‘হারিয়ে গেছে বোল-বলা সেই বাঁশি’
চট্টগ্রামের রাউজানে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ছোট ঘরের দরজার পাশে বসে আছে নয় বছর বয়সী মীম আক্তার। তার কোলে একটি বালতি, ভেতরে ছোট ভাই মিসবাহর জামা-কাপড়। দরজার পাশে ছড়িয়ে থাকা জুতার ভিড় থেকে সে আলাদা করে রাখছে ভাইয়ের দু'জোড়া ছোট জুতা। তিন বছর বয়সী মিসবাহ আর কোনোদিন সেগুলো পরবে না। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'ছিন্নমুকুল' কবিতার মতো—'হারিয়ে গেছে বোল-বলা সেই বাঁশি', যেন সেই খেলা, সেই হাসি, সেই অমলিন আনন্দ সবই অচিরেই চলে গেছে, শুধু স্মৃতির নরম আলোয় বেঁচে আছে।
গতকাল বুধবার বিকেলে নিজ বাড়ির পাশে খেলতে খেলতে গভীর একটি নলকূপের গর্তে পড়ে মারা যায় মিসবাহ। পাশেই ছিল বড় বোন মীম। প্রায় ৩০ ফুট গভীর সরু গর্তে পড়ে যাওয়ার সময় সে কিছুক্ষণ ভাইয়ের হাত ধরে রাখলেও ছোট হাতের শক্তি বড় বিপর্যয় ঠেকাতে পারেনি।
'আমি গর্তের ভেতর হাত বাড়ালাম, সে কিছুক্ষণ আমার হাত ধরে রাখল। আমি অনেক ডাকাডাকি করি, কিন্তু ভাইকে বাঁচাতে পারিনি।' এই কথা বলতে বলতে ছোট্ট মীমের চোখ ভিজছিল, আর কণ্ঠও বারবার আটকে যাচ্ছিল।
মীম স্থানীয় একটি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সে বলে, 'মিসবাহ আমার সঙ্গে স্কুলে যেতে চাইতো। ছোট বলে নিয়ে যেতাম না। ভেবেছিলাম আগামী বছর থেকে নিয়ে যাবো। কিন্তু সে সুযোগ আর আসবে না।'
সরেজমিনে দেখা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ছোট ঘরটির দরজা থেকে মাত্র ২০–২৫ ফুট দূরে উন্মুক্ত অবস্থায় ছিল গর্তটি। মাত্র পাঁচ ফুট দূরত্বেই একটি সচল নলকূপ স্থাপন করা ছিল। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সম্ভবত কোনো ত্রুটির কারণে প্রথমে এই গর্তে নলকূপ বসানো হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, মিসবাহর বাবা সাইফুল আলম ও আশপাশের কেউই আগে গর্তটির সম্পর্কে জানতেন না। আগাছা ও ছোট গাছে ঢাকা থাকায় এটি কারও নজরে আসেনি। সম্প্রতি আগাছা পরিষ্কার করার পর জায়গাটি উন্মুক্ত হয়, তখনই শিশুরা সেখানে খেলতে যায়।
গতকাল চার ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর রাত সাড়ে আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিস শিশুটিকে উদ্ধার করে। গর্তে অক্সিজেন সরবরাহ চালু করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মিসবাহকে মৃত ঘোষণা করেন।
মিসবাহর একটি জামা হাতে নিয়ে দিনমজুর সাইফুল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এক সপ্তাহ আগে ছেলেটার জন্য এই শীতের কাপড়টা কিনেছিলাম। খুব খুশি হয়েছিল।'
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর মিসবাহ আমার সংসারে এসেছিল। ভেবেছিলাম, এক ছেলে এক মেয়ে আছে আমার। আর কিছু লাগবে না এই জীবনে। যত কষ্টই হোক, লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করব ছেলে-মেয়েদের।
প্রতিবেশী ইসমাইল হোসেন বলেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়। সরকারি প্রকল্পে বাড়ি ও নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। তবে একটি পরিত্যক্ত বা ত্রুটিপূর্ণ নলকূপের গর্ত খোলা অবস্থায় রেখে দেওয়া মারাত্মক অবহেলা। দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় জেলার এক হাজারের বেশি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়েছে। মিসবাহর পরিবার ঘরটি পায় ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে।
রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রাহাতুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, সরকারি ঘর ও নলকূপ নির্মাণে কারা জড়িত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখতে উপজেলা প্রকৌশলী আবুল কালামকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তদন্তে কারও গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।