এক লাখ ইয়াবা ‘আত্মসাৎ’: পুলিশের তদন্তে প্রমাণ মিললেও আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে নেই
চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এলাকায় চেকপোস্টে এক কনস্টেবলের কাছ থেকে জব্দ করা এক লাখ ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়াবা আত্মসাতের কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও অদক্ষতার প্রমাণ মিলেছে।
গত বুধবার আদালতে এ প্রতিবেদন জমা দেন সিএমপির দক্ষিণ জোনের উপকমিশনার (ডিসি) হোসাইন কবির ভূঁইয়া।
আজ রোববার চট্টগ্রাম আদালতের জিআরও উজ্জ্বল বিশ্বাস দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গত ৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে নগরীর নতুন ব্রিজ এলাকায় একটি চেকপোস্টে কক্সবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন সৌরভকে ঢাকাগামী একটি বাস থেকে আটক করে বাকলিয়া থানা পুলিশের একটি দল। অভিযোগ উঠেছে, আটকের সময় তার কাছে থেকে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। পরে ওই কনস্টেবলকে ছেড়ে দেওয়া হয় ও উদ্ধার করা মাদক ‘গায়েব’ হয়ে যায়।
কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন সৌরভ কক্সবাজার জেলার নারী এবং শিশু আদালতের এক বিচারকের গানম্যান হিসেবে কর্মরত।
এ ঘটনায় বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর গত ২৩ ডিসেম্বর স্বপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদ।
আদেশে সিএমপির দক্ষিণ জোনের উপকমিশনারকে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুই দফায় সময় বাড়িয়ে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাস থেকে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে আটক করে পুলিশ বক্সে ব্যাগ তল্লাশি করা হলেও তার কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার ও তার স্বপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অভিযুক্ত আটজন পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলা ও অদক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে কনস্টেবল ইমতিয়াজের আগের জবানবন্দি অস্বীকার করে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া ইয়াবা উদ্ধারের পর মোবাইল ফোনে ইয়াবা জব্দের কথোপকথনটি ‘মশকরা’ করে আরেক কনস্টেবল রেকর্ড করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ৫ জানুয়ারি নগর পুলিশের তদন্ত কমিটি ইয়াবা লুটের ঘটনায় প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় বাকলিয়া থানার আট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এই কমিটির প্রধান ছিলেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী।
বরখাস্ত আটজন হলেন—তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আল আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান ও কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না।
ঘটনার সময় বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন আফতাব উদ্দিন। বর্তমানে তিনি নগরীর কোতোয়ালি থানার ওসি হিসাবে কর্মরত।
আদালতে জমা হওয়া প্রতিবেদন কপি ডেইলি স্টারের কাছে এসেছে।
প্রতিবেদনে ডিসি হোসাইন কবির ভূঁইয়া অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য, বাসের সুপারভাইজার, দুইজন চা দোকানদার ও তিনজন সাংবাদিকসহ মোট ২১ জন সাক্ষীর কথা উল্লেখ করেছেন।
এতে বলা হয়, গত ৬ জানুয়ারি জিজ্ঞাসাবাদের সময় কনস্টেবল ইমতিয়াজ বলেন—মোশারফ নামের একজনের একটি ট্রলি ব্যাগে ইয়াবা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ৮ ডিসেম্বর রাতে একটি বাসে কক্সবাজার থেকে ওঠেন। লাগেজটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিলে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়। পরে বাকলিয়া এলাকায় পুলিশের তল্লাশির সময় তাকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নেওয়া হয়। তল্লাশি করে তার ট্রলি ব্যাগে ইয়াবা পাওয়ার পর ইয়াবা রেখে তাকে ব্যাগসহ ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশে তদন্তে কক্সবাজার গেলে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ইমতিয়াজ তার আগের জবানবন্দি অস্বীকার করেন। পরে ২২ ফেব্রুয়ারি ইমতিয়াজ বলেন, ট্রলিব্যাগে কোনো ইয়াবা না পাওয়ায় তল্লাশি করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপরে আরেকটি বাসে করে তিনি কুমিল্লা চলে যান।
ইমতিয়াজ একেক সময় একেক কথা বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে বলেও প্রতিবেদনে ডিসি উল্লেখ করেন।
ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনায় শুরু থেকে তৎকালীন ওসি আফতাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে ডিসি তার প্রতিবেদনে জানান, ঘটনার সময় ওসি তার বাসায় ছিলেন। বাসার সিসিটিভি ফুটেজ তিনি জব্দ করে আদালতে উপস্থাপন করেছেন।
অন্যদিকে পুলিশ বক্সের ফুটেজের বিষয়ে ডিসি আদালতে বলেন, ১২ দিনের বেশি সেখানকার ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয় না। এ জন্য গত ৮ ও ৯ ডিসেম্বরের ফুটেজ পায়নি সিআইডির ফরেনসিক টিম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওসি জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ঘটনার পর ২২ ডিসেম্বর তিনি পত্রিকায় সংবাদ দেখে ওই দিন রাতে দায়িত্বর পুলিশদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন তারা জানান, এ বিষয়ে কিছু জানেন না। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান। তবে পুলিশ বক্সের ফুটেজ ওসি নিজে খতিয়ে দেখেছেন কি না তার বিষয়ে তদন্তে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর পুলিশের সিনিয়র এক কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে বলেন, ওসি নিজের বাসার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে রেখেছেন। কিন্তু পুলিশ বক্সের ফুটেজ তিনি কেন দেখেননি বা সংগ্রহ করেননি এটাই বড় প্রশ্ন।
প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে ডিসি হোসাইন কবির ভুইয়াকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি।
সিএমপির কমিশনার হাসিব আজিজকেও একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।