চাহিদামতো মিলছে না সার, কুড়িগ্রামে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ

মোস্তফা সবুজ
মোস্তফা সবুজ

সরকার বলছে সারের ঘাটতি নেই। কিন্তু কুড়িগ্রামে চিত্রটা সেরকম নয়। সেখানে আমন ধান ও আগাম শীতকালীন সবজির জন্য কৃষি অফিস যে পরিমাণ সারের সুপারিশ করেছিল, তার অর্ধেকও বরাদ্দ পাননি কৃষকেরা।

জেলায় সারের সংকট নিয়ে কৃষকেরা ক্ষুব্ধ। কিছুদিন আগে সেখানে সারের এক ডিলারের গুদামে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আরেকটি ঘটনায় এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হন।

এই উত্তেজনার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ ইউনিয়ন পর্যায়ের সঙ্গে ওয়ার্ড পর্যায়েও সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়। ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় গিয়ে এই প্রতিবেদক দেখতে পান, গত বুধবার থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে সার দেওয়া শুরু হয়েছে।

তবে অবস্থার উন্নতি হয়নি। অনেক কৃষককেই খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। উপজেলার লক্ষ্মীর মোড় গ্রামে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা যায়।

৩ নম্বর ওয়ার্ডের অনুমোদিত ডিলার মতিয়ার রহমানের কাছে মোট ৪০ বস্তা সার ছিল। এর মধ্যে ৩০ বস্তা ডিএপি ও ১০ বস্তা টিএসপি থাকলেও ইউরিয়া সার একেবারেই ছিল না।

কৃষকেরা জানান, প্রথমে প্রতি দুইজনের জন্য এক বস্তা সার দেওয়ার নিয়ম করা হলেও পরে তা কমিয়ে তিনজনের জন্য এক বস্তা করা হয়। সেখানে প্রায় ৩০০ কৃষক উপস্থিত থাকলেও সার পেয়েছেন মাত্র ১০০ থেকে ১২০ জন।

ডাক্তারপাড়ার বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমি সাত বিঘা জমিতে ধান ও এক বিঘা জমিতে বেগুনের আবাদ করেছি। আমার এক বস্তা ইউরিয়া ও দুই বস্তা ডিএপি সার প্রয়োজন, অথচ আমাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র এক বস্তা টিএসপি। আমার স্বামী এর আগেও কয়েকবার ডিলারের কাছে গিয়েছেন, কিন্তু সার পাননি।’

দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করছেন ৩৮ বছর বয়সী মো. নুরুজ্জামান। তারও একই অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘আমি ডিএপি ও ইউরিয়া সার নিতে এসেছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে টিএসপি দিতে চেয়েছে। এই টিএসপি দিয়ে আমি কী করব?’

আরেক স্থানীয় কৃষক মো. নুরুদ্দিন বলেন, ‘আমি ১০ বিঘা জমিতে ধান ও বেগুন চাষ করেছি। আমার জরুরি ভিত্তিতে দুই থেকে তিন বস্তা ইউরিয়া ও ডিএপি দরকার, কিন্তু আমি কিছুই পাইনি।’

সেদিন বেশ কয়েকজন কৃষক কোনো সার না পেয়েই ফিরে গেছেন। তাদের বলা হয়েছে, পরবর্তী চালানের জন্য অপেক্ষা করতে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে খুচরা বিক্রেতা মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আজ আমাকে মাত্র ৪০ বস্তা সার দেওয়া হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে দুই বা তিনজনের মধ্যে এক বস্তা করে ভাগ করে দিতে হয়েছে। প্রায় ২০০ জন কৃষক খালি হাতে ফিরে গেছেন। আমি তাদের বলেছি, কাল নতুন চালান আসবে।’

পরে এই প্রতিবেদক ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ক্যাম্প মোড় এলাকার ইউনিয়ন পর্যায়ের ডিলার মেসার্স জনার্দন চন্দ্র সাহার দোকানে যান। সেখানে দেখা যায়, এক বস্তা সার তিন থেকে পাঁচজন কৃষকের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে অন্যান্য সার থাকলেও ইউরিয়ার দেখা মেলেনি।

বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের অনেক কৃষকের অভিযোগ, ডিলারের সঙ্গে যাদের ব্যক্তিগত পরিচয় বা খাতির আছে, তারাই শুধু সার পাচ্ছেন। বাকিদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যদিও খুচরা বিক্রেতা ও ডিলার প্রতিনিধিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ডিলার প্রতিনিধি আবুল হাশেম বলেন, ‘গতকাল আমি ২৭২ বস্তা ডিএপি, ১৭৮ বস্তা এমওপি, ৬০ বস্তা ইউরিয়া ও ৯৫ বস্তা টিএসপি পেয়েছি। আজ সেগুলো ৯ জন ওয়ার্ড পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতার মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।’

‘তবে ইউরিয়া সার আমি আটকে রেখেছিলাম, কারণ সরবরাহ খুবই অপ্রতুল। নতুন চালান আসার পর সেটি বিতরণ করা হবে।’

‘এই ইউনিয়নের কৃষকেরা দুধকুমার নদের চরে শত শত বিঘা জমিতে বেগুনের চাষ করেন। শুধুমাত্র এই মৌসুমের জন্য আমাদের অন্তত ২০০-৩০০ বস্তা টিএসপি, ৫০০ বস্তা ডিএপি এবং ১ হাজার ২০০ বস্তা ইউরিয়া সার প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে।’

সারের চাহিদা ও বাস্তবতা

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে।

এ ছাড়া আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে ২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে, যার মধ্যে ৩৪৫ হেক্টর বেগুনের জন্য এবং প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করা হয়েছে।

কৃষি অফিসের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া সারের চাহিদা হলো—আমন ধানের জন্য ১৯৫ কেজি, বেগুনের জন্য ২৬০ কেজি, ফুলকপির জন্য ২৯০ কেজি এবং বাঁধাকপির জন্য ২৬০ কেজি।

এই হিসাব অনুযায়ী, জেলায় শুধুমাত্র আমন ধানের জন্যই ২৩ হাজার ৬২৯ টন ইউরিয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে ফুলকপি ও বেগুনের জন্য আরও যথাক্রমে ৬৫ ও ৯০ টন ইউরিয়া যোগ করলে মোট চাহিদা দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৭৮৪ টন। কিন্তু জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৪৮৩ টন ইউরিয়া।

একইভাবে, টিএসপি সারের চাহিদা ৬ হাজার ১৬৪ টন হলেও বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ২ হাজার ১০৪ টন। আর ডিএপি সারের চাহিদা ১০ হাজার ৯০৫ টন হলেও বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৫ হাজার ৬৭ টন।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, ডিএপি সার ব্যবহার করলে টিএসপির প্রয়োজনীয়তা কমে এবং ইউরিয়ার চাহিদাও কিছুটা (প্রায় ৫ শতাংশ) হ্রাস পায়। তবে সরেজমিন দেখা গেছে, ইউরিয়া সার না পাওয়ার কারণেই কৃষকরা বাধ্য হয়ে ডিএপি সার বেশি ব্যবহার করছেন।

এর সত্যতা যাচাইয়ে এই প্রতিবেদক ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দুধকুমার নদের তীরের গনাইয়ের কুটি চরে যান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শত শত নারী-পুরুষ বিস্তীর্ণ বেগুনের খেতে কাজ করছেন।

সেখানে কথা হয় ১০ থেকে ১২ জন কৃষকের সঙ্গে। তাদের অনেকেই জানান, পর্যাপ্ত রাসায়নিক সার না পেয়ে তারা বাধ্য হয়ে জৈব সার ও ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহার করছেন। আবার কেউ কেউ ইউরিয়ার বদলে বিকল্প হিসেবে ডিএপি ব্যবহার করছেন।

কৃষকদের আরও অভিযোগ, কোনো ফসলে কী পরিমাণ সার দিতে হবে, সে বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তারা কোনো পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা পান না।

এসব বিষয়ে কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমন চাষের সময় জমি এমনিতেই বেশ উর্বর থাকে, তাই অনেক পরিমাণ ইউরিয়া ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক জমিতে বাড়তি সারের দরকার পড়ে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় খরিপ-২ এবং রবি মৌসুমে প্রচুর আগাম জাতের বেগুন চাষ হয়। এ কারণে আমরা নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ৬০০ টন সার চেয়ে আবেদন করেছি।’

মাঠপর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকবল খুবই কম, তাই প্রত্যেক কৃষকের কাছে সরাসরি গিয়ে দেখা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।’