তামাক নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার থেকে পিছু হটছে বিএনপি

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

নির্বাচনী ইশতেহারে তামাক নিয়ন্ত্রণের বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে পারে—এমন দুটি আইন সম্প্রতি সংশোধন করেছে সরকার। 

সরকার ই-সিগারেট উৎপাদন ও ব্যবহারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। পাশাপাশি, তিন-ফসলি বা উচ্চ ফলনশীল কৃষিজমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধের যে বিধান ছিল, সেটিও বাতিল করা হয়েছে।

তামাকবিরোধী কর্মীরা বলছেন, সরকারের এই পদক্ষেপ তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করবে, জনস্বাস্থ্যের হুমকি বাড়াবে। এটি সরাসরি দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এই আইনি পরিবর্তনগুলো বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

গত ১৯ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, দলটি তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার কথা বলেছিল। কিন্তু তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন দুর্বল করা হলে তা তরুণ সমাজ, বিশেষ করে নতুন ধূমপায়ীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করবে।

অবশ্য সরকারের এই অবস্থানকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন হায়দার। ইশতেহার বাস্তবায়নে গঠিত সরকারি সেলের এই সদস্যের দাবি, এসব পদক্ষেপে অঙ্গীকার ভঙ্গ হয়নি। তিনি বলেন, বিএনপি তামাকজাত পণ্যের অপব্যবহার রোধে এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তামাকবিরোধী কর্মীদের জোরালো দাবির মুখে গত বছরের জানুয়ারিতে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ই-সিগারেট বা ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। পরবর্তীতে ২৩ ডিসেম্বর একটি অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়, যেখানে তামাকজাত পণ্যের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয় এবং ই-সিগারেটের মতো পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিমালা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ওই অধ্যাদেশের ৬ (গ) ধারায় বলা হয়েছিল, ই-সিগারেট, ভ্যাপ, ভ্যাপিং ডিভাইস, ই-লিকুইড বা হিটেড টোব্যাকো পণ্যের উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, মজুত, বিজ্ঞাপন, বিপণন ও পরিবহন নিষিদ্ধ। এর ব্যত্যয় ঘটলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়। 

একই ধরনের অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে দণ্ড পর্যায়ক্রমে দ্বিগুণ হারে কার্যকর হবে।

এছাড়া, এসব পণ্য ব্যবহার করার দায়ে যেকোনো ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।

ই-সিগারেট (ইলেকট্রনিক সিগারেট) মূলত একটি ব্যাটারিচালিত যন্ত্র। এতে থাকা তরলকে তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়, যা ব্যবহারকারী নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন। একেই বলা হয় ‘ভ্যাপিং’। এই তরলে সাধারণত নিকোটিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকে।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংসদ উত্থাপনের আগেই অধ্যাদেশ থেকে এই অংশটি বাদ দিয়ে দেয়। গত ১০ এপ্রিল এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেই গেজেট প্রকাশ করা হয়।

ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪১টি দেশ জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ গত ৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক যৌথ চিঠিতে ই-সিগারেটের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। 

সংস্থাগুলোর মতে, ই-সিগারেট তরুণ প্রজন্মকে নিকোটিনে আসক্ত করে তুলছে, যা তাদের মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতিকর ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। 

বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে ১ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়। তামাকবিরোধী সংস্থাগুলোর মতে, আইনের এমন শিথিলতা এই অকাল মৃত্যুর মিছিলকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। 

চিঠিতে বলা হয়েছে, নতুন নিকোটিন পণ্যের প্রচলন বা এর সহজলভ্যতা এই (মৃত্যু ও অর্থনৈতিক) বোঝাকে আরও বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি তৈরি করবে।

তবে সব বাধা উপেক্ষা করেই সংসদ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আইনটি পাস করে এবং ১০ এপ্রিল এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়।

অন্যদিকে, জমির সুষ্ঠু ব্যবহার ও কৃষিজমি রক্ষায় গত জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশের ৭(৫) ধারায় বলা হয়েছিল—খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন তামাক চাষ তিন-ফসলি বা উচ্চ ফলনশীল জমিতে করা যাবে না। এছাড়া এক-ফসলি ও দুই-ফসলি জমিতেও তামাক চাষ পর্যায়ক্রমে সীমিত করতে হবে।

তবে চলতি মাসের শুরুতে সংশোধিত আইনটি অনুমোদনের সময় এই ধারাটি বাদ দেওয়া হয়।

অথচ নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতের ২২টি অঙ্গীকারের মধ্যে তামাকজনিত অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল বিএনপি। 

সেখানে বলা হয়েছিল—জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট অসংক্রামক ব্যাধি (যেমন ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদরোগ, ফুসফুসের সমস্যা ইত্যাদি) নিয়ন্ত্রণে বিশেষ জোর দেওয়া হবে। তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা ও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও ইশতেহারে জানানো হয়।

তামাকবিরোধী অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এটি একটি পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে? এতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনৈতিক ও নেপথ্য প্রভাবের বিষয়টিই ফুটে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, রাতারাতি তামাক শিল্প বা চাষ বন্ধের কথা কেউ বলছে না। কিন্তু জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ওপর তামাকের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এই বাস্তবতায় আইনি কড়াকড়ি ও কর আরোপের মাধ্যমে তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এই পরিবর্তনগুলো এখনো সংশোধনের সুযোগ আছে এবং সরকারের উচিত তা করা।

জিয়াউদ্দিন হায়দার অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, আমি মনে করি গবেষণার স্বার্থেই ই-সিগারেটের ওপর থেকে বিধিনিষেধ সরানো হয়েছে, এটি গণহারে বিক্রির জন্য নয়।

প্রতিবেদক তাকে মনে করিয়ে দেন যে আইন থেকে পুরো ধারাটিই বাদ দেওয়া হয়েছে। তখন তিনি বলেন, কেউ যদি এটি কতটা ক্ষতিকর তা নিয়ে গবেষণা করতে চায়, তবে সেই সুযোগ থাকা উচিত। পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকলে কোনো গবেষণা বা জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। তাই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এর মানে এই নয় যে ই-সিগারেট বিপণনের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়েছে।

তিন-ফসলি জমিতে তামাক চাষের সুযোগ দেওয়ায় চাষাবাদ বেড়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, এটি তামাক চাষে উৎসাহ দেওয়ার জন্য করা হয়নি। আমাদের দেশে আইনের শাসন নয়, আইনের জঙ্গল তৈরি হয়েছে। এত নিয়ন্ত্রণের কী দরকার? কৃষকদের ওপর ছেড়ে দিন। তারা যদি লাভ করতে পারে, তাতে সমস্যা কোথায়? তামাক চাষে যদি জমির উর্বরতা বা আয় কমে যায়, তবে কৃষকরা নিজেরাই তা বন্ধ করে দেবে। এর জন্য আইনের কী প্রয়োজন?

জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও যোগ করেন যে, তামাক বাজারে আসবেই। মানুষের আচরণ পরিবর্তন না হলে শুধু আইন দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং তামাকের কুফল নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো। বিএনপি সরকার সেই কাজটিই করবে বলে তিনি জানান।