‘এহন খায়ামই কী আর মাজনরে কী দেম’
‘আমরা বেটাইনতের এনতো কাত্তি মাসে ঋণ আন্নে ডারসে গিরস্থি করি, আর বৈশাখ মাসে ঋণ উলারে দেই, আমরারও খোরাক চল্লে যায়। ইবার তো কিস্তাই নাইগে, এহন খায়ামই কী আর মাজনরে কী দেম।’—এভাবেই দ্য ডেইলি স্টারকে দুর্দশার কথা বলেন মিঠামইনের বজরপুর হাওরের কৃষক ফাইজুল ইসলাম।
৫ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন তিনি। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ২ একর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি ৩ একর জমির ধান কাটলেও শুকাতে পারেননি, চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে কৃষক ফাইজুলের প্রায় তিনশ মণ ধান নষ্ট হয়েছে।
ফাইজুল বলেন, ১ হাজার টাকায় পাঁচশ টাকা সুদে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এই আবাদ করেছিলাম। এহন সেই ঋণ কীভাবে ফেরত দেবো।
‘আমার সব শেষ, আমি এক্কেবারে সর্বহারা হয়ে গেছি। বাড়ি-ভিটা বেচা ছাড়া উফাই নাই’, বলেন তিনি।
ধান চাষের জন্য উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে এখন ফাইজুলের মতো দুশ্চিন্তায় অসংখ্য কৃষক।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বড় হাওর এলাকার কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, মহাজনের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চাষ করেছি। এখন কীভাবে সেই ঋণ শোধ করব—এই চিন্তায় রাতে ঘুমও আসে না।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, গত ২৬ এপ্রিল থেকে টানা ১০ দিন বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে জেলার ১৩ উপজেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত সাড়ে ৫২ হাজার কৃষক।
তিনি বলেন, জেলায় আনুমানিক তিনশ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে।
এদিকে, স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
বজরপুর হাওরের কৃষক আবু তাহেরের ৪ একর জমির মধ্যে অর্ধেকটাই পানিতে তলিয়ে গেছে।
তিনি জানান, অন্যান্য বছর এই জমি থেকে চারশ থেকে পাঁচশ মণ ধান পেতেন। এ বছর ২০ মণ ধানও পাচ্ছেন না।
আবু তাহের বলেন, মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলাম। এখন ঋণ শোধ আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে দু’মুঠো খাওয়ার জন্য ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাবো।
মিঠামইনের ঢাকি বন্দের কৃষক আক্কাস মিয়া ব্যাংক, মহাজন ও আড়তদারের কাছ থেকে আগাম প্রায় ৬ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১৫ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন।
আক্কাস বলেন, এখন পর্যন্ত ১ কেজি ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। ঋণ শোধ করতে জমি বেচা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এদিকে, টানা ১০ দিনের বৃষ্টির পর মঙ্গলবার থেকে রোদ উঠতে শুরু করায় কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, করিমগঞ্জ, নিকলী, ইটনার বিভিন্ন এলাকায় ধান শুকাতে ব্যস্ত সবাই।
খোলা মাঠে পানি জমে থাকায় সড়কেই চলছে ধান নাড়া, মাড়াই ও খড় শুকানোর কাজ। এতে যান চলাচল কিছুটা বিঘ্ন হলেও কৃষকদের সুবিধার্থে বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
নিকলী সড়কের ওপর ধান মাড়াইয়ে ব্যস্ত কৃষক সুবহান মিয়া বলেন, ২ দিন ধরে বৃষ্টি নাই। তবে আবার যদি বৃষ্টি শুরু হয়, এই ভয়ে যেখানে জায়গা পাচ্ছি, সেখানেই মাড়াই ও শুকানোর কাজ করছি।