সব হারানোর সুর ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলচণ্ডী বাজারে

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

প্রবাদে আছে ‘ভাঙা হাটও একসময় জমে উঠে’। কিন্তু মঙ্গলচণ্ডী বাজারের ক্ষেত্রে সেই প্রবাদ আর সত্য হচ্ছে না। একসময় যে বাজারটি ছিল কেনা-বেচা, আড্ডা, দরদাম, বাক্যালাপ আর ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় মুখর; আজ সেই বাজারটিই প্রায় জনশূন্য।

একসময় সন্ধ্যা নামলে এই বাজারের প্রতিটি দোকানে আলো জ্বলে উঠতো, বহুদূর থেকে সেই আলো দেখা যেত। আজ সেখানে টিকে রয়েছে গুটিকয়েক দোকান। সন্ধ্যা নামলেই এখানে নেমে আসে নিকষ অন্ধকার।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের শ্রীবাউর এলাকার মঙ্গলচণ্ডী বাজারটিকে নিয়ে এখন কেবল বয়স্কদের স্মৃতিচারণই সম্বল। প্রায় ২০০ বছর আগে বাজারটির পত্তন করেন জমিদার যতীন্দ্র মোহন কর। জমিদারের প্রতিষ্ঠিত বাজার হওয়ায় প্রথমে বাজারটি ‘বাবুর বাজার’ হিসেবে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে কোনো এক সাপ্তাহিক মঙ্গলবার বাজারের পাশে পুকুর খননের সময় স্থানীয়রা একটি মূর্তি পেলে স্থানীয় বিশ্বাস থেকে মঙ্গলবারের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখা হয় ‘মঙ্গলচণ্ডী বাজার’।

মঙ্গলচণ্ডী বাজার
বর্তমানে মঙ্গলচণ্ডী বাজারে সাতটি স্থায়ী দোকান রয়েছে। ছবি: স্টার

অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারটি স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

একসময় মঙ্গলচণ্ডী বাজার ছিল মোস্তফাপুর ইউনিয়নের প্রধান ব্যবসায়িক কেন্দ্র। শ্রীবাউর ছাড়াও উপজেলার জগৎসী, মাড়কোনা, বাহারমর্দান, গয়ঘর, ভুজবল, আজমেরু, দজবালি, বাউরঘরি, কমলাকলস, ছিকিরাইলসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠতো এটি।

শ্রীবাউর গ্রামের বাসিন্দা মিফতাউল ইসলাম বলেন, ‘তখন রাস্তাঘাট এত ভালো ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বহু মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এ বাজারে বেচাকেনার জন্য আসতেন।’

এখনও প্রতি শুক্রবার মঙ্গলচণ্ডী বাজারে হাট বসে। সম্প্রতি এমনই এক হাটের দিন এই প্রতিবেদক ঘুরে আসেন হাটটি থেকে।

সন্ধ্যার দিকে বাজারে ঢুকতেই হাটে আগত বিক্রেতাদের জন্য নির্ধারিত টিনের চালার দোকান ও ফাঁকা জায়গাগুলো খালি পড়ে থাকতে দেখা যায়। পুরো বাজার জুড়েই যেন নিস্তব্ধতা। গুটিকয়েক দোকান থাকলেও বেশিরভাগ বন্ধ। কেবল একটি টং দোকানে চা বিক্রি হচ্ছে, একটি মুদির দোকান খোলা আছে। টং দোকানে অলস সময় পার করছিলেন কয়েকজন।

স্থানীয়রা জানান, এখন কেউ এলে বিশ্বাসই করবে না যে একসময় এখানে হাট করতে কয়েক হাজার মানুষের আগমন হতো।

বর্তমানে মঙ্গলচণ্ডী বাজারে একটি ওষুধের দোকান, একটি চায়ের দোকান ও দুটি মুদি দোকানসহ মোট সাতটি স্থায়ী দোকান রয়েছে। এসব দোকান খোলার কোনো নির্দিষ্ট সময়ও নেই।

বাজারের একপাশে পুরনো মন্দির এবং অন্য পাশে মোস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়। শত বছরের পুরনো এই স্থাপনা দুটি মঙ্গলচণ্ডী বাজারের নীরব পতনের সাক্ষী।

স্থানীয় পান বিক্রেতা জহির আহমেদ (৫৫) বলেন, ‘একসময় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত শাকসবজি ও নানান ফসল নিয়ে আসতেন। কারিগররা নিজেদের তৈরি বাঁশ ও বেতের সামগ্রী বিক্রি করতেন। জেলেরা হাওর থেকে তাজা মাছ ধরে নিয়ে আসতেন। গভীর রাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলতো।’

স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলচণ্ডী বাজার নিছক এক হাট বা বাণিজ্যকেন্দ্রই ছিল না, এটি ছিল আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষের সামাজিক মিলনস্থল। নিয়মিতই গ্রামবাসীরা বাজারে আড্ডার দিতে সমবেত হতেন। গভীর রাত পর্যন্ত বাজারে মানুষের যাতায়াত থাকত।

পুরো বাজার জুড়েই যেন নিস্তব্ধতা।
বাজারের একপাশে রয়েছে পুরনো মন্দির। ছবি: স্টার

যে কারণে জৌলুস হারিয়েছে মঙ্গলচণ্ডী বাজার

স্থানীয় বাসিন্দা মৃত্যুঞ্জয় রায় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত ১০–১৫ বছরে ক্রমান্বয়ে এই বাজারের গুরুত্ব কমেছে।’

তার ভাষ্য, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, হাওরে মাছের দুষ্প্রাপ্যতা, বাঁশ ও বেতের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন সামগ্রী ও কৃষি পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়া, এমন নানা কারণে বাজারের জৌলুস হারিয়েছে। একইসঙ্গে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও বড় ভূমিকা রেখেছে। মঙ্গলচণ্ডী বাজার থেকে মৌলভীবাজার শহরের দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় স্থানীয়রা বাজার করতে জেলা সদরে যেতেই পছন্দ করেন।

এ ছাড়া, শহরের বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্যতা থাকায় ক্রেতারা সেখানেই যান।

স্থানীয় ভুজবল গ্রামের বাসিন্দা জুনেদ আবেদীন বলেন, ‘স্থানীয়দের মধ্যে যারা আগে চাষবাস করতেন, তাদের অনেকেই পেশা বদলেছেন, অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। ফলে আগে যে গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর বাজারটি নির্ভর করত, তা অনেকটা বিলুপ্ত।’

মঙ্গলচণ্ডী বাজার
পুরো বাজার জুড়েই যেন নিস্তব্ধতা। ছবি: স্টার

বাজারের প্রাণ-চাঞ্চল্যতা ফেরানোর চেষ্টাও হয়েছিল

২০২১ সালে মঙ্গলচণ্ডী বাজারকে পুনরায় জনপ্রিয় করতে এবং বাজারের হারানো সুদিন ফেরাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উদ্যোগ নেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ স্থানীয়রা উদ্যোগ নিলেও বিষয়টি ফলপ্রসূ হয়নি।

শ্রীবাউর গ্রামের বাসিন্দা জিলদু মিয়া বলেন, ‘বাজারটি কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর আংশিকভাবে আবার চালু হয়েছিল। এখন শুধু কয়েকটি দোকান চালু আছে।’

গোয়ঘর গ্রামের বাসিন্দা মো. আমির শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একসময় বাবার হাত ধরে বাজারে আসতাম। তখন অনেক মানুষ বাজারে আসতো। বাজারটি পুনরায় চালু হলে স্থানীয়দের উপকার হবে। কারণ, এখন যাতায়াত ভাড়াও বেড়েছে।’

মঙ্গলচণ্ডী বাজারের উত্থান-পতন যেন এ দেশের গ্রামীণ জীবনের বাস্তবিক পরিবর্তনের অংশ। একদিকে গ্রামীণ সংস্কৃতির ভাঙন, ব্যস্ততম শহুরে জীবনের প্রসার, অন্যদিকে অভিবাসন ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দৌরাত্ম্যে ক্রমশ বিলীন হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী বাজার। একইসঙ্গে দুর্বল হচ্ছে সামাজিক বন্ধন।