নারীদের মাঝেও বাড়ছে ‘ড্যান্ডি’র আসক্তি

শাহীন মোল্লা
শাহীন মোল্লা
মোহাম্মদ জামিল খান
মোহাম্মদ জামিল খান

বাংলাদেশে মাদক সমস্যা দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকসেবী। যেহেতু বাংলাদেশে সরাসরি কোনো মাদক তৈরি হয় না, তাই এর প্রায় পুরোটাই সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে দেশে আসে। চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার মাদক পাচারের রুট, হুমকি ও এর প্রভাব অনুসন্ধান করেছে। এই তৃতীয় পর্বে উঠে এসেছে, কীভাবে নারীদের মধ্যে ‘ড্যান্ডি’ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, যাদের প্রায় সবাই ছিন্নমূল ও রাস্তায় রাত কাটান।

২২ জুলাই বিকেল প্রায় ৫টা। ২০ বছর বয়সী ৭-৮ মাসের সন্তানসম্ভবা পারভীন আক্তার ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে আরও তিনজন নারীর সঙ্গে বসে ছিলেন। কয়েক সেকেন্ড পরপর তিনি একটি পলিথিনের ব্যাগ মুখের কাছে নিচ্ছিলেন। ব্যাগটির ভেতরে ছিল আঠা।

পারভীন জানতেন, এই আঠার বাষ্প তার অনাগত সন্তানের ক্ষতি করতে পারে। জানান, ছাড়তে চাইলেও অন্যদের এই আঠার নেশা করতে দেখলেই আবার তার নেশার তাগিদ ফিরে আসে।

‘এর কারণে আমার সন্তানের ক্ষতি হোক, সেটা চাই না’, বলেন পারভীন।

টলুইনযুক্ত সস্তা এই আঠা মূলত শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ‘ড্যান্ডি’ নামে পরিচিত এই আঠা পলিথিন বা অন্য কিছুতে ভরে টানতে দেখা যাচ্ছে নানা বয়সী মানুষকে এবং এর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। উদ্বেগজনকভাবে নারী ও শিশুদের মাঝেও এর ব্যবহার বাড়ছে। পারভীনও তাদেরই একজন।

গত এক মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দ্য ডেইলি স্টার দেখেছে, শিশু, তরুণ এবং বিশেষ করে নারীরা পলিথিনের ব্যাগ, বোতল ও টিনের পাত্রে এই আঠা নিয়ে তা দিয়ে নেশা করছে। তাদের প্রায় সবাই ছিন্নমূল এবং বর্জ্য-ভাঙারি সংগ্রহ ও বিক্রি করে যৎসামান্য আয় করেন।

বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, নারীদের মধ্যে ড্যান্ডি ব্যবহার বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। শিশুদের মধ্যেও এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে।

পারভীন জানান, প্রায় আট বছর ধরে তিনি ড্যান্ডি ব্যবহার করছেন। প্রায় ১২ বছর বয়সে তিনি এই নেশা শুরু করেন এবং ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। আট বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। এর কিছুদিন পর তার বাবা আবার বিয়ে করেন। সৎমায়ের নির্যাতনের কারণে তিনি রংপুরের বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন।

তিনি জানান, গ্রামের এক নারীর সঙ্গে তিনি ঢাকায় আসেন। প্রথমে ফুল বিক্রি করতেন, পরে বর্জ্য ও ভাঙারি সংগ্রহ শুরু করেন। একই ধরনের কাজ করা অন্য শিশু ও নারীদের সঙ্গে চলাফেরা করতে করতে তাদের মাধ্যমেই তিনি ড্যান্ডির নেশায় জড়িয়ে পড়েন।

পারভীন এখন স্বামীর সঙ্গে ফার্মগেট এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহ করেন। তার স্বামীও এই নেশা করেন। তিনি জানান, ড্যান্ডির নেশা করার কারণে তার ঘুমের সমস্যা, মাথা ঘোরা ও মাঝে মাঝে পেটে ব্যথা হয়।

সদরঘাট-শ্যামবাজার লঞ্চ টার্মিনালে ২৬ বছর বয়সী ভিক্ষুক শিল্পী বেগমকে তার সাড়ে তিন বছর ও দুই বছর বয়সী দুই মেয়ের পাশে বসে ড্যান্ডির নেশা করতে দেখা যায়।

শিল্পী জানান, প্রায় এক বছর আগে সদরঘাট ও আহসান মঞ্জিল এলাকায় অন্য নারীদের ড্যান্ডির নেশা করতে দেখে তিনিও শুরু করেন।

তিনি বলেন, ‘আমার মা ও প্রতিবেশীরা আমাকে বলে এটা ছেড়ে দিতে। আমিও চাই, কিন্তু পারি না।’

তার কথায় স্পষ্ট হয়, এই আসক্তিই তাকে স্বাভাবিক কাজ পাওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আহসান মঞ্জিলের কাছে ফুল বিক্রি করা ২০ বছর বয়সী সাথী জানান, দুই মাস আগে তার মেয়ে মারা গেছে। মেয়েটির বয়স ছিল ছয় মাস। এরপর থেকে ধীরে ধীরে তিনি ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়ে পড়েন। এক বন্ধু তাকে প্রথম এই নেশা করান দাবি করে সাথী বলেন, তার এখন মাথা ঘোরা, ক্ষুধামন্দা, ঘুমের সমস্যা ও চোখের নিচে ফোলা থাকে।

পারভীন ছোটবেলা থেকেই ড্যান্ডির নেশা শুরু করলেও শিল্পী ও সাথী প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর শুরু করেন।

কতজন নারী ড্যান্ডিতে আসক্ত, সে বিষয়ে কোনো সরকারি তথ্য না থাকলেও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যে দেখা যায়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে এই নেশার ব্যবহার ক্রমেই বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।

৯ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হলের কাছে ফুটওভারব্রিজের নিচে ১৯ থেকে ২৬ বছর বয়সী ৫ নারীকে ড্যান্ডির নেশা করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে স্নিয়া নামে পরিচয় দেওয়া এক নারী দাবি করেন, ওই এলাকায় থাকা প্রায় ৫০ জন ছিন্নমূল নারী ও যৌনকর্মীর মধ্যে ৪০ জনের বেশি এই নেশা করেন।

কমলাপুরের স্থানীয় সূত্রগুলোও জানায়, নারীদের মাঝে ড্যান্ডির নেশাকারীর সংখ্যা বাড়ছে। সদরঘাট, আহসান মঞ্জিল ও কারওয়ান বাজারেও নারীদের ড্যান্ডি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তাদের অনেকে ফুটপাতে, আবার কেউ কম্বলের নিচে শুয়ে বা বসে এই নেশা করেন।

সহজলভ্যতা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ২০২২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, সারা দেশে জরিপ করা ১ হাজার ৬০০ পথশিশুর ৫৮ শতাংশ মাদক ব্যবহার করত। উত্তরদাতাদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ গাঁজা এবং ১৫ দশমিক ২ শতাংশ ড্যান্ডি ব্যবহার করত। আর তাদের ১৪ শতাংশই ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই মাদক গ্রহণ শুরু করেছিল।

ডিএনসির উপপরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ড্যান্ডি হলো টলুইনভিত্তিক এক ধরনের আঠা, যা জুতা, রাবার ও চামড়াজাত পণ্য মেরামতে ব্যবহৃত হয়। এর কম দাম এবং হার্ডওয়্যার ও জুতা মেরামতের দোকানে সহজেই এগুলো পাওয়া যায়। এ জন্যই পথশিশুদের কাছেও এটি সহজেই পৌঁছে যায়।

তাদের অনেকে ক্ষুধা ও মানসিক কষ্ট দমাতে এটি ব্যবহার করে বলে জানান তিনি।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে ড্যান্ডি ব্যবহারকারীরা জানান, তারা প্রতিদিন এই নেশা করতে ২৫ থেকে ৬০ টাকা খরচ করেন।

মঞ্জুরুল ইসলাম মনে করেন, এই আঠা খুচরা বিক্রির জন্য লাইসেন্স চালু, বৈধ ব্যবহারের জন্য অনুমতিপত্র, হার্ডওয়্যার দোকানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি, শিশুদের কাছে বিক্রি বন্ধে আইন প্রয়োগ এবং এই নেশা যারা করে তাদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন করতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসির আরেক কর্মকর্তা বলেন, এই আঠা বিক্রি একেবারে বন্ধ করা সম্ভব না। কারণ, এটি আসবাবপত্র প্রস্তুতকারক, জুতার কারখানা ও হাজারো মুচি তাদের কাজে ব্যবহার করেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ডিএনসি এমন একটি ব্যবস্থা চালুর কথা বিবেচনা করছে, যার আওতায় এই আঠা কেনার সময় ক্রেতাদের লাইসেন্স দেখাতে হবে এবং কী কাজে এটি ব্যবহার করবেন তা জানাতে হবে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি হয়নি।

কারওয়ান বাজার, গ্রিন রোড ও কচুক্ষেতের অন্তত এক ডজন হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, সন্দেহভাজন ব্যবহারকারীদের কাছে তারা সাধারণত এই আঠা বিক্রি করেন না।

কচুক্ষেতের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, এই আঠা দিয়ে নেশা করতে পারে এমন সন্দে হলে তিনি তার কাছে আর বিক্রি করেন না। কিন্তু, তারা অন্য কারো মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহ করেন।

আরেক ব্যবসায়ী বলেন, এই আঠা যারা নিতে আসেন, তারা জুতা তৈরি, আসবাবপত্র তৈরি বা রিকশার গ্যারেজের জন্য নিচ্ছেন বলে দাবি করেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, খুচরা বিক্রি সীমিত করার বিষয়ে তারা পুলিশের কোনো নির্দেশনা বা সরকারি প্রজ্ঞাপন পাননি।

ডিএনসি সূত্র জানায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝেমধ্যে ব্যবহারকারীদের আটক করে সংশোধনাগার, আশ্রয়কেন্দ্র বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠায়। তবে এসব উদ্যোগের পরও এই নেশার প্রবণতা কমার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

সরকারি কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের প্রধান পরামর্শক ডা. কাজী লুৎফুল কবীর বলেন, ১২৪ শয্যার প্রতিষ্ঠানটিকে ২৫০ শয্যার কেন্দ্রে উন্নীত করা হচ্ছে। নির্মাণকাজের কারণে বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের জন্য মাত্র ২৮টি শয্যা রয়েছে। নির্মাণকাজ শুরুর আগে সেখানে নারীদের জন্য ২৪টি এবং শিশুদের জন্য ১০টি শয্যা ছিল।

তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও আমরা ড্যান্ডিতে আসক্ত শিশুদের চিকিৎসা দিয়েছি। ওই শিশুদের একটি এনজিওর ব্যবস্থাপনায় ভর্তি করা হয়েছিল।’

তিনি আরও জানান, তাদের মধ্যে কয়েকজন গাঁজাতেও আসক্ত ছিল।

গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসির মারুফ জানান, টলুইনভিত্তিক আঠা অত্যন্ত নিউরোটক্সিক এবং এতে আসক্তির গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অল্প সময়ে বেশি মাত্রায় এর সংস্পর্শে এলে উচ্ছ্বাস, হ্যালুসিনেশন, শরীরের সমন্বয়হীনতা, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা ও বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। এমনকি খিঁচুনি, চেতনা হারানো, কোমা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন ও “সাডেন স্নিফিং ডেথ সিনড্রোম”ও হতে পারে।’

তিনি জানান, দীর্ঘদিন এটি ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পেশির দুর্বলতা, অসাড়তা, কাঁপুনি ও স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে। সেইসঙ্গে লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সন্তানসম্ভবা নারীদের জন্য এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুতর।

ডা. মারুফ বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় এ ধরনের দ্রব্যের বাষ্প নিঃশ্বাসের সঙ্গে নিলে মা ও অনাগত শিশু উভয়েই বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে এবং গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। ইনহেল্যান্ট রক্তপ্রবাহে অক্সিজেনের স্থান দখল করে। ফলে, মা হাইপোক্সিয়া, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অতিরিক্ত চাপ এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। এমনকি আকস্মিক গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব ও অকাল প্রসবের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।’

তিনি বলেন, বিষাক্ত এই রাসায়নিক পদার্থ প্লাসেন্টা অতিক্রম করে ভ্রূণের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে কম ওজন নিয়ে সন্তান জন্ম, শিশুর বিকাশগত সমস্যা ও আচরণগত জটিলতা দেখা দিতে পারে।