পচা আলুর বিষক্রিয়ায় এবার ৩০০ বিঘা জমির ধান নষ্ট
ঈদের আগে মাত্র কয়েক দিনের বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গে মাঠেই পচে নষ্ট হয়েছে ৯১৬ হেক্টর জমির আলু। চোখের সামনে পরিপক্ব আলু তুলতে না পারার শোক না কাটতেই এসেছে নতুন সংকট। আলুর জমিতে এবার নষ্ট হয়েছে ধান।
উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন জয়পুরহাট জেলার আলু চাষিরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, এই জেলার ৮২১ হেক্টর জমির আলু চাষিরা তুলতে পারেননি। সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা এবং জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পচা আলু অপসারণ না করেই চাষিরা যেসব জমিতে বোরো রোপণ করেছিলেন, সেসব জমির বেশিরভাগ ধান নষ্ট হয়ে গেছে।
গত মঙ্গলবার বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার অপশন, ছাতিয়ানপাড়া, বম্বুপাড়া, ঝালখুর, গাঙগট এবং জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার মোসলেমগঞ্জ, গোবিন্দপুর, চাকলমওয়া গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার প্রায় ৩২০ বিঘা জমির ধান পচা আলুর বিষক্রিয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে।
ছাতিয়ানপাড়া ও অপশন গ্রামে কিছু কিছু জমির ধান সম্পূর্ণ এবং কিছু কিছু জমির ধান আংশিক নষ্ট হয়ে গেছে। সেই জমিতে মই দিয়ে কৃষক দ্বিতীয়বারের মতো ধান রোপণ করছেন। অনেক জমিতে পচা আলু থেকে এখনো গ্যাসের বুঁদ বুঁদ উঠতে দেখা যায়।
কৃষকরা বলছেন, কিছু হাইব্রিড জাতের ধান কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধানের চারা প্রথমে হলুদ হলেও, পরে সবুজ হয়ে গেছে। এসব এলাকায় কেউ দ্বিতীয়বার, কেউ কেউ তৃতীয়বারের মতো ধানের চারার খোঁজ করছেন। চারা না পেয়ে এবার বোরো ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে।
অপশন গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান বলেন, ‘হঠাৎ বৃষ্টিতে আলুর খেত তলিয়ে গেল। আমার প্রায় ৭২ শতক জমির আলু নষ্ট হয়েছে। ঈদের পরে সেই জমিতে অনেক টাকা খরচা করে ধান রোপণ করেছিলাম, কিন্তু ধানের সব চারাও মরে গেছে। এখন আবার অন্যদের জমি থেকে কিছু বয়স্ক চারা সংগ্রহ করে দ্বিতীয়বার রোপণ করছি।’
ছাতিয়ানপাড়া গ্রামের কৃষক সামছুল আকন্দ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বৃষ্টিতে ১৬০ শতক জমির আলু সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে আমার প্রায় দেড় লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। আবার ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ধান রোপণ করলাম, সেই ধানের সব চারা পচে গেছে। এখন দ্বিতীয়বার ধান রোপণের জন্য চারা পাচ্ছি না।’
এই গ্রামের আরেক কৃষক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘পচা আলুর জমিতে দুইবার ধান লাগলাম, সব চারা মরে গেল। এ বছর ৬০ শতক জমির আলু আর ধান নষ্ট হওয়ায় প্রায় দেড় লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। আবাদ করতে প্রতি শতক জমি ৮০০ টাকা চুক্তিতে লিজ নিয়েছিলাম। আলু নষ্ট হওয়ায় সেই টাকা শোধ করতে পারিনি। আলু চাষের জন্য এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলাম, জানি না সেই টাকাও এ বছর শোধ করতে পারবো কি না!’
যোগাযোগ করা হলে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে আলু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, তারা যেন আলু অপসারণ করে ধান লাগান। যারা সেই পরামর্শ মানেননি, তাদের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
‘যেকোনো জৈব পদার্থ পচতে ১৮ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। কৃষকরা সে পর্যন্ত অপেক্ষা করে ধান লাগালে এই ক্ষতি হতো না,’ বলেন এই কৃষি কর্মকর্তা।
হান্নান আরও বলেন, ‘আলু ও ধান চাষ করে ক্ষতির শিকার হয়েছেন এমন ৩১৯ কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আমরা দুই ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। বোরো ধানে ক্ষতিগ্রস্ত যেসব কৃষক আউশ আবাদ করবেন, তাদের বীজ ও সার সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।’