তামাকের সহজলভ্যতা বাড়াচ্ছে অসংক্রামক রোগের বোঝা
বাংলাদেশে লাখো মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যান। অথচ যে পণ্য এই বিপুল মৃত্যু ও বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের জন্য দায়ী, সেটিই এখনো দেশের সস্তা ও সহজলভ্য পণ্যের মধ্যে একটি। ফলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের সতর্কতা সত্ত্বেও তামাক ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত হারে কমছে না।
গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ (প্রায় ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর বড় অংশই অকালমৃত্যু, যা কার্যকর নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরোধ সম্ভব।
বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। হৃদরোগ, ক্যানসার, স্ট্রোক, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ তামাক। ফলে তামাকের ক্ষতি শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পরিবার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক বোঝা ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তামাক থেকে সরকার যে রাজস্ব আয় করে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয় তামাকের ক্ষতি মোকাবিলায়।
সরকার অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং ক্যানসার ও কিডনি রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
কিন্তু একইসঙ্গে তামাকপণ্যের কর ও মূল্যনীতি যদি কার্যকর না হয়, তাহলে এসব উদ্যোগের সুফল অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়বে। কারণ, একদিকে সরকার অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগ করবে, অন্যদিকে তামাকপণ্য সস্তা ও সহজলভ্য থাকবে—যা পরস্পরবিরোধী।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ৬০ টাকা থেকে ৬২ টাকা করা হয়েছে, যা মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি। মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম ৮০ টাকা থেকে ৯২ টাকা (১৫ শতাংশ বৃদ্ধি), উচ্চ স্তরের দাম ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা (১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ১৮৫ টাকা থেকে ২১০ টাকা (১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি) নির্ধারণ করা হয়েছে।
কাগজে-কলমে এই মূল্যবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য মনে হলেও বাস্তবে তা মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় খুবই সামান্য। ফলে, তামাকপণ্যের প্রকৃত মূল্য কমছে এবং সেগুলো আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘প্রকৃত মূল্যহ্রাস’।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিড়ির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ২৫ শলাকার নন-ফিল্টার বিড়ি এবং ২০ শলাকার ফিল্টার বিড়ির খুচরা মূল্য ও করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে, মূল্যস্ফীতির প্রভাবে বিড়ির প্রকৃত মূল্য আরও কমে যাবে।
এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, বাংলাদেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই নিম্ন স্তরের সিগারেটের দখলে, যার প্রধান ব্যবহারকারী তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ। একইভাবে বিড়ি, জর্দা ও গুলের ব্যবহারও তুলনামূলক বেশি নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য কমে গেলে স্বাস্থ্য বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তামাক ব্যবহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কর বৃদ্ধি করে তামাকপণ্যের দাম বাড়ানো। বিশেষ করে তরুণরা মূল্য পরিবর্তনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। দাম বাড়লে তারা তামাক ব্যবহার শুরু করতে নিরুৎসাহিত হয় এবং বিদ্যমান ব্যবহারকারীদের অনেকেই তামাক ছাড়তে উৎসাহিত হন।
কিন্তু, বাংলাদেশের বর্তমান তামাক করব্যবস্থা জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ। বিভিন্ন মূল্যস্তর ও করহারের কারণে ব্যবহারকারীরা সহজেই উচ্চমূল্যের পণ্য থেকে কমদামি পণ্যে চলে যেতে পারেন। ফলে, কর বৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত জনস্বাস্থ্যগত সুফল পাওয়া যায় না।
এ কারণেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে তামাক কর কাঠামো সহজ ও কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার ন্যূনতম খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পূরক শুল্কের সঙ্গে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে।
একইসঙ্গে বিড়ি, জর্দা ও গুলসহ সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম ও করহার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা একটি পণ্য থেকে অন্য অপেক্ষাকৃত সস্তা পণ্যে স্থানান্তরিত হতে না পারেন।
সুনির্দিষ্ট করব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে তামাক কোম্পানিগুলো মূল্যস্তরের ফাঁক ব্যবহার করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একইসঙ্গে কর আহরণ সহজ হয়, কর ফাঁকির সুযোগ কমে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে চলতি অর্থবছরের তুলনায় সরকার প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারত। একইসঙ্গে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হতেন এবং প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকতেন। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৪ লাখ অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো।
অর্থাৎ কার্যকর তামাক করনীতি শুধু রাজস্ব বাড়ানোর উপায় নয়; এটি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপগুলোর একটি।
কিন্তু, সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে সেই প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, সাহসী তামাক করনীতি দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। ফিলিপাইন ২০১২ সালে তামাক শিল্পের প্রবল লবিং উপেক্ষা করে কার্যকর সিন ট্যাক্স সংস্কার বাস্তবায়ন করেছিল। এর এক দশকের মধ্যে দেশটিতে ধূমপানের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে এবং অতিরিক্ত রাজস্ব ব্যবহার করে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশও চাইলে একই পথ অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু, বিদ্যমান করকাঠামোয় কোনো মৌলিক সংস্কার না হওয়ায় সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তামাক কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফায় পরিণত হবে। এই অতিরিক্ত মুনাফা আবার তামাক ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।
উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা এবং এর ওপর ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে ১০ শলাকা হিটেড টোব্যাকো পণ্যের খুচরা মূল্য ২১০ টাকা এবং এর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব নতুন তামাক ও নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশে প্রচলিত নয় এমন পণ্যের জন্য করকাঠামো নির্ধারণের ফলে কার্যত নতুন বাজার তৈরি হবে এবং জনগণ বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
তামাক নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্যখাতের বিষয় নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হলে তামাকের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই।
চূড়ান্ত বাজেট পাসের আগে সরকারের সামনে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক কর ও মূল্যনীতি প্রণয়ন করে একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধি দুই লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব।
তামাকপণ্য মানুষের নাগালের বাইরে নেওয়া গেলে কমবে তামাক ব্যবহার, কমবে অসংক্রামক রোগের বোঝা, কমবে চিকিৎসা ব্যয় এবং রোধ করা যাবে হাজারো অকালমৃত্যু।
অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী: বিভাগীয় প্রধান, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট