‘মারধর করে চেক ও স্ট্যাম্পে সই নেওয়া পর আমাকে থানায় নেওয়া হয়েছিল’

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল

বরিশালে অগ্রণী হাউজিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) মারধর, জোর করে চেক ও স্ট্যাম্পে সই নেওয়ার পর সালিসের জন্য তাকে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

গতকাল সোমবার দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য জানান হামলার শিকার আবদুল আজিজ হাওলাদার।

তিনি বলেন, গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও তার সহযোগীরা অফিসে এসে আমাকে মারধর ও নির্যাতনের পর প্রথমে একটি ব্ল্যাংক চেক নেয়। পরে আরেকটি চেকে ৭০ লাখ টাকা লিখিয়ে নেয়। এরপর তারা পকেট থেকে দুই সেট স্ট্যাম্প বের করে ৬ পাতার কাগজে আমার সই ও সিল নেয়। পরে মোস্তাফিজুর বলেন—‘এখন থানায় চল। সেখানে সালিস হবে। তোর কাছে আমি টাকা পাই।’

‘এরপর আমাকে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তার আগে আমাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল, থানায় গিয়ে যেন মারধর ও জোর করে চেক-স্ট্যাম্পে সই নেওয়ার বিষয়টি না জানাই’, বলেন আবদুল আজিজ।

তিনি আরও বলেন, থানায় যাওয়ার পর ওসিকে না পেয়ে মোস্তাফিজ ও তার সহযোগীরা আমাকে পরিদর্শক (তদন্ত) লুৎফর রহমানের কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে মোস্তাফিজুর লিটু বলেন, ‘আমি আজিজের কাছে টাকা পাই। থানার মাধ্যমে সালিস করে বিষয়টির মীমাংসা করতে চাই।’ পরে পরিদর্শক লুৎফর রহমান লিখিত অভিযোগ দিতে বললে মোস্তাফিজুর একটি অভিযোগ দেন।

আবদুল আজিজ আরও বলেন, ‘আমার অফিসে ঢুকে যেভাবে আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চেক-স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে থানায় একটি কথাও বলিনি। কারণ তখন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আমি ভীষণ শঙ্কিত ছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, থানায় মুখ খুললেও সেখানেই তারা আবার আমার ওপর হামলা চালাতে পারে। সেই ভয়ে আমি নীরব ছিলাম।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক লুৎফর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ওইদিন ওসি ছুটিতে ছিলেন। আমি দায়িত্বে ছিলাম। রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোস্তাফিজুর লিটু ও আবাসন ব্যবসায়ী আজিজ থানায় এসে তাদের ব্যবসায়িক পাওনা নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়ে সালিস চান। আমি লিখিত অভিযোগ দিতে বললে মোস্তাফিজুর লিটু একটি অভিযোগ দেন। সে অনুযায়ী পরবর্তী সালিসের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ৫ জুলাই। তবে সেসময় ব্যবসায়ী আজিজ তার ওপর মারধর বা জোর করে সই নেওয়ার বিষয়ে আমাকে কিছুই জানাননি। ফলে আমি এর বেশি কিছু জানি না।

তবে অগ্রণী হাউজিং লিমিটেডের আরেক পরিচালক মাহবুবুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এর আগে থানায় বসা হয়েছিল। পরে ৫ জুলাই আবার বসার জন্য দিন ঠিক করা হয়। আমি ৫ জুলাই থানায় গিয়ে কাউকে পাইনি।

এদিকে, থানায় সালিস হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে কোতোয়ালি থানার ওসি মো. আল মামুন ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, গত ছয় মাসে আমি থাকা অবস্থায় এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

এ ঘটনায় করা মামলায় প্রধান আসামি মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও তার সহযোগী আবুল কালাম আজাদকে গতকাল বিকেলে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনিরুজ্জামান রাসেল ডেইলি স্টারকে বলেন, গ্রেপ্তার দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। আদালতে করা আবেদনটি মঙ্গলবার শুনানির জন্য দিন ধার্য আছে।

ওসি আল মামুন বলেন, মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

মোস্তাফিজুরের স্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন

এদিকে, অগ্রণী হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল আজিজের সঙ্গে সংঘটিত ঘটনাটি কোনো রাজনৈতিক বিরোধ বা চাঁদাবাজির ঘটনা নয় বলে দাবি করেছেন মামলার প্রধান আসামি মোস্তাফিজুর রহমান লিটুর স্ত্রী মৌসুমি আক্তার লুবনা।

তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক পাওনা প্রায় ১৭ লাখ টাকা আদায় করতে না পেরে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।

গতকাল সন্ধ্যায় বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি করেন।

এ সময় গ্রেপ্তার আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী ও অগ্রণী হাউজিংয়ের পরিচালক মাহাবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।