চা শ্রমিকের রক্তে মেঘনা লাল হয়েছিল সেদিন

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

পূর্ববঙ্গে চা শ্রমিকরা এসেছিলেন সুদূর অতীতে। তবে সেই অতীতের দিকে চোখ রাখলে আমরা তীব্র নৃশংসতার কিছু ঘটনা দেখতে পাবো। তেমনই একটি প্রায় বিস্মৃত ঘটনা হলো ‘মুলুক চলো আন্দোলন’।

নিজের মুলুকে চা শ্রমিকদের ফিরতে চাওয়ার আকুতি থেকেই এই আন্দোলনের শুরু হয়। তবে এর আগে একটু পেছনে ফিরে গেলে তাদের এই ‘বাঙাল মুলুকে’ আসার ঘটনা দেখা যায়।

সোনা ঝরে যে গাছে

১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ শুরু হয়। তবে ১৮৫৪ সালে বাণিজ্যিকভাবে সিলেটের মালিনীছড়ায় প্রথম চা চাষ শুরু হয়। ব্রিটিশরা উপনিবেশিক শাসনের অংশ হিসেবেই চা চাষ শুরু করে। তবে অমানসিক শ্রমের কারণে স্থানীয় শ্রমিকদের চা শ্রমিক হিসেবে পাওয়া কঠিন ছিল।

এ অবস্থায় বিহার, পাটনা, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হতদরিদ্র শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়। তাদের দেখানো হয় সবুজে মোড়ানো সোনার স্বপ্ন। এক যে আছে দেশ, সেখানে সবুজে ঢাকা পাহাড় আর গাছগুলোয় সুন্দর সোনালি পাতা। আর সেসব শুনে নতুন স্বপ্ন বুনে দলে দলে শ্রমিকেরাও আসে।

টি-টোকেন সংগ্রহ করছেন চা শ্রমিকরা। ছবি: সংগৃহীত 

টি-টোকেনে বন্দী

শ্রমিকেরা এখানে আসার পরপরই তাদের মোহভঙ্গ হতে থাকে। তাদের আলাদা কোন মজুরি ছিল না। সে সময় চা থেকে মুনাফা ৪৫০ শতাংশ পর্যন্ত হলেও তাদের মজুরি দেয়া হতো না।

এভাবেই দিন চলে যাচ্ছিল। চা শ্রমিকদের জন্য ছিল টি-টোকেন। এটি দেখিয়ে বাগানের ভেতরের বাজার থেকে খাবার নেওয়া বা অন্যান্য পণ্য কেনা যেতো। তবে বাইরে এই টোকেনের কোনো মূল্য না থাকায় শ্রমিকেরা চা বাগানের ফাঁদে আটকা পড়েন। তাদের ওপর তুচ্ছ কারণে চলত অকথ্য নির্যাতন। ব্যবহার করা হতো দাসের মতো।

মজুরি কমে তিন আনা

চা বাগানের ইংরেজদের মালিকদের মুনাফা দিন দিন বেড়েই চলছিল। কিন্তু শ্রমিকদের অবস্থার কোন উন্নতি ছিল না। একসময় টি-টোকেন বাতিল করে দৈনিক মজুরি দেওয়া শুরু হয়। এরই মধ্যে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে মুনাফা ঠিক রাখতে শ্রমিকদের বেতন কমিয়ে দৈনিক তিন আনা করা হয়। এর ফলে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

চা বাগানে কর্মরত নারী শ্রমিকরা। ছবি: সংগৃহীত

৬৭ বছরের ক্ষোভের বিস্ফোরণ

১৯২১ সালের কথা। নিম্ন মজুরি ও দাস জীবন নিয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষ তখন তুঙ্গে। এ অবস্থায় তারা ঠিক করলেন নিজেদের আদি নিবাস বা মুলুকে ফিরে যাবেন।

কিন্তু মালিকপক্ষ ছাড়ার পাত্র নয়। নিজেদের ব্যবসার উপকরণ তো আর এভাবে চলে যেতে দেওয়া যায়না। তাই তাদের যোগসাজশে রেল কর্তৃপক্ষ টিকেট বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এরপরও তাদের দমানো যায়নি। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক পায়ে হেঁটে আসাম থেকে চাঁদপুর অভিমুখে রওনা হন৷ পথে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এরপর কোলকাতার মেয়রের নির্দেশে রেলের টিকেট চালু হয়।

দীর্ঘ বঞ্চনা থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন চা শ্রমিকরা। ছবি: সংগৃহীত

রক্তে লাল মেঘনা

শ্রমিকেরা চাঁদপুরের মেঘনা নদীর ঘাটে পৌঁছে ঠিক করেন, স্টিমারে করে ত্রিপুরা গিয়ে রেলযোগে ভারতে তাদের নিজ নিজ ভিটায় ফিরে যাবেন। চাঁদপুর তখন ত্রিপুরার অংশ ছিল। কিন্তু এখানে এসে এক নারকীয় ঘটনার সম্মুখীন হন তারা। প্রথমে ১৯২১ সালের ১৯ মে মেঘনা ঘাটে জাহাজে উঠতে উদ্যত শ্রমিকদের ওপর হামলা হয়। জাহাজের পাটাতন সরিয়ে নেওয়ায় অনেকে সরাসরি গিয়ে নদীতে পড়েন। পলকেই মেঘনার স্রোতে ভেসে যান তারা।

এরপর এলো সেই ভয়াল রাত। ১৯২১ সালের ২০ মে দিবাগত রাত। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত শ্রমিকেরা তখন চাঁদপুরের বড় হেড স্টেশনে ঘুমাচ্ছেন। এ সময় চা বাগান মালিক ম্যাকফার্সের নির্দেশে হাজার হাজার গুর্খা সৈনিক ও পুলিশ সদস্য সেখানে জড়ো হন।

এরপর মহকুমা প্রশাসক সুশীল সিংহ (তিনি প্রথমদিকে শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন) ম্যাকফার্সের চাপে গোর্খাদের হামলার নির্দেশ দেন। তারপর গুলি আর বেয়নেট নিয়ে তারা ঘুমন্ত শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যারা রেল প্লাটফর্মে ঘুমে কাতর, তাদের গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছিল চাঁদপুর বড় হেড স্টেশনে। সেই একরাতে এত শ্রমিককে হত্যা করা হয় যে, মেঘনা নদীর পানি পুরো লাল হয়ে গিয়েছিলো হতভাগ্য চা শ্রমিকদের তাজা রক্তে।

চা শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। ছবি: সংগৃহীত

সুনসান নীরবতা

এত বড় একটি ঘটনা স্থানীয়ভাবে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সে সময়ে একমাত্র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ছাড়া আর কাউকে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। যতীন্দ্রমোহন ছিলেন রেল শ্রমিকদের নেতা। তিনি আড়াই মাস ধর্মঘট করেছিলেন। রেল বন্ধ থাকায় তখন সামগ্রিকভাবে চাপ তৈরি হলেও শ্রমিকদের আবার সেই চা বাগানেই ফিরে যেতে হয়। সঙ্গে জোটে অকথ্য নির্যাতন। মজুরিও থাকে একইরকম। এছাড়া এই শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদ করায় সিলেট, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামে প্রায় ৫ হাজারের এর মতো রেলওয়ে কর্মী বরখাস্ত হন৷

শুরুতে মহাত্মা গান্ধী আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে ‘পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে অসহযোগ নয়’ বলে আন্দোলন থেকে সমর্থন তুলে নেন। এমন নৃশংস ঘটনা শেষ পর্যন্ত অনেকের আলোচনাতেই স্থান পায়নি।

রক্তজবার মতো ক্ষত

সেই মুলুক চলো আন্দোলনের ১০১ বছর পর এখনো চা শ্রমিকদের সংকটগুলো তেমন দূর হয়নি।

২০২১ সালে এই আন্দোলনের শতবর্ষ পূর্তিতে চা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রামভজন কৈরী বলেছিলেন, ‘এখন আগের চেয়ে অবস্থা ভালো হয়েছে। তবে চা শ্রমিকরা তাদের দৈনিক মজুরির বৃদ্ধি চান। ১২০ টাকার সঙ্গে তারা চাল ও আটা একটি নির্দিষ্ট পরিমাপে পান।’

তবে তাদের দাবি, দিনে অন্তত ৩০০ টাকা মজুরি। তাছাড়া শ্রমিকেরা যতদিন কাজ করেন ভূমির ওপর তাদের কোনো মালিকানা থাকেনা। চাকরির মেয়াদ শেষ হলে শ্রমআইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী চলে যেতে হয়। তাই তাদের মজুরি বৃদ্ধি ও ভূমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়া উচিত।

এদিকে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এখনো ঘোরাফেরা করছে ১৭৮ থেকে ১৮৮ টাকার মধ্যেই।

২০২২ সালে ঢাকায় মুলুক চলো আন্দোলন নিয়ে গণসংগীতের দল সমগীতের আয়োজনে পরীবাগের সংস্কৃতি কেন্দ্রে আলোচনাসভা ও গান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আলোচনা করেন। কফিল আহমেদ, অরূপ রাহী, সমগীতসহ বিভিন্ন শিল্পী ও দল গান করেছিলেন।

এছাড়া চাঁদপুরের সেই হেড স্টেশনে অনেকেই শোক জানিয়ে ফুল দেন। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই নির্মম ঘটনাটি স্মরণে একটি শোকস্তম্ভও নির্মাণ করা হয়নি৷ তবে স্থানীয় চা শ্রমিকেরা দিনটি পালন করে থাকেন ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে।

চা শ্রমিকদের শ্রম ও ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মিত ভাস্কর্য 'চা কন্যা'। ছবি: সংগৃহীত

ফিরে আসে সেই সময়

‘মনে করি আসাম যাবো, আসাম গেলে তোমায় পাবো/বাবু বলে কাম কাম, সাহেব বলে ধরে আন/আর ওই সর্দার বলে লিবো পিঠের চাম/হে যদুরাম, ফাঁকি দিয়া চলাইলি আসাম...’

জনপ্রিয় এই গানটিতে উঠে এসেছে সেই শ্রমিকদের বেদনা, বঞ্চনা ও দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস। বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে ১০৫ বছর আগের ঘটনাকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে গানটি।

আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি আগে যারা ‘মুলুক চলো’ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেরই আর ফেরা হয়নি নিজ মুলুকে। আসাম থেকে ফিরতে থাকা এই মানুষগুলোর যাত্রা থেমে গিয়েছিল চাঁদপুরেই।

কিন্তু তারা যে দাবিগুলো নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন, সাম্য ও বৈষম্য বিরোধের প্রশ্নে সেসব এখনও একইরকম প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।