প্রাচীন সাহিত্যকে নতুন চোখে দেখার কবি অ্যান কারসন

রবিউল কমল
রবিউল কমল

অ্যান কারসনের কবিতা অনেকটা পুরোনো কোনো বাক্স খুলে নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার মতো। তিনি এমন সব প্রাচীন ও প্রায় ভুলে যাওয়া সাহিত্যকে নতুন জীবন দেন, যেগুলো সাধারণ পাঠকের কাছে বেশ দুর্বোধ্য মনে হতে পারে।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, হয়তো অনেকেই কারসনের লেখা পড়েছেন, অথচ তা জানেন না। যখন টাম্বলার বেশ জনপ্রিয়, তখন কবিতা ও সাহিত্যের বিভিন্ন কমিউনিটিতে তার অনুবাদ করা প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশ ‘ইফ নট, উইন্টার’ বেশ পরিচিত ছিল।

কারসন নিজেও প্রাচীন সাহিত্যের গবেষক। দীর্ঘদিন তিনি কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ল্যাসিকস পড়িয়েছেন। কিন্তু তার লেখার মজার ব্যাপার হলো, কঠিন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে ঢুকতে অনেকের কাছে তিনিই হয়ে উঠেছেন সহজ দরজা।

Canadian Poet Anne Carson Is Awarded Nobel Prize in Literature - The New  York Times

একবার নিউইয়র্কের ব্রুকলিন পাবলিক লাইব্রেরিতে নন্দনতত্ত্ব বা সৌন্দর্যবোধ নিয়ে তিনটি বক্তৃতা দেন কারসন। অনুষ্ঠানটির টিকিট কয়েক সপ্তাহ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। বক্তৃতা শুরুর প্রায় এক ঘণ্টা আগেই তরুণদের লম্বা লাইন পড়ে যায়।
কারসন কী বলবেন, তা নিয়ে সবার কৌতূহল ছিল। সৌন্দর্য নিয়ে কোনো বড় তত্ত্ব দেবেন? ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির ইতিহাস খুলে বসবেন? নাকি কবিতা নিয়ে নিজের কোনো গোপন সূত্র জানাবেন?

শেষ পর্যন্ত কারসন যা করলেন, তা এসবের কোনোটাই নয়।

প্রথম বক্তৃতায় তিনি ‘স্থিরতা’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হেলেন অব ট্রয়, স্যাফো, জন কেজ, এমিলি ডিকিনসন, ভার্জিনিয়া উলফ, উইলেম দে কুনিং ও জেনি হলজারের মতো একেবারে ভিন্ন সময়ের শিল্পী ও লেখকদের একসঙ্গে হাজির করলেন।
শ্রোতাদের কেউ কেউ হয়তো তাল হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু কারসনের চিন্তার জগৎ দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায়ও ছিল না।

দ্বিতীয় বক্তৃতায় বিষয়টি আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। বাবার ডিমেনশিয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন তিনি। বাড়ির ভেতরের বিভিন্ন জায়গা ও কাজ বোঝাতে তার বাবা দেওয়ালে লিখে রাখতেন, ‘বাতিটা বন্ধ করো’, ‘এখানে যাও’, যেন পরিচিত পৃথিবীটা ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যাওয়ার মধ্যেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যায়।

এখানে এসে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়াও বদলে যায়। প্রাচীন গ্রিক বা শিল্পের তত্ত্বের চেয়ে কারসনের নিজের জীবনের গল্প যেন তাদের বেশি কাছে টেনে নেয়।

Anne Carson @Lillian Vernon Creative Writers House, NYU 01.02.2017 : Anne  Carson : Free Download, Borrow, and Streaming : Internet Archive

তৃতীয় বক্তৃতার বিষয় ছিল একটি চেয়ার। হ্যাঁ, সাধারণ একটি চেয়ার!

কারসন দেখালেন, একটি চেয়ার কেবল বসার জিনিস নয়। সমাজ ও সংস্কৃতিতে এটি মনোযোগ, ক্ষমতা ও অবস্থানের প্রতীকও হতে পারে।

তার সঙ্গে ছিলেন নৃত্যশিল্পী জোনাহ বোকার। তিনি নাচের মাধ্যমে কারসনের কথাগুলোকে যেন মঞ্চে দৃশ্যমান করে তুলছিলেন।

এরপর কারসন কানাডীয় শিল্পী বেটি গুডউইনের একটি চিত্রকর্ম নিয়ে কথা বলেন। ছবিতে ধূসর রঙে আঁকা এক নারী চেয়ারে বসে আছেন। চারপাশে কয়েকটি লাল রেখা।

কারসন ভাবতে থাকেন, এই নারী কী ভাবছেন? তিনি কি গ্রিক পুরাণের পেনেলোপের মতো হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের অপেক্ষায় আছেন? নাকি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের মতো নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেছেন? নাকি অন্যকিছু!

তিনি কোনো উত্তর দেননি। বরং এই ছবিকে ঘিরেই নিজের কবিতা ‘সিটেড ফিগার উইথ রেড অ্যাঙ্গেল’ পড়তে শুরু করেন।
কবিতাটি নিয়ে তার মজার মন্তব্য ছিল, পুরো কবিতাটাই লেখা হয়েছে শর্তযুক্ত বাক্যে, অর্থাৎ ‘যদি’ দিয়ে! এমন বাক্য মোট ৭৩টি। শ্রোতাদের তিনি বলে দেন, ‘ফ্রয়েডের কাছে পৌঁছালে বুঝবেন অর্ধেক পথ পার হয়ে গেছেন।’

শ্রোতারা হেসে ওঠেন।

Anne Carson's towering 'Autobiography of Red' at 25

কবিতা শেষ করে কারসন ধন্যবাদ জানালেন এবং কোনো প্রশ্নের সুযোগ না দিয়েই মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন।

শ্রোতারা কিছুটা হতভম্ব। এতক্ষণ ধরে বক্তৃতা শুনে শেষে মনে হলো, ‘আচ্ছা, কিন্তু আসলে তিনি কী বোঝাতে চাইলেন?’
তবে পরে বিষয়টি অন্যভাবে দেখা যায়। কারসন কখনোই নিজের কাজের সহজ ব্যাখ্যা দিতে আগ্রহী নন। তার বিশ্বাস, শিল্পের অর্থ শিল্পীর মুখ থেকে শুনে নেওয়ার চেয়ে নিজের মতো করে তা বোঝার চেষ্টা করা বেশি জরুরি।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, পাঠকের মধ্যে তিনি কেবল বোঝাপড়ার একটি ‘সুগন্ধ’ ছড়িয়ে দিতে চান। বাকিটা পাঠক নিজেই ভাববেন, নিজের মতো করে বুঝবেন।

সম্ভবত তার সেই বক্তৃতাগুলোর উদ্দেশ্যও ছিল এটাই। সৌন্দর্য কী, ভালো কবিতা কাকে বলে, এসবের তৈরি উত্তর না দিয়ে তিনি শ্রোতাদের সামনে কিছু ছবি, কিছু গল্প, কিছু প্রশ্ন রেখে গেছেন।

শেষে বাবার একটি কথাই মনে পড়ে তার, ‘একবক্স দেশলাই দিয়ে পৃথিবীর প্রায় সবকিছু বোঝানো যায়, কেবল একবক্স দেশলাইকে বোঝানো যায় না।’

শিল্পও হয়তো তেমনই। তাকে ব্যাখ্যা করে শেষ করা যায় না। তার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হয়, তারপর নিজের মতো করে বুঝে নিতে হয়।

সূত্র: নিউইয়র্কার, দ্য কারভারসেশন, এএফপি