শিশুর ভাষা বিকাশে স্ক্রিনের প্রভাব কতটা? কী বলছে ঢাবির গবেষণা
মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে কার্টুন দেখছে এক শিশু। চরিত্রগুলো কথা বলছে, গান গাইছে, গল্প এগিয়ে চলছে। অন্যদিকে, আরেক শিশু একইভাবে স্ক্রিনের সামনে বসে। তবে সে শুধু দেখছে না। সে নতুন শব্দ শিখছে, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, আবার নিজের মতো করে শব্দগুলো বলার চেষ্টাও করছে।
দুই শিশুর হাতে স্ক্রিন এবং তারা একই সময় ধরে তা দেখছে। কিন্তু তাদের ভাষা শেখার অভিজ্ঞতা কি একই? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা বলছে, উত্তরটা সম্ভবত ‘না’।
গবেষণাটিতে দেখা গেছে, শিশুরা ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রতিদিন কত সময় কাটাচ্ছে, শুধু তা দিয়ে তাদের ভাষা বিকাশের চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। বরং তারা স্ক্রিনে ঠিক কী দেখছে এবং কতটা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে, সেটাই ভাষা শেখার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার শিরোনাম ‘ইফেক্ট অব ইউজিং স্ক্রিন টাইম ইন ডেভেলপিং চিলড্রেন’স স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ: বাংলাদেশ কনটেক্সট’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হোসেন খান এই গবেষণা পরিচালনা করেন। তত্ত্বাবধান করেন একই বিভাগের অধ্যাপক হাকিম আরিফ।
ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলের ৩ থেকে ৮ বছর বয়সী ৫০ শিশু এবং তাদের অভিভাবকদের ওপর এ গবেষণা চালানো হয়। এতে প্রশ্নমালার পাশাপাশি প্রত্যেক শিশুর ৩০ মিনিটের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।
গবেষণায় দেখা যায়, ৪০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করে। আরও ২০ শতাংশের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় চার ঘণ্টার বেশি।
ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোর মধ্যে ৯০ শতাংশ শিশু মোবাইল, ৭০ শতাংশ টেলিভিশন এবং ৫০ শতাংশ ট্যাব ব্যবহার করে। তবে তাদের দেখার বড় অংশ জুড়েই রয়েছে বিনোদন। ৮০ শতাংশ শিশু কার্টুন বা অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখে আর ৬০ শতাংশ শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারকে 'নিষ্ক্রিয়' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে গবেষণাটি বলছে, স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা আর স্ক্রিনের সঙ্গে শেখার মধ্যে পার্থক্য আছে। যেসব শিশু শিক্ষামূলক ও পারস্পরিক অংশগ্রহণমূলক অ্যাপ ব্যবহার করেছে, তারা নতুন শব্দ শেখে, প্রশ্ন করে এবং নতুন বাক্য তৈরির চেষ্টা করে।
অন্যদিকে যারা কেবল কার্টুন বা ইউটিউব ভিডিও দেখছে, তাদের মধ্যে কথা বলার আগ্রহ তুলনামূলক কম। আবার কয়েকজনকে স্ক্রিন বন্ধ করতে বলা হলে জেদ করতে বা কান্না করতে দেখা গেছে।
৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুরা অবশ্য দেখা অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলতে পেরেছে। তবে তাদের বাক্য গঠনে কিছু অসঙ্গতি বা দুর্বলতা ছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২০ শতাংশ অভিভাবক শিশু স্ক্রিন ব্যবহারের সময় তাদের পাশে থাকেন। আর ৩০ শতাংশ অভিভাবক সক্রিয়ভাবে সময় নিয়ন্ত্রণ করেন।
গবেষক জাহিদ হোসেন খান জানান, ভাষা শেখার মূল শর্ত হলো দুই পক্ষের মধ্যে কথোপকথন। কিন্তু পর্দা বা স্ক্রিন সাধারণত একমুখী যোগাযোগ তৈরি করে। তবে বাবা-মা যদি শিশুর পাশে বসে একই অনুষ্ঠান দেখেন, পর্দায় কী ঘটছে তা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন, প্রশ্ন করেন বা শিশুর প্রশ্নের উত্তর দেন, তাহলে সেই সময়টাই শেখার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণাটি অবশ্য এমন সিদ্ধান্ত দেয়নি যে শিশুদের স্ক্রিন থেকে পুরোপুরি দূরে রাখতে হবে। বরং গবেষণার ফল বলছে, কী দেখছে এবং কীভাবে দেখছে, সেটা কতক্ষণ দেখছে তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ অভিভাবক ও পরিচর্যাকারী মনে করেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর ভাষা বিকাশে ক্ষতি করছে। ৬০ শতাংশ জানিয়েছেন, শিশুদের শব্দভাণ্ডার কমে গেছে।
তবে একই সময়ে ৬০ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন, সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে স্ক্রিন শিশুদের ভাষা শেখায় সহায়তা করতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, শিশুদের বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি বাংলায় মানসম্মত শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি করা জরুরি। এ বিষয়ে বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গবেষণায় শিশুদের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক হাকিম আরিফ বলেন, শিশুদের জীবনে স্ক্রিনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এটা এখন তাদের সুস্থ বিকাশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণাও খুব সীমিত।
তাই শিশুর হাতে থাকা স্ক্রিনটিকে শুধু ‘সময় নষ্টের যন্ত্র’ হিসেবে দেখা, কিংবা উল্টোভাবে ‘শেখার উপকরণ’ হিসেবে ছেড়ে দেওয়া, দুটোই হয়তো পুরো চিত্র তুলে ধরে না। আসল বিষয় হলো, স্ক্রিনে শিশুটি কী দেখছে আর এপাশে বসে থাকা বড়রা তার সঙ্গে কতটা কথা বলছেন।