সমুদ্র, সংগ্রাম আর মানুষের মর্যাদার গল্পের যে বই আজও ভাবায়

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

একটা সময় ছিল, যখন পছন্দের বইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে কিছুটা দ্বিধান্বিত বোধ করতাম। এত বই পড়েছি, কোনটিকে পছন্দের বই বলবো! তবে এখন এই তালিকাটা গুছিয়ে আনা হয়েছে এবং এই তালিকায় প্রথমেই জায়গা দেওয়া হয়েছে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ বইটিকে।

খুব স্বাভাবিকভাবেই কিছু বই পড়ার পর এর রেশ থেকে যায়। মনে হয়, লেখক যেন শুধু একটি গল্প লেখেননি, বরং তিনি তার বইয়ের পাতায় মানুষের জীবন, এর নানা ঘাত-প্রতিঘাত, এরপরেও হার না মেনে নেওয়া—সবকিছু মিলিয়েই পাঠকদের কিছু শেখাতে চেয়েছেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ ঠিক তেমনই একটি বই। বহু বছর আগে লেখা এই ছোট উপন্যাসটি আজও আমাদের ভাবায়, অনুপ্রেরণা দেয়। বোঝায়—সংগ্রাম মানে কী, পরাজয় কাকে বলে, আর মানুষের মর্যাদা কোথায়।

হেমিংওয়ে ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক। তার পরিচয় শুধু একজন ঔপন্যাসিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ছিলেন সাংবাদিক, ভ্রমণপ্রিয় মানুষ ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক লেখক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি অ্যাম্বুলেন্সচালক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। পরে সাংবাদিকতা করেছেন, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার নানা দেশ ঘুরেছেন। যুদ্ধ, সমুদ্র, শিকার, মানুষের ভয় ও সাহস—এই অভিজ্ঞতাগুলোর প্রতিফলন তার লেখায় বারবার দেখা যায়।

হেমিংওয়ের লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—সহজ ভাষা। অল্প কথায় গভীর অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতা তার লেখাকে আলাদা করে তুলেছে। অনেক পাঠক-লেখকই তার লেখাকে ‘আইসবার্গ থিওরি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। কেননা গল্পের শুরুটা হয় খুবই সামান্য, কিংবা সরল কোনো চিত্র দিয়ে। কিন্তু তার পরবর্তীতেই লুকিয়ে থাকে অনেক জীবন ও বাস্তবতার নানান অর্থ। ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ এই বৈশিষ্ট্যের এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসই হেমিংওয়েকে নতুন করে বিশ্বসাহিত্যে প্রতিষ্ঠা দেয় এবং এর জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। পরে এই কাজসহ সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কারও পান।

বইটির গল্প আপাতদৃষ্টিতে খুব সরল। কিউবার এক বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগো টানা ৮৪ দিন কোনো মাছ ধরতে পারেননি। গ্রামের মানুষ তাকে দুর্ভাগা মনে করতে শুরু করেছে। তবু সান্তিয়াগো হাল ছাড়ে না। একদিন এই জেলে দূর সমুদ্রে গিয়ে বিশাল এক মার্লিন মাছের সঙ্গে লড়াই শুরু করেন, যে লড়াই চলে টানা কয়েক দিন। এই লড়াইয়ের গল্প পড়তে পড়তে ধীরে বোঝা যায়—এটি কেবল একটি মাছ ধরার গল্প নয়; মানুষের ধৈর্য, একাকীত্ব ও জীবনের আত্মমর্যাদার গল্প।

সান্তিয়াগো জানেন—তিনি বয়স্ক, তার শক্তি কমে গেছে। তবু তিনি নিজের দক্ষতার ওপর বিশ্বাস হারান না। এই জায়গাটিই গল্পটির সবচেয়ে বড় দিক। এটি শেখায়—জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন ফলাফল আমাদের পক্ষে থাকে না। কিন্তু মানুষের পরিচয় তার সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তার পরিচয় নিজের চেষ্টা ও দৃঢ়তায়।

আরেকটি বিষয় এই বইয়ে খুব সূক্ষ্মভাবে উঠে এসেছে—মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক। সান্তিয়াগো সমুদ্রকে কিংবা তার মার্লিন মাছটাকে যখন সমুদ্রের ‘রাক্ষুসে’ হাঙরেরা খেতে আসে, কোনো কিছুকেই শত্রু হিসেবে দেখেনি। সান্তিয়াগো বরঞ্চ সমুদ্র, মাছ ও পাখিদের সঙ্গে এক ধরনের বন্ধুত্ব তৈরি করে নেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করার জন্য নয়। বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের জন্যই মানুষ।

The Old Man and The Sea
ছবি: সংগৃহীত

বইটির আরেকটি চরিত্রের কথা না বললেই নয়, ম্যানোলিন! বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগোকে ঘিরে গল্প এগোলেও ম্যানোলিন চরিত্রটি নীরবে পাঠকের মনে গভীর ছাপ রেখে যায়। গল্পের কেন্দ্রে তাকে খুব বেশি সময় উপস্থিত থাকতে দেখা যায় না। কিন্তু তারপরেও এই চরিত্রটির উপস্থিতি উপন্যাসটির একটি ভিত্তি তৈরি করেছে।

ছোটবেলা থেকেই সান্তিয়াগোর সঙ্গে মাছ ধরা শিখেছে ম্যানোলিন। সমুদ্র, জাল, নৌকা—সবকিছুর সঙ্গেই তার পরিচয় সান্তিয়াগোর হাত ধরে। কিন্তু যখন এই সান্তিয়াগোই টানা ৮৪ দিন কোনো মাছ ধরতে পারে না, তখন ম্যানোলিনের বাবা-মা তাকে অন্য একটি ‘সৌভাগ্যবান’ নৌকায় কাজ করতে পাঠায়। এই ছোট্ট ঘটনাটি গল্পের সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে। মানুষের মূল্যায়ন প্রায়ই সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

তবু ম্যানোলিনের ভেতরে সান্তিয়াগোর প্রতি বিশ্বাস একটুও কমেনি। সে প্রতিদিন বৃদ্ধের কাছে আসে, তার সঙ্গে কথা বলে, সার্ডিন মাছের খাবার নিয়ে আসে, জাল গুছিয়ে দেয়। ম্যানোলিন চরিত্রটির মধ্যে আমরা এক ধরনের নিষ্ঠা দেখতে পাই, যা আধুনিক যান্ত্রিক এই জীবনে প্রায়ই বিরল মনে হবে। কিন্তু ম্যানোলিন জানে যে—সান্তিয়াগো এখন দুর্ভাগা জেলে, তবু তার শ্রদ্ধা অটুট।

তবে বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত আসে গল্পের শেষদিকে। বহু কষ্টে মার্লিন মাছটি ধরার পর যখন এই বৃদ্ধ জেলে তীরে ফেরে, তখন ‘রাক্ষুসে’ হাঙরগুলো মাছটিকে খেয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত তিনি তীরে পৌঁছান কেবল একটি কঙ্কাল নিয়ে। এই পরিণতি পাঠককে প্রথমে হতাশ করবে। মনে হবে—এত সংগ্রাম, টিকে থাকার উৎসাহ-উদ্দীপনা বৃথা। কিন্তু এখানেই লেখক হেমিংওয়ের পাঠকদের প্রতি বার্তা—‘পরাজয় সব সময় ফলাফলে নির্ধারিত হয় না’। সান্তিয়াগো মাছ হারিয়েছে ঠিকই। কিন্তু এই বৃদ্ধ জেলে নিজের মর্যাদা, জীবনে টিকে থাকার শক্তি হারায়নি।

এই বইটি বেশ কয়েকবার পড়েছি। প্রথম যখন পড়েছিলাম, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, বয়স ১৮ বছরের মতো। এরপর আবার পড়েছি ছাত্রজীবন শেষে। বইটি পড়তে যেয়ে আমি বারবার নিজের জীবনের কিছু অভিজ্ঞতার কথা ভাবি। অনেক সময় আমরা কোনো লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করি, হয়তো একটি গবেষণা, একটি লেখা বা কোনো স্বপ্নের পেছনে ছোটার নিরন্তর চেষ্টা। কিন্তু আমাদের সব প্রচেষ্টাই যে তাৎক্ষণিকভাবে ফল দেবে এমনটি নয়। কখনো মনে হয় আমরা যেন সান্তিয়াগোর মতোই সমুদ্রে একা নৌকা চালাচ্ছি। চারদিকে জীবনের সফেন। চারপাশে সন্দেহ, ভেতরে ক্লান্তি, তবু থেমে যাওয়ার সুযোগ এখানে নেই। একইসঙ্গে কেবল পরাজয় নয়, নানান পট পরিবর্তনের জীবন আমাদের অনেক কিছু দেয়ও বটে।

আর এখানেই ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রাণিত করে। এটি মনে করিয়ে দেয়—সংগ্রাম নিজেই এক ধরনের অর্জন। সাফল্য যদি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি আমাদের হাতে না-ও আসে, তবু সেই প্রচেষ্টার ভেতরে মানুষের চরিত্রটা তৈরি হয়। সান্তিয়াগোর মতো মানুষ এই পুঁজিবাদের যুগে হয়তো জীবনের সব লড়াই জেতে না, কিন্তু তারা নিজেদের ভেতরের সাহসটুকু ধরে রাখে। এই কারণেই বইটি সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনো সমুদ্র আছে। সান্তিয়াগোর গল্প আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত শক্তি তার অদম্য মনোবলে।

শেষ পর্যন্ত ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ পড়ে মনে হয়েছে—মানুষকে হয়তো ক্ষতবিক্ষত করা যায়, তাকে ক্লান্ত করা যায়, কিন্তু তার ভেতরের সাহসকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া খুব সহজ নয়। আর এই বিশ্বাসটাই হয়তো আমাদের আবার নতুন করে সমুদ্রে নৌকা ভাসাবার সাহস দেয়।