ছড়ার আলোয় জাগরুক সুকুমার বড়ুয়া

জিয়া হক
জিয়া হক

সুকুমার বড়ুয়ার মতো ছড়াশিল্পী কখনো বিদায় নেন না। নিতে পারেন না শিল্পের অবয়বে, কোটি মানুষের হৃদয়ে আকাশের উজ্জ্বলতম তারা লুব্ধকের মতো জ্বলতে থাকে।

প্রায় ৬০ বছর ধরে ছড়া লিখে সুকুমার বড়ুয়া 'ছড়ারাজ', 'ছড়াশিল্পী', 'ছড়াসম্রাট' প্রভৃতি নানা অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছেন। তাই তিনি কখনো বিদায় নিতে পারেন না। তিনি বেঁচে থাকবেন বহুদিন।

এখনো দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে সুকুমার বড়ুয়ার 'মুক্তিসেনা' ছড়াটি অন্তর্ভুক্ত আছে। আমাদের সময়েও ছিল। প্রায় ২৫ বছর পরেও ছড়াটির একটি শব্দও ভুলিনি।

আমার মতো লাখো শিক্ষার্থীর হৃদয়ে গেঁথে আছে ছড়াটি। মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধ করে হেসে হেসে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে।

এত অল্প বয়সেও ছড়াটি পাঠের সময় একটি তেজদীপ্ত চেতনা অনুভব করতাম। মনে পড়ে, আমাদের স্কুলের বাংলা শিক্ষক কীভাবে ছড়াটি পাঠ করেছিলেন। মনে হয়েছিল, শিক্ষক তখন পাক হানাদারদের সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ করছিলেন। ছড়াটির কয়েকটি চরণ এমন—

ধন্য সবাই ধন্য 

অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে

মাতৃভূমির জন্য।

ধরল যারা জীবন বাজি

হলেন যারা শহীদ গাজি

লোভের টানে হয়নি যারা

ভিনদেশীদের পণ্য।

এভাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা বাঁক, নানা মুহূর্ত তার ছড়ায় উঠে এসেছে। এমন চিত্র ও চিন্তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে।

গতকাল সুকুমার বড়ুয়ার মৃত্যুর পর 'এমন যদি হতো' শিরোনামের ছড়াটি অনেকে ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। প্রকাশ করেছেন ছড়াটির প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসা।

ছড়াশিল্পীর দুঃসংবাদের পাশাপাশি তার বিভিন্ন ছড়াও সারাদিন ফেসবুকের নিউজফিড দখল করে ছিল। বাংলা সাহিত্যে গৌরবের সঙ্গে বেঁচে থাকার মতো অসংখ্য কালজয়ী ছড়া রয়েছে সুকুমারের।

যেখানে একটি ছড়াই যথেষ্ট, সেখানে তার কয়েক ডজন ছড়াই তাকে অমরত্ব দিতে প্রস্তুত। 'এমন যদি হতো' ছড়াটির কথাই ধরা যাক—

এমন যদি হতো

ইচ্ছে হলে আমি হতাম

প্রজাপতির মতো

নানান রঙের ফুলের পরে

বসে যেতাম চুপটি করে

খেয়াল মতো নানান ফুলের

সুবাস নিতাম কতো।কী অসম্ভব সুন্দর বয়ান এই ছড়াটিতে। প্রজাপতি, ফুল ও সৌন্দর্যের প্রতীক হতে চাওয়া এই ছড়াটি সকল অসুন্দরের বিপক্ষে ফুলের গন্ধের মতো মোহনীয়। আশ্চর্য ভালো লাগা ও ভালোবাসার মাদকতা ছড়ানো এমন ছড়া পুরো বাংলা সাহিত্যেই খুব বেশি চোখে পড়ে না।

সুকুমার বড়ুয়ার মাস্টারপিস বা সিগনেচার ছড়া হিসেবে পরিচিত 'অসময়ে মেহমান'। বাংলা সাহিত্যের তুমুল জনপ্রিয় প্রথম দিকের ছড়াগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

মেজবানের তীব্র অসহায়ত্ব প্রত্যক্ষ করেও মেহমান কী আশ্চর্য নির্বিকার!

ছড়াটিতে দুর্দান্ত নাটকীয়তা ও চরম বাস্তবতার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। দুজনের কথোপকথনের মধ্যে দারুণ হাস্যরস থাকলেও, দিনশেষে সমাজের নিদারুণ আশ্চর্য চরিত্রকেই কটাক্ষ করা হয়েছে।

সুকুমারের ছড়ার যে অভিনবত্বের কথা বলা হয়, তার সবই এই ছড়ার মধ্যে উপস্থিত। ছন্দের মোহনীয় ঝংকার, প্রবল হাস্যরস, তুমুল নাটকীয়তা, অন্ত্যমিলের অভিনবত্ব, শ্লেষ, ব্যঙ্গ ও কটাক্ষ—সর্বোপরি বাস্তব সমাজচিত্র।

একটি পরিপূর্ণ ছড়ার ভেতরে যত উপাদান প্রয়োজন, তার সবই 'অসময়ে মেহমান'-এ উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত।

অসময়ে মেজমান

ঘরে ঢুকে বসে যান

বোঝালাম ঝামেলার

যতগুলো দিক আছে

তিনি হেসে বললেন

ঠিক আছে ঠিক আছে।

'অসময়ে মেহমান' সম্পর্কে আর বাক্য ব্যয় করার যৌক্তিকতা নেই। এতক্ষণে পাঠক নিশ্চয়ই অসময়ে মেহমানের চোখেই হারিয়ে গেছেন।

সুকুমারের ছড়ায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ ইতিহাসের নানা গৌরবময় অধ্যায় উঠে এসেছে। 'সাফল্য' ছড়াটির দিকে একবার তাকানো যাক—

বাহান্নতে বীজ বুনেছে

একাত্তরে দেখ রে আজ

বাংলাদেশের নতুন গাছে

ফুলে ফুলে নতুন সাজ।

......

বিশ্বে লাগে বিরাট কাঁপন

শূন্য হাতেই শত্রু শেষ

মুক্তিসেনার রক্তে ডুবে

মুক্ত সোনার বাংলাদেশ।

মাত্র কয়েকটি চরণেই বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ফুলের মতো ফুটে উঠেছে। বাংলা, বাঙালি, বাঙালির জীবনযাপন ও সংগ্রামের ছবি এমন বহু কালোত্তীর্ণ ছড়ায় পাওয়া যায় তার সৃষ্টিতে।

সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায় প্রকৃতি এসেছে আয়নার মতো স্বচ্ছতায়।

নদী চলে ঢেউ তুলে ভাসিয়ে দুকূল

ভোর হলে পাখি সব খুশিতে আকুল

মায়াভরা এই দেশে

হেসে–খেলে ভালোবেসে

দিনগুলো ভরে যায সুরেতে মধুর।

সুকুমার বড়ুয়া শিশুদের জন্য ছড়ায় এক চিরস্থায়ী রঙিন পৃথিবী নির্মাণ করে গেছেন। তার ছড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য স্বতঃস্ফূর্ততা। সহজ ভাষা ও সরল অভিব্যক্তিই তার ছড়ার প্রাণ। শেষ পর্যন্ত তার ছড়া শিশুকে নির্মল আনন্দ দেয়।

সুকুমারের 'বিয়ে' ছড়াটি পড়া যেতে পারে—

টেংরা মাছের মেয়ের বিয়ে

গান জুড়েছে বাতাশি

হঠাৎ করে গুজব রটে

বরের বয়স সাতাশি।

এই খবরে দারুণ ক্ষোভে

পিত্তি জ্বলে পাবদার

রাঘব বোয়াল চেঁচিয়ে বলে

রাখো তোমার আবদার।

বর্তমানের অনেক নেতা সাধারণ মানুষের সামনে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার ফাঁকা বুলি দেন। বাস্তবে তারা নিজের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেন। এই বাস্তবতাকে চট্টগ্রামের ভাষায় সুকুমার লিখেছেন—

লালমিয়া তো বিরাট নেতা

রাস্তাঘাডে ফাল মারে

দিনত বড় ভালামানুষ

রাইত দুপুরে জাল মারে

গরিবরলাই কাঁদি কাঁদি

টেঁয়া-পইসার টাল মারে।

সুকুমারের আরেকটি ছড়ায় মন দেওয়া যায়—

শেয়াল নাকি লোভ করে না

পরের কোনো জিনিসটার

কী পরিচয় দিলো আহা

কী সততা কী নিষ্ঠার...

তাই তো শেয়াল বনের মাঝে

এডুকেশন মিনিস্টার!

ষাটের দশকে লেখা এই ছড়াটি বাস্তবতার নিরিখে আজও প্রাসঙ্গিক—

বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধি গায়েব

মানীলোকের মান

সত্যবাদীর জিহ্বা গায়েব

নির্বিবাদীর কান।

প্রায় ছয় দশক ধরে বাংলা ছড়া সাহিত্যে অনবদ্য অবদান রাখার জন্য সুকুমার বড়ুয়া ২০১৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

বাংলা সাহিত্যে সুকুমার বড়ুয়া তার ছড়ার মতোই অসম্ভব শক্তি নিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। একদিকে তিনি বড় ছড়াশিল্পী, অন্যদিকে সহজ-সরল ও মাটির মানুষ। মাটির মানুষরা সাধারণত দেশ-মাটিকে আশ্রয় করেই অনন্তকাল বেঁচে থাকেন। দেশ মাটি যতদিন থাকে, তারাও ততদিন তেজোদীপ্ত হয়ে থাকেন।