‘ছয় বছর কেটে গেল, কেউ আর ডাকেনি’
একসময় পাট ছিল বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’। এই পাটকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি। খুলনার খালিশপুর, দৌলতপুর, আটরা কিংবা শিরোমণি—এসব এলাকার মূল পরিচয়ই ছিল পাটকলের সাইরেন, হাজার হাজার শ্রমিকের পদচারণা আর ব্যস্ত শিল্পাঞ্চল। তবে সেই চেনা শিল্পনগরী আজ নীরব।
২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর শুধু কারখানার চিমনিই নিভে যায়নি; থমকে গেছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের জীবন, সংকুচিত হয়েছে স্থানীয় অর্থনীতি। একই সঙ্গে পাটের ন্যায্যবাজার হারিয়ে কৃষকদের বড় একটি অংশও এখন পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
বরিশালের আগৈলঝাড়া থেকে ১৯৯৩ সালে কাজের খোঁজে খুলনায় এসেছিলেন নুরুল হক (৪৮)। প্লাটিনাম জুট মিলে বদলি শ্রমিক হিসেবে শুরু হয়েছিল তার কর্মজীবন। ১৩ বছর পর স্থায়ী চাকরি পান।
এরপর খুলনার খালিশপুরের আলমনগরে বিয়ে করেন, গ্রামের সাড়ে তিন বিঘা জমি বিক্রি করে বাবা-মাকে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন খুলনায়। স্বপ্ন ছিল তিন সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করবেন। কিন্তু ২০২০ সালে মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
নুরুল হক জানান, টাকার অভাবে বড় মেয়ে শ্রাবন্তীর ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর আর পড়ানো সম্ভব হয়নি, বিয়ে দিতে হয়েছে। ছোট মেয়ের লেখাপড়াও বন্ধ। মাধ্যমিক পাস করা ছেলে রবিউল বাবার মতো পাটকলে চাকরির স্বপ্ন দেখলেও এখন সে ইজিবাইক চালিয়ে সংসার টানছে।
নুরুল হক বলেন, মিল বন্ধ করার সময় সরকার বলেছিল তিন মাস পর সরকারি উদ্যোগে আধুনিকায়ন করে আবার চালু করা হবে। আমাদের মতো দক্ষ শ্রমিকদের কাজে নেওয়া হবে। ছয় বছর হয়ে গেল, আমরা আজও সেই অপেক্ষায় আছি।
তিনি আরও জানান, মিল বন্ধের সময় পাওয়া টাকার বড় অংশ বাবা-মায়ের চিকিৎসায় শেষ হয়েছে। এখন খুলনা ছেড়ে গ্রামে ফেরার পথও বন্ধ, কারণ সব জমি তো আগেই বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
তার ভাষ্য, গ্রামে ফিরেই বা কি করব! থাকার জমিটুকু বাড়িঘর সবই তো বিক্রি করে দিয়ে এসেছি। ওই গ্রামে কে আমাকে আশ্রয় দেবে, আমার পরিবারকে থাকার জায়গা দেবে?
নুরুল হকের মতো খুলনা অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হওয়ার পর সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শুধু চাকরিই হারাননি তারা; ভেঙে গেছে বহু পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার নূন্যতম সুযোগ।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে খুলনার শিল্পাঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক চিত্রও। একসময় খালিশপুর ও দৌলতপুরে হাজার হাজার শ্রমিককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য বাড়ি, দোকান, হোটেল ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। এখন সেই এলাকার বহু বাড়িতে ‘টু-লেট’ সাইনবোর্ড বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
পিপলস গোলচত্বরের পূর্ব পাশের বাড়ির মালিক রাজু হাওলাদার বলেন, আগে সাড়ে চার হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় সব ফ্ল্যাট ভরা থাকত। এখন ১৩টি ফ্ল্যাটের অর্ধেকই খালি থাকে। অনেক শ্রমিক পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে গেছেন, আবার কেউ কেউ একা মেস করে থাকছেন।
শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলই নয়; ক্রিসেন্ট-প্লাটিনামের পাশাপাশি সোনালী জুট মিল, অ্যাজাক্স, আফিল, মহসিন জুট মিলসহ একের পর এক বেসরকারি পাটকলও বন্ধ হয়ে গেছে।
পাটকলের বাইরেও একই চিত্র। ১৯৫৯ সালে ভৈরব নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল একসময় আড়াই হাজার শ্রমিকের কর্মস্থল ছিল। পরে ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের একমাত্র সরকারি হার্ডবোর্ড মিল। কয়েক দফা বন্ধ-চালুর পর সেটিও ২০১৩ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
বিজেএমসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ জুলাই সরকারের সিদ্ধান্তে খুলনার সাতটিসহ দেশের ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। সে সময় সরকার জানিয়েছিল, মিলগুলো আধুনিকায়ন ও নতুন ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালু করা হবে এবং দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু ছয় বছর পরও অধিকাংশ শ্রমিক সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখেননি।
প্লাটিনাম জুট মিলের প্রাক্তন অস্থায়ী শ্রমিক বিলকিস আরা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ১৮ বছর মিলে কাজ করেছি। বন্ধ হওয়ার সময় বলা হয়েছিল তিন মাসের মধ্যে আবার চালু হবে। আমরা সেই কথাই বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু ছয় বছর কেটে গেল, কেউ আর ডাকেনি।
তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেই পাটকলগুলো আবার চালু করা হোক। তাহলে হাজার হাজার পরিবার আবার নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পুনরায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর পরিবর্তে ধাপে ধাপে দীর্ঘমেয়াদি লিজের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পথেই এগোচ্ছে সরকার।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ক্রিসেন্ট জুট মিল গত ১৫ জুন ৩০ বছরের জন্য মাহাবুব গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, মিলের মোট ১১৩ একর জমির মধ্যে ৭৫ একর লিজ দেওয়া হয়েছে। লিজ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
তবে শর্ত অনুযায়ী, হস্তান্তরের পর প্রথম ৩৬ মাস বিজেএমসিকে কোনো ভাড়া দিতে হবে না। সরকারি কোষাগারে জামানত হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ১৮ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। তবে এই লিজ চুক্তিতে কোথাও বাধ্যতামূলকভাবে পাটজাত পণ্য উৎপাদনের শর্ত রাখা হয়নি।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক খান মো. কামরুল ইসলাম বলেন, লিজ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান কী ধরনের পণ্য উৎপাদন করবে, সে বিষয়ে চুক্তিতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি চাইলে পাটের পরিবর্তে অন্য কোনো পণ্যও উৎপাদন করতে পারবে।
শ্রমিক ও পাটশিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যদি পাটজাত পণ্য উৎপাদনের বাধ্যবাধকতাই না থাকে, তাহলে দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য কীভাবে বাস্তবায়িত হবে?
আরও একটি বিষয়ও শ্রমিকদের ব্যথিত করছে।
লিজ দেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত এই মিলের বহু অব্যবহৃত তাঁত ও ব্যবহার অযোগ্য লোহার যন্ত্রাংশ টেন্ডারের মাধ্যমে ১০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
দৌলতপুর জুট মিলের প্রাক্তন শ্রমিক দেওয়ান গাজী বলেন, আমাদের সামনে দিয়ে যখন দেখি এই মেশিন খুলে নিয়ে যাচ্ছে, তখন বুক ভেঙে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই মেশিনে কাজ করে আমরা পরিবার চালিয়েছি।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, সরকার তো বড় বড় প্রকল্প করছে, ঢাকায় ফ্লাইওভার করছে, আর আমাদের মিলগুলো চালু করতে পারবে না?
শ্রমিকদের ক্ষোভের আরেকটি বড় কারণ হলো—মিল বন্ধ থাকলেও বিজেএমসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এখনও বহাল তবিয়তে আছেন এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। অথচ শ্রমিকেরা আজ চরম অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন।
বিজেএমসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ক্রিসেন্ট জুট মিল বন্ধ হওয়ার সময় সেখানে ২ হাজার ৭৬৮ জন স্থায়ী এবং ৫ হাজার ৫৫০ জন বদলি শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে মিলে ৪২ জন নিরাপত্তাকর্মীসহ ১০৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া আলীম, কার্পেটিং, ক্রিসেন্ট, ইস্টার্ন, জেজেআই, প্লাটিনাম ও স্টার জুট মিলে স্থায়ী শ্রমিক ছিলেন ১৪ হাজার ৯৭৬ জন, বদলি শ্রমিক ১৪ হাজার ২৭৬ জন এবং দৌলতপুর ও খালিশপুর অঞ্চলের আরও প্রায় ৩ হাজার ২০০ অস্থায়ী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
প্রাক্তন সিবিএ নেতা মো. খলিলুর রহমান বলেন, যাদের অদক্ষতা-দুর্নীতি কারণে মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেল, সেই বিজিএমসির কর্মকর্তারা অফিসাররা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক।
পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, এ পর্যন্ত সোনালী, অ্যাজাক্স, কুষ্টিয়ার মোহিনীসহ প্রায় ২৬০টি পাটকল বেসরকারি খাতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সফলভাবে টিকে থাকার নজির একটিও নাই। বরং যাদেরকে দেওয়া হয়েছে, তারা ব্যাংক লোন নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ধ্বংস করে দিয়েছে।
তিনি প্রস্তাব করেন, সরকার নিজে পরিচালনা করতে অপারগ হলে জিটুজি ভিত্তিতে অন্য দেশের সহযোগিতা নিয়ে কিংবা লিমিটেড কোম্পানি গঠন করে শ্রমিকদের শেয়ার মালিকানায় যুক্ত করে এগুলো চালু করতে পারত।
বিজেএমসির তথ্য বলছে, খুলনার সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মধ্যে মামলার কারণে আলীম জুট মিল বাদে ছয়টি মিল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে চারটির ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। ইস্টার্ন ও খালিশপুর জুট মিলে উৎপাদন চলছে, দৌলতপুর জুট মিলে উৎপাদন শুরু হলেও বর্তমানে সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ক্রিসেন্ট জুট মিলে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি চলছে। স্টার ও প্লাটিনাম জুট মিলের লিজ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে ছয় বছর পরও শ্রমিকদের একটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি—রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সময় সরকারি উদ্যোগে মিল পুনরায় চালু করে দক্ষ শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন কোথায়?