অফিসের ‘মা’ বলে যদি কাউকে ডাকা যায়
পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজেরই কোনো দৃশ্যমান মাপকাঠি নেই। অনেক অবদান আছে, যেগুলোর হিসাব হয় না। কিন্তু সেগুলো ছাড়া পুরো ব্যবস্থাটাই ধীরে ধীরে অগোছালো হয়ে পড়ে।
একটি পরিবারে সাধারণত বাবা উপার্জন করেন, যার মাধ্যমে সংসারের অর্থনীতি সচল থাকে। কিন্তু সেই আয়ের যথাযথ ব্যবহার, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সবার প্রয়োজন মেটানো, ভবিষ্যতের সংকটের জন্য সঞ্চয় করা এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্য যাতে নিশ্চিন্তে নিজের কাজ করতে পারে, এমন একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেন সাধারণত ‘মা’।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরাও অনেক এগিয়ে গিয়েছেন, তারা আয় করে পরিবার সচলও রাখছেন। তবে, এখনো অনেক পরিবারেই মা হয়তো সরাসরি আয় করেন না, কিন্তু পুরো সংসারের ছন্দ গড়ে ওঠে তার হাতেই। মা কর্মজীবী হোক বা নাই হোক, পরিবারের কারো মন খারাপ, কারো অসুস্থতা, কারো পরীক্ষার চাপ কিংবা কারো স্বপ্ন পূরণ করার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকেন তিনি। পরিবারের সবাই ভালো থাকলেই যেন তার ভালো থাকা নিশ্চিত হয়।
একটি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগকে আমি অনেকটা ‘মায়ের’ সঙ্গেই তুলনা করি। কারণ, প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা-বাণিজ্য, আয়-ব্যয় কিংবা মুনাফা সবই দৃশ্যমান। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরে মানুষের আস্থা, স্বস্তি, সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তাবোধের ভিত্তি তৈরি করে যে বিভাগ, সেটিই হলো মানবসম্পদ বিভাগ।
একজন বাবা যেমন সংসারের জন্য আয়-উপার্জন করেন, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা বিভাগ সেই আয় সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই আয়ের সঠিক ব্যবহার, মানুষের প্রয়োজন, সংকট ও সম্ভাবনার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার দায়িত্ব অনেকটাই মানবসম্পদ বিভাগের ওপর এসে পড়ে।
ফাইন্যান্স ও কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই মানবসম্পদ বিভাগকে পুরো বছরের জনবল ব্যবস্থাপনা করতে হয়। কোথাও দক্ষ মানুষ আনতে হয়, কোথাও সীমিত সম্পদ দিয়েই কর্মীদের আস্থা ধরে রাখতে হয়, কোথাও ভবিষ্যতের জন্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হয়।
একজন সন্তান জন্ম দেওয়ার পেছনে যেমন সবচেয়ে বড় শারীরিক ও মানসিক ত্যাগ থাকে মায়ের, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠানে নতুন একজন কর্মী খুঁজে বের করা, যাচাই করা, নিয়োগ দেওয়ার দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার বড় দায়িত্ব থাকে মানবসম্পদ বিভাগের ওপর।
কিন্তু দায়িত্ব শুধু নিয়োগ পর্যন্ত শেষ হয় না। একজন মা যেমন সন্তান জন্মের পর তাকে ধীরে ধীরে বড় করে তোলেন, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে শেখান, ভুল হলে শুধরে দেন, সাহস জোগান; ঠিক তেমনি একজন নতুন কর্মীকেও প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে হয় মানবসম্পদ বিভাগকে।
ওরিয়েন্টেশন, প্রশিক্ষণ, ফলোআপ, দক্ষতা উন্নয়ন সবকিছু মিলিয়ে একজন কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের উপযোগী করে গড়ে তোলার পেছনে মানবসম্পদ বিভাগের বড় ভূমিকা থাকে।
একজন মা চেষ্টা করেন ঘরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে সন্তান সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে। মানবসম্পদ বিভাগও চেষ্টা করে অফিসে এমন একটি কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে, যেখানে কর্মীরা নিরাপদ বোধ করবেন, সম্মান পাবেন, নিজের কাজটি মন দিয়ে করতে পারবেন। কারণ, একজন কর্মী শুধু বেতনের জন্য কাজ করেন না। তিনি কাজ করেন সম্মান, স্বীকৃতি ও মানসিক স্বস্তির জন্য এবং নিজের সম্ভাবনাকে অর্থবহ করে তোলার জন্য।
প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত রাজস্ব, মুনাফা, প্রবৃদ্ধি বা বাজার হিস্যার মাধ্যমে সংখ্যা দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করে। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনেই একজন মানুষ থাকে। ক্লান্ত একজন মানুষ; স্বপ্ন দেখা একজন মানুষ; সংগ্রাম করা একজন মানুষ।
মানবসম্পদ বিভাগের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সম্ভবত এখানেই। যেন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে মানুষ কখনো শুধুই ‘রিসোর্স’ হয়ে না যান। যেন একজন কর্মী অনুভব করেন, তিনি শুধু একটি আইডি নম্বর নন; তিনি এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ।
একটি সন্তানের মানসিক, সামাজিক ও মানবিক বিকাশে যেমন মায়ের প্রভাব গভীর, তেমনি একজন কর্মী প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির সঙ্গে কীভাবে নিজেকে যুক্ত করবেন, সহকর্মীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন এবং নেতৃত্বকে কীভাবে দেখবেন, এসব ক্ষেত্রেও মানবসম্পদ বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মা সন্তানদের শুধু আদর করেন না, শৃঙ্খলাও শেখান এবং প্রয়োজনে কঠোরও হন। মানবসম্পদ বিভাগকেও প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা, নীতি ও পেশাদারিত্ব ধরে রাখতে অনেক সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাইরে থেকে সেটি কঠোর মনে হতে পারে, কিন্তু অনেক সময় সেটিই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য প্রয়োজন হয়।
পরিবারে সন্তানদের নানা রকম অভিমান, অভিযোগ, চাওয়া-পাওয়া সবচেয়ে বেশি গিয়ে জমা হয় মায়ের কাছেই। অফিসেও কর্মীদের ব্যক্তিগত সমস্যা, ক্ষোভ, হতাশা, অসন্তোষ কিংবা প্রত্যাশার প্রথম দরজাগুলোর একটি হয় মানবসম্পদ বিভাগ। কখনো কাউন্সেলিং করে, কখনো বোঝাপড়া তৈরি করে, কখনো নীতিমালা প্রয়োগ করে—প্রতিদিন অসংখ্য মানবিক পরিস্থিতি সামলাতে হয় এইচআরকে।
ভাইবোনদের মধ্যে ঝগড়া হলে যেমন মা মধ্যস্থতা করেন, তেমনি অফিসেও কর্মী-কর্মী বা কর্মী-কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্বে অনেক সময় নিরপেক্ষ সমাধানকারীর ভূমিকায় দাঁড়াতে হয় মানবসম্পদ বিভাগকে। কখনো সম্পর্ক বাঁচাতে হয়, কখনো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হয়, কখনো কঠিন প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তও নিতে হয়।
পরিবারের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে সাধারণত মাকেই সবচেয়ে বেশি ধৈর্য ধরতে হয়। আর্থিক সংকট, অসুস্থতা কিংবা পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যেও তিনি চেষ্টা করেন ভেতরের ভারসাম্য ধরে রাখতে। প্রতিষ্ঠানের কঠিন সময়েও মানবসম্পদ বিভাগের ভূমিকা অনেকটা তেমন। সাংগঠনিক পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ কিংবা সংকটের সময় কর্মীদের আস্থা ধরে রাখা, আতঙ্ক কমানো, মানবিক ভারসাম্য বজায় রাখা মানবসম্পদ বিভাগের সবচেয়ে কঠিন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি।
আবার সন্তানের ছোট্ট অর্জনেও যেমন মা সবচেয়ে বেশি খুশি হন, তেমনি একজন কর্মীর সাফল্য, পদোন্নতি, স্বীকৃতি কিংবা নতুন দায়িত্ব পাওয়ার মুহূর্তেও মানবসম্পদ বিভাগ নীরব আনন্দ অনুভব করে। কারণ, একজন মানুষের বেড়ে ওঠার ভেতরে নিজের অবদান দেখতে পাওয়ার আনন্দ আলাদা।
মায়ের কাজের কোনো নির্দিষ্ট অফিস সময় নেই; সবাই ঘুমিয়ে গেলে তিনি পরের দিনের কথা ভাবেন; সবাই খেয়ে নিলে তবেই নিজের কথা ভাবেন। তেমনি মানবসম্পদ বিভাগের কাজও অনেকটা অদৃশ্য ও চলমান। একটি নিয়োগ শেষ হলে তৈরি হয় আরেকটি শূন্য পদ। একটি সমস্যা সমাধান হলে সামনে আসে নতুন আরেকটি মানবিক পরিস্থিতি। একটি আয়োজন শেষ হলে শুরু হয় পরবর্তী আয়োজনের প্রস্তুতি। কিন্তু এসব কাজের বড় অংশই সম্পন্ন হয় নীরবে, কোনো করতালি ছাড়াই।
একসময় সন্তানেরা বড় হয়। কেউ দূরে চলে যায়। কেউ নতুন জীবনের জন্য পরিবার ছেড়ে অন্য শহর বা দেশে পাড়ি জমায়। তবু মা কষ্ট চেপে রেখে সন্তানের ভালো চান। প্রতিষ্ঠানেও তেমন ঘটে। কোনো কর্মী নতুন সুযোগের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে চাইলে মানবসম্পদ বিভাগ অনেক সময় তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে। আবার বুঝতে পারে, এই চলে যাওয়াটাই হয়তো তার ক্যারিয়ারের জন্য ভালো। তখন সম্পর্ক নষ্ট না করে, সম্মান রেখেই বিদায় দেওয়ার দায়িত্বটিও মানবসম্পদ বিভাগের।
আসলে একটি ভালো প্রতিষ্ঠান শুধু বড় অফিস, বড় আয় কিংবা বড় ব্র্যান্ড দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় তখনই, যখন সেখানে কর্মীরা সম্মান পান, নিরাপদ বোধ করেন, নিজের কথা বলতে পারেন, ভুল করলে শেখার সুযোগ পান এবং নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারেন।
আর এই মানবিক ভিত্তি তৈরির পেছনে মানবসম্পদ বিভাগের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, যদিও সবচেয়ে কম দৃশ্যমান। তাই ‘বিশ্ব মানবসম্পদ দিবসে’ মানবসম্পদ বিভাগের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এটিই—এই বিভাগ শুধু জনবল পরিচালনা করে না; মানুষকে ধারণ করে। অনেকটা পরিবারের ‘মায়ের’ মতো। যার কাজের সবটুকু হয়তো চোখে পড়ে না, কিন্তু যাকে ছাড়া পুরো ব্যবস্থাটাই ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে।
মো. শামীম খান: মানবসম্পদ পেশাজীবী
shamim.khan@prothomalo.com