শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার

লক্ষ্মীপুরে স্কুল ভাঙচুরের মামলায় আসামি আ. লীগের পলাতক নেতারা

ঘটনার দিন কারাগারে থাকলেও করা হয় আসামি
আনোয়ারুল হায়দার
আনোয়ারুল হায়দার

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্রাবাস থেকে এক ছাত্রের লাশ উদ্ধারের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। ওই হামলায় নিহতের স্বজন, প্রতিবেশী ও বিক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকজন অংশ নিলেও এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের।

মামলার প্রধান আসামিসহ বেশিরভাগ অভিযুক্তই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে পলাতক। এমনকি মামলার এক আসামি দাবি করেছেন, হামলার সময় তিনি কারাগারেই ছিলেন।

গত সোমবার রাতে ভোলকোট ইউনিয়নের বাসিন্দা রবিউল হাসান রাব্বি রামগঞ্জ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ২৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার প্রধান আসামি লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খান, যিনি গত ৫ আগস্টের পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। মামলার এজাহার অনুযায়ী, অভিযুক্ত সবাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।

এই মামলার অন্যতম আসামি তুহিন মালিক বলেন, ঘটনার সময় তিনি কারাগারে ছিলেন। তবু তাকে আসামি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঢাকায় দায়ের করা একটি মামলায় গত ৩ জুন আমি গ্রেপ্তার হই এবং ১৭ জুন জামিনে মুক্তি পাই। অথচ ১৬ জুনের ঘটনায় আমাকে আসামি করা হয়েছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারাগারের রেকর্ড যাচাই করলেই এর সত্যতা মিলবে।’

ঢাকার কচুক্ষেত এলাকার ব্যবসায়ী তুহিন আরও বলেন, ‘আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে তকমা দেওয়া হয়েছে।’

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরকারী রবিউল হাসান রাব্বি ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত। এ বিষয়ে কথা বলতে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেনের ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

গত ১৬ জুন ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্রাবাস থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসানের (১৪) লাশ উদ্ধার করা হয়। মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে ওই ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে সেদিন রাত ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত স্থানীয় জনতা ও স্বজনেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও রামগঞ্জ থানা-পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ওই ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় গত ১৮ জুন তার বাবা জিয়া উদ্দিন একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ফোন চুরির মিথ্যা অভিযোগে মেহেদীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল, যার জেরে তার মৃত্যু হয়। ওই মামলায় আটজনের নাম উল্লেখসহ আরও ৯-১০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়। পরে পুলিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির উপাধ্যক্ষ ও ছাত্রাবাসের সুপার শরিফুল ইসলাম এবং ১৯ বছর বয়সী ছাত্র সাজিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে।

ভাঙচুর মামলার এজাহারে যা আছে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১৬ জুন আসামিরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সামনে জড়ো হন। বাদী ও সাক্ষীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে আসামিরা তাদের ওপর হামলা করে আহত করেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ভাঙচুর করেন।

এতে আরও বলা হয়, ছাত্রের মৃত্যু নিয়ে জনগণের ক্ষোভকে পুঁজি করে আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। তারা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ধ্বংস করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আসামিদের জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। ঘটনার সময় কেউ যদি অন্য কোথাও বা কারাগারে থাকার দাবি করেন এবং তা যদি প্রমাণিত হয়, তবে সে অনুযায়ী যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।