মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অবশ্যপাঠ্য ১০ উপন্যাস

মোস্তফা মুশফিক
মোস্তফা মুশফিক

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে অনেক কালজয়ী উপন্যাস রয়েছে, যেখানে একাত্তরের ভয়াবহতা ও বীরগাথা উঠে এসেছে গল্পে গল্পে। এগুলোকে বলা যায় যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, সাহস ও বেদনার দলিল।

জাতির শ্রেষ্ঠ এই অর্জন আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য-চলচ্চিত্রে বারবার অনুষঙ্গ হয়েছে। বাংলা ভাষার প্রায় প্রত্যেক বড় লেখক এ বিষয়ে উপন্যাস লিখেছেন, একাধিকও লিখেছেন অনেকে। লেখক, চিন্তক ও গবেষকদের পরামর্শ মতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ১০টি উপন্যাসের তালিকাটি পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

. ‘রাইফেল রোটি আওরাত’, আনোয়ার পাশা

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে এই উপন্যাসের অবস্থান অন্য সবগুলোর চেয়ে আলাদা। সেকালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে বসে লেখা একমাত্র উপন্যাস ‘রাইফেল রোটি আওরাত’। এর রচনাকাল ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আনোয়ার পাশা যখন এটি লিখছিলেন, তখন চারপাশে গুলির শব্দ, রাস্তায় লাশের সারি আর বাতাসে পোড়া গন্ধ। উপন্যাসের নায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুদীপ্ত শাহীন আসলে লেখকেরই প্রতিচ্ছবি।

উপন্যাসের সময়কাল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে এপ্রিলের একেবারে প্রথমদিক পর্যন্ত। এই ক্ষণকালে চিত্রিত হয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার প্রতিরূপ, ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট গণহত্যার চাক্ষুষ বিবরণ।

এখানে আছে সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত চলে আসা শোষণ, ঊনসত্তরে অধ্যাপক শামসুজ্জোহার আত্মোৎসর্গ, শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ।

উপন্যাসটি যেন একাত্তরের আনা ফ্রাংকের দিনলিপি। এ প্রসঙ্গে মফিদুল হক বলছিলেন, ‘লেখক ২৫ মার্চের কালরাত পেরোতে পারলেও ১৪ ডিসেম্বরের হত্যাযজ্ঞ পেরোতে পারেননি। আলবদর বাহিনী তাকে চোখে কালো কাপড় বেঁধে ধরে নিয়ে যায়। অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের নিকট নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শিল্পীকে হত্যা করা গেলেও তার শিল্পকে তো আর হত্যা করা যায় না। বাংলাদেশের মাটিতে আগামীতেও যারা জন্মগ্রহণ করবে, তারা এ দেশের ইতিহাসের এক দুঃসহ ও নৃশংস অধ্যায়ের নির্ভেজাল দলিল পাঠ করে নিঃসন্দেহে শিউরে উঠবে।’

২. ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, সেলিনা হোসেন

এই উপন্যাসের পেছনে আছে সত্য ঘটনা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষক আবদুল হাফিজ ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে সেলিনা হোসেনের বাসায় উঠেছিলেন। সেখানে তিনি শুনিয়েছিলেন যশোরের কালীগঞ্জের এক মায়ের গল্প, যিনি দুই মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে নিজের প্রতিবন্ধী ছেলেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দেন।

এটা নিয়ে প্রথমে ছোটগল্প লেখার কথা ভেবেছিলেন লেখক। কিন্তু ঘটনার অনুরণন এত গভীর যে, সেটি হয়ে উঠল সেলিনা হোসেনের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ উপন্যাস।

উপন্যাসটি ব্যাপকভাবে মুগ্ধ করে চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়কে। ১৯৭৫ সালের ১৩ আগস্ট সেলিনা হোসেনকে লেখা চিঠিতে তিনি উপন্যাসটির প্রশংসা করেন এবং এটি নিয়ে ভালো চলচ্চিত্র হবে বলেও ব্যক্ত করেন। তিনি নিজেও এই উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপদানের বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতায় সত্যজিতের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে পরে চাষী নজরুল ইসলাম এটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দেন।

হলদিগাঁর ‘বুড়ি’ নামে সাধারণ মেয়ে কীভাবে পুরো দেশের প্রতীক হয়ে ওঠে, এই উপন্যাস সেই রূপান্তরের কথা বলে। সলীম যায় যুদ্ধে। হাফেজ ও কাদের দুই মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করতে করতে শত্রুপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে আশ্রয় নেয় বুড়ির ঘরে। পাকসেনারাও বাড়িতে আসে। একজন মা দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে নিজের সন্তানকে তুলে দেয় পাকসেনাদের বন্দুকের নলের মুখে। বাংলা কথাসাহিত্যে মাতৃত্ব এত তীব্র, এত মহৎ রূপ আর কোথাও পায়নি।

৩. ‘জীবন আমার বোন’, মাহমুদুল হক

মাহমুদুল হক বাংলা সাহিত্যের এমন একজন লেখক যিনি অল্প লিখেছেন, কিন্তু যা লিখেছেন তা অমোচনীয়। বারবার পড়তে হয় তার প্রতিটি বই। ‘জীবন আমার বোন’ তার তৃতীয় উপন্যাস—প্রথম প্রকাশ ১৯৭৬ সালে।

উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের বেশিরভাগ আখ্যান থেকে একেবারে আলাদা। লেখকের এই উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত হলেও এর নায়ক-চরিত্র দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেকটা নিস্পৃহ।

মার্চের ১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত দেশের উত্তপ্ত পরিস্থিতি উদ্বেগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছে জাহেদুল কবির খোকা; কিন্তু নিজে চলেছে গা বাঁচিয়ে। ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানেও যায়নি। দেশ জ্বলছে, মানুষ মরছে, আর খোকা ব্যস্ত নিজের জীবনের ক্ষুদ্র সংসারে।

কিন্তু এই নির্লিপ্ততার ভেতরেই উপন্যাসের বড় শক্তি। এর নির্মাণশৈলীও মনোমুগ্ধকর। এমন এক কথক ভঙ্গিতে উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ বয়ে গেছে, মনে হয় গল্পটা পড়ছি না, বরং শুনছি।

খোকা ও তার ১৫ বছরের বোন রঞ্জুর সম্পর্কটি উপন্যাসের কেন্দ্রে। দুই ভাই-বোন পরস্পরের বেঁচে থাকার প্রেরণা। আর তাদের মাথার ওপর একটি দেশের জন্ম-যন্ত্রণা।

মুক্তিযুদ্ধকালের ঘটনা নিয়ে এমন অস্তিত্ববাদী, সত্যবাদী উপন্যাস বাংলায় আর লেখা হয়নি।

. ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’, সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি একাধিক উপন্যাস লিখলেও ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ একটু ভিন্ন।

মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসের বদলে ক্ষুদ্র রেখায় ব্যক্তি সংকটের উন্মোচনে সার্থকতা অর্জন করেছে উপন্যাসটি। যুদ্ধোত্তর দেশের সমস্যাগুলো ব্যক্তির মনোকথন ও মনোসংলাপে তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক।

মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত ঘটনা ও প্রতিক্রিয়ার রূপায়ণে এই উপন্যাস ব্যাপ্ত, সমগ্র ও দূরসঞ্চারী চেতনায় উদ্ভাসিত। স্বাধীনতার পরের দিনগুলো যে মানসিক বিপর্যয় এনেছিল, যে স্বপ্নভাঙার বেদনা ছিল, তার সাহিত্যিক রূপান্তর এই উপন্যাস।

একটি যুদ্ধের শেষ মানেই কি মুক্তি? নাকি নতুন যুদ্ধের শুরু? প্রশ্নটি এই উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠকের মনে গেঁথে দেন সৈয়দ শামসুল হক।

৫. ‘নেকড়ে অরণ্য’, শওকত ওসমান

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে একাত্তরের নারী নির্যাতনের বিষয়টি সবচেয়ে সরাসরি, নির্মোহ ও সাহসের সঙ্গে লিখেছেন শওকত ওসমান। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী। ‘নেকড়ে অরণ্যের’ তীক্ষ্ণ সংলাপের ব্যবহার উপন্যাসকে বাস্তবে পরিণত করে। পাকবাহিনীর নারী নির্যাতনের অদ্বিতীয় নজিরের লেখ্যরূপ এই উপন্যাস।

এখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একটি গোডাউনের মধ্যে প্রায় ১০০ নারীকে আটকে রাখে। তানিমা, জায়েদা, রশিদাদের বন্দিত্বের ভেতরেও যে মানবিক মমত্ব ও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়, সেটিই উপন্যাসের প্রাণ।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত ‘নেকড়ে অরণ্য’ গ্রন্থে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলার নরনারীর নির্যাতনের করুণ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। একাত্তরের যে সত্য প্রায়ই চাপা পড়ে যায়, এই উপন্যাস সেই সত্যের পাহারাদার।

. ‘১৯৭১’, হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখার সংখ্যা অনেক। তার মধ্যে ‘১৯৭১’ বীরত্বের ন্যারেটিভের বাইরে গিয়ে যুদ্ধের ভেতর সাধারণ মানুষের ভয়, বিভ্রান্তি ও বেঁচে থাকার আকুতির গল্প বলে।

পটভূমি ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম। নিরীহ গ্রামবাসীর সামনে হঠাৎ এসে দাঁড়ায় যুদ্ধ। মিলিটারি এলে সাধারণ মানুষের মনোজাগতিক কম্পন, অসহায়ত্ব ও প্রতিরোধের প্রবৃত্তির চিত্রই উপন্যাসটির প্রধান গল্প।

হুমায়ূন আহমেদ এখানে তার চিরায়ত লেখক নৈপুণ্যে সহজ ভাষায় এমন সব মানুষের কথা লিখেছেন, যাদের কথা সাহিত্যে সাধারণত আসে না।

মুক্তিযুদ্ধ কেবল নাগরিক ঘটনা নয়, কেবল সামরিক রণনীতির বিষয় নয়। এই দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটিও যে একাত্তরের অংশীদার ছিলেন, সেই সত্যটি ‘১৯৭১’ উপন্যাসে ধরা আছে।

৭. ‘উপমহাদেশ’, আল মাহমুদ

আল মাহমুদ কবি হিসেবে যতটা পরিচিত, ঔপন্যাসিক হিসেবে ততটা আলোচিত নন। তবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের তালিকায় তার ‘উপমহাদেশ’ স্বতন্ত্র জায়গা দাবি করে।

আল মাহমুদ নিজে ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক। তার উপন্যাসে আছে নিজের অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ উত্তাপ।

‘উপমহাদেশ’-এ মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। নয় মাসের যুদ্ধের বাইরে উপমহাদেশের দীর্ঘ বিভাজন, অভিপ্রায় ও ইতিহাসের ধারায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার তাৎপর্য কোথায়, তা এই উপন্যাসে খুঁজে পাওয়া যায়। যারা একাত্তরের ঘটনাকে আরও বড় ফ্রেমে বুঝতে চান, তাদের জন্য উপন্যাসটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

৮. ‘ওঙ্কার’, আহমদ ছফা

প্রখ্যাত আবুল ফজলসহ অনেকের মতে ‘ওঙ্কার’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বোত্তম সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ। মাত্র কয়েক ডজন পৃষ্ঠার রচনাটি উপন্যাস না গদ্যকবিতা, সেই তর্ক আজও চলে। তবে এর শক্তি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের তৎকালীন অস্থির রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে ধারণ করেছেন আহমদ ছফা।

বোবা বউ দীর্ঘদিনের চেষ্টায় জানালায় দাঁড়িয়ে দেখা মিছিলের জয়ধ্বনি শুনে ‘বাঙলা’ শব্দটি উচ্চারণ করতে সক্ষম হয় এবং অজ্ঞান হয়ে যায়, মুখ দিয়ে রক্ত আসে।

প্রশ্নটি হলো, কোন রক্ত বেশি লাল? শহীদ আসাদের নাকি বোবা বউয়ের? এই প্রশ্নেই লুকিয়ে আছে পুরো উপন্যাসের মূল কথা।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছিলেন, ‘ওঙ্কার’-এ একটি জনগোষ্ঠী থেকে পরিপূর্ণ একটি জাতিতে পরিণত হওয়ার সংকল্প ঘোষিত হয়েছে। এত ছোট পরিসরে এত বড় কথা বাংলা সাহিত্যে বিরল।

৯. ‘আমার যত গ্লানি’, রশীদ করীম

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে সবচেয়ে কম আলোচিত কিন্তু সবচেয়ে সাহসী উপন্যাসগুলোর একটি ‘আমার যত গ্লানি’। এখানে রশীদ করীম লিখেছেন তাদের কথা, যারা সংকটের মুহূর্তে সাহসী হতে পারেননি।

মুক্তিযুদ্ধে মধ্যবিত্তের ভূমিকা সবার আগে থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে শিক্ষিত মধ্যবর্গের যে দ্বিধান্বিত টানাপড়েন, সেই সত্যকে অকপটে মেলে ধরেন রশীদ করীম।

‘আমার যত গ্লানি’র এরফান প্রায় লম্পট চরিত্রের মানুষ। উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজের এই যুবক জীবনকে ছুঁয়ে দেখতে চায়, আনন্দময় অভিজ্ঞতাগুলো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে চায়। সারাদেশ মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, সেটি অবলোকন করেও ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার কোনো আগ্রহ বোধ করে না সে। বরং ব্যস্ত থাকে নিজের ভোগ-বিলাসের আয়োজনে।

একাত্তরে সবাই বীর ছিলেন না। অনেকে ভয় পেয়েছেন, গা বাঁচিয়ে চলেছেন, সুযোগ খুঁজেছেন। এই সত্যটি স্বীকার করার সাহস বেশিরভাগ লেখকের ছিল না। রশীদ করীম সেই সাহস দেখিয়েছেন এবং শিরোনামের ‘গ্লানি’ শব্দটিতেই লুকিয়ে আছে উপন্যাসটির মর্মকথা। কোনো দিকে না ঝুঁকে তিনি নিজের লেখাটা নিজের মতো করে লিখে গেছেন।


১০. ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’, শহীদুল জহির

এই তালিকার অন্য নয়টি উপন্যাস যেখানে একাত্তরের নয় মাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, শহীদুল জহির সেখানে প্রশ্ন তুলেছেন— স্বাধীনতার পরে কী হলো?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর দেশে রাজাকারদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়ন এই নাতিদীর্ঘ উপন্যাসের মূল উপজীব্য।

১৯৮৫ সালে একদিন লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ রায়সাহেব বাজারে যাওয়ার পথে স্যান্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে যাওয়ার মতো তুচ্ছ ঘটনা দিয়ে শুরু হয়। ৬২ পৃষ্ঠা পর কাহিনীর শেষে দেখা যায়, আব্দুল মজিদ দৈনিক ইত্তেফাকে বিজ্ঞাপন দিয়ে তার বাড়িটি বিক্রি করে লক্ষ্মীবাজার থেকে বসত উঠিয়ে চলে যান। ফলে তার অস্তিত্বই যেন মুছে যায়।

যে দেশের জন্য তিনি লড়াই করেছিলেন, সেই দেশেই তিনি পরাজিত। বাংলা কথাসাহিত্যে শহিদুল জহির যোগ করেছেন জাদুবাস্তবতাবাদের স্বতন্ত্র রীতি। স্বাধীনতার অর্থ কেবল একটি পতাকা নয়, একটি মানুষের নিজের মাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারা। এই উপলব্ধিই শহীদুল জহিরের উপন্যাসটিকে এই তালিকার অনিবার্য সমাপ্তি করে তোলে।

নির্বাচিত এমন পাঠের বিষয়ে কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল বলেন, ‘ইতিহাসের বর্ণনা করা উপন্যাসের কাজ নয়। বরং উপন্যাস ধরে রাখে জনজীবনের স্মৃতি, সমাজের স্মৃতি—সেটা ব্যক্তিজীবন হতে পারে, সামষ্টিক জীবনও হতে পারে।’

‘কেউ যদি জানতে চান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মুন্সীগঞ্জের পদ্মার চরে ভূমিলগ্ন মানুষের জীবন কেমন ছিল, কোনো ইতিহাসগ্রন্থে কি তা পাওয়া যাবে? না, যাবে না। বরং এমন প্রশ্নকে হাস্যকর বলে চিহ্নিত করা হবে, কিংবা এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া অসম্ভব মনে হবে।’

‘কিন্তু আপনি যদি আবু ইসহাকের “পদ্মার পলিদ্বীপ” পড়েন তাহলে এই আপাত-অসম্ভব উত্তরও পেয়ে যাবেন। কিংবা কেউ দেড়শ বছর আগের রাশিয়ার জনজীবন কেমন ছিল তা জানতে চাইলে পড়তে হবে দস্তভয়েস্কি বা তলস্তয়ের উপন্যাস। কোনো ইতিহাসগ্রন্থে এগুলোর সন্ধান পাওয়া যাবে না।’

এ প্রসঙ্গে কথা হয় মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা এমন নয় যে মুক্তিযুদ্ধকে জানতে নির্দিষ্ট কিছু উপন্যাস পড়তে হবে। পাঠক নিজ অভিরুচি অনুসারে পড়তে পারেন। তবে তাকে পড়তে হবে।’

‘মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের বেশকিছু কাজ এখন ক্লাসিক হয়ে গেছে। যেমন “রাইফেল রোটি আওরাত” এ ওই সময়টা চিত্রিত হয়েছে। যুদ্ধ চলছে, আনোয়ার পাশা লিখছেন। দিনশেষে তো তাকে জীবনটাই দিতে হলো। তাই উপন্যাসের লেখকের জীবন ও তার নিজের লেখা গল্প দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।’

‘মুক্তিযুদ্ধের মতো ঘটনাকে কিছু লেখা বড় মাপে তুলে আনে, কিছু লেখা আবার বিন্দুকে সিন্ধু করে তোলে। তবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক খুব কম পপুলার সাহিত্য আছে। মুক্তিযুদ্ধের ফিকশনের বেশিরভাগই সিরিয়াস, গুরুত্ব দিয়ে লেখা। এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের খুব ইউনিক বৈশিষ্ট্য।’

‘একাত্তর নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য লেখা রয়েছে। কিন্তু এত লেখার ভিড়ে প্রায়ই হারিয়ে যায় সেই রচনাগুলো, যেগুলো যুদ্ধকে কেবল ঘটনার বিবরণের বাইরে মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতম প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরেছে।’

‘উপরের তালিকার উপন্যাসগুলো রণাঙ্গনের একেকটি সচিত্র আখ্যান। আলাদা আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে একটি জাতির জন্ম, বেদনা, সংকট ও স্বপ্নভাঙার গল্প এগুলোর মাঝে উঠে এসেছে। কেউ লিখেছেন বুলেটের গন্ধ মেখে, কেউ কাদামাটির মানুষের নিঃশব্দ বীরত্ব নিয়ে, কেউ আবার বলেছেন যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বাসঘাতকতার কথা।’

‘একসঙ্গে পড়লে এই ১০টি উপন্যাস একাত্তরের একটি পূর্ণচিত্র তৈরি করে, যেটি অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া কঠিন।’