রাঙ্গুনিয়ায় পাশাপাশি শায়িত ওমানে মারা যাওয়া ৪ ভাই
পাশাপাশি রাখা চারটি লাশবাহী খাটিয়া ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন অসংখ্য মানুষ। কারও চোখে পানি, কেউ আবার নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। আজ বুধবার সকালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার বন্দারাজা পাড়ায় এমন দৃশ্য দেখা যায়।
গত ১২ মে রাতে ওমানে একটি গাড়ির ভেতর থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় চার ভাইকে। বড় ভাই রাশেদুল ইসলাম, মেজ ভাই শাহেদুল ইসলাম ও ছোট দুই ভাই সহিদুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলাম।
আজ বেলা ১১টায় হোসনাবাদ লালানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কেও মানুষের ভিড় দেখা যায়।
নিহতদের একমাত্র জীবিত ভাই এনামুল হক স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনিই জানাজার নামাজ পড়ান। তবে জানাজার আগে উপস্থিত সবার সামনে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শুধু বলেন, ‘আমার ভাইদের আপনারা ক্ষমা করে দিয়েন।’
এর আগে আজ ভোর ৫টার দিকে তাদের মরদেহ গ্রামের বাড়ি লালানগর ইউনিয়নের বন্দারাজার পাড়ায় পৌঁছায়। খবর পেয়ে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ছাড়াও আশপাশের গ্রাম থেকে বহু মানুষ সেখানে ভিড় করেন।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে স্বজনরা জানান, গাড়ির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসের কারণে দমবন্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
স্বজনরা জানান, প্রবাসে কষ্টার্জিত অর্থে চার বছর আগে প্রায় ৩০ শতক জমি কিনেছিলেন চার ভাই। পরে সেখানে নতুন বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু হয়। নিচতলার কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। আগামী ১৫ মে দুই ভাইয়ের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চারজনই ফিরলেন মরদেহ হয়ে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সবচেয়ে ছোট ভাইটির বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তাদের বাবা মারা যান। চরম অভাব-অনটনের মধ্যেই সন্তানদের বড় করেন মা।
নিহতদের আত্মীয় রুমা আক্তার বলেন, প্রায় ১২ বছর আগে মেজো ভাই প্রথম ওমানে যান। পরে একে একে অন্য ভাইদেরও সেখানে নিয়ে যান। তারা ওমানে দুটি গাড়ি ওয়াশিংয়ের ব্যবসা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন।
তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে তারা জমি কিনে নতুন বাড়ি তৈরি শুরু করেন। তাদের মধ্যে দুজন কিছুদিন আগে বিয়ে করেছিলেন। মেজো ভাই বিদেশে যাওয়ার মাত্র আট মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। তাদের সুখের সংসারটা শেষ হয়ে গেল।
আজ সকালে নতুন বাড়ির একটি কক্ষে স্তব্ধ হয়ে শুয়ে ছিলেন চার সন্তান হারানো মা। স্বজনরা জানান, সন্তানদের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থ। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে।
বন্দারাজা পাড়া জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি মাওলানা ইদ্রিস বলেন, ‘চারজনকে একসঙ্গে বহনের মতো খাটিয়া আমাদের ছিল না। পরে আশপাশের মসজিদ থেকে আরও তিনটি খাটিয়া এনে জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।’
জানাজায় অংশ নিতে পাশের মরিয়মনগর ইউনিয়ন থেকে এসেছিলেন স্কুলশিক্ষক জাকের হোসেন। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো শুনিনি। খবরটা শোনার পর মন মানছিল না, তাই এসেছি। এখন ভাবছি, পরিবারের যারা বেঁচে আছেন তারা কীভাবে এই শোক সামলাবেন।’