ই-সিগারেটের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যাচ্ছে সরকার

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ সংশোধন করতে যাচ্ছে, যেখানে ই-সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্য নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

এর পাশাপাশি, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করার যে বিধানটি অধ্যাদেশে ছিল, সেটিও বাদ দেওয়া হবে।

গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার এই অধ্যাদেশটি অনুমোদন করেছিল, যার মাধ্যমে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’-এ আরও কঠোর কিছু নিয়ম যুক্ত করা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই পরিবর্তনগুলো আনা হচ্ছে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি খসড়া তৈরি করছে যেখানে ওই বিধানগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই এটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে পাঠানো হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ই-সিগারেট হলো ‘ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম’-এর সবচেয়ে সাধারণ ধরন। এর নিঃসরণে নিকোটিনসহ বিভিন্ন বিষাক্ত উপাদান থাকে, যা ব্যবহারকারী এবং আশেপাশে থাকা অধূমপায়ী—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের সুরক্ষার স্বার্থে তামাকবিরোধী আন্দোলনকারীরা এই সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং সরকারকে এটি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

‘ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো-ফ্রি কিডস’-এর বাংলাদেশ অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার আতাউর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক কিছু জরিপে দেখা গেছে যে ই-সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দ্রুত হারে বাড়ছে।

তিনি জানান, তরুণদের রক্ষায় বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশ ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে। তাই ই-সিগারেটের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা উচিত।

একটি সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৮৮ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে শিশুদের চোখের উচ্চতায় সিগারেট সাজিয়ে রাখা হয়। এ ছাড়া ৬৬ শতাংশ দোকানে শিশুদের আকৃষ্ট করতে ক্যান্ডি বা মুখরোচক খাবারের ঠিক পাশেই তামাকজাত পণ্য রাখা হয়।

‘তাই তামাকজাত পণ্য প্রদর্শনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা উচিত নয়’— উল্লেখ করে তিনি সরকারকে এই সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনা করার অনুরোধ জানান।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি অধ্যাদেশ সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে জমা দেওয়া হয়েছিল। কমিটি যে ধরনের সুপারিশ দেবে, তারা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

সংশোধনীতে আনা পরিবর্তনসমূহ

তামাকবিরোধী আন্দোলনকারীদের ক্রমবর্ধমান দাবির মুখে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গত বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার ই-সিগারেট বা ইএনডিএস আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল।

পরে ২৩ ডিসেম্বর অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হয়, যেখানে তামাকজাত পণ্যের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়। একইসঙ্গে তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু নতুন বিধান যুক্ত করার পাশাপাশি ইএনডিএস এবং অন্যান্য নতুন ধরনের তামাকজাত পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়।

অধ্যাদেশের ৬ (গ) ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম, এর যন্ত্রাংশ বা অংশ বিশেষ (ই-সিগারেট, ভ্যাপ, ভ্যাপিং, ব্যাপার ও ই-লিকুইড ইত্যাদি), হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস বা ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টস যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, প্রচার-প্রচারণা, প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষকতা, বিপণন, বিতরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন করবেন না বা করাবেন না।

এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে কোনো ব্যক্তি অনধিক তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। যদি কেউ একই ধরনের অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তবে দণ্ডের হার পর্যায়ক্রমে দ্বিগুণ হবে।

এই ধারার অধীনে অপরাধী যদি কোনো কোম্পানি হয়, তবে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে। এ ছাড়া কোম্পানির মালিক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ওই কোম্পানির তামাক ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

এসব নিষিদ্ধ পণ্য ব্যবহারের জন্য যেকোনো ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।

অধ্যাদেশের ৫ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রির সময় ছাড়া বিক্রয়কেন্দ্রে সমস্ত তামাকজাত পণ্য এবং তাদের মোড়ক দৃষ্টির আড়ালে রাখতে হবে।