাবে, স্মৃতিশক্তি ব্যাহত হবে।

  • শহরে গাছ কমে গেলে এর প্রভাব সব বয়সী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একইভাবে পড়ে না। যেমন: শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে তাদের মনোযোগ ও সামাজিক দক্ষতা এসবের ওপর বেশি প্রভাব পড়ে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যাগুলো বেশি হয়, উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হয়। আর প্রাপ্ত বয়স্ক, কর্মজীবী মানুষদের কর্মক্ষেত্রে চাপ বাড়ে, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

করণীয়

অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শহরে গাছ কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব কমাতে আমাদেরকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিকল্পিত নগরায়ণের মধ্যে যেতে হবে। নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পরিকল্পনাবিদদের বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। সড়ক, বিভিন্ন অবকাঠামো ও ভবন নির্মাণ করার সময় সেখানে কীভাবে, কোথায় গাছ লাগানো যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পার্কের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব না হলে পার্কে গাছের ঘনত্ব বৃদ্ধি করতে হবে।

‘একইসঙ্গে রাস্তার পাশে খালি জায়গায় এবং খোলা জায়গায় যেখানে গাছ লাগানোর সুযোগ আছে সেখানে গাছ লাগাতে হবে। এছাড়া বাড়ির আঙিনা, বারান্দা, ছাদে কিংবা ঘরের ভেতরে গাছ লাগাতে হবে যার যার অবস্থান থেকে। শুধু গাছ লাগানো নয়, গাছ যাতে ঠিকভাবে বেড়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করতে হবে। গাছ আমাদের পরম বন্ধু। তাই ইচ্ছে হলেই গাছ কেটে ফেলা যাবে না। গাছ সংরক্ষণে সচেতন হতে হবে প্রতিটি মানুষকে।’