ক্ষমতাবানদের হাসপাতাল আলাদা কেন?
বাংলাদেশে একটি দৃশ্য বারবার ফিরে আসে। কোনো মন্ত্রী, স্পিকার, সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ আমলা কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অসুস্থ হলেই খবর আসে, তিনি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, ভারত বা অন্য কোনো দেশে গেছেন।
কয়েকদিন আগে খবর এলো, জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে গেছেন। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব খবর আর মানুষের ভাবান্তর ঘটায় না। বরং আমরা ধরে নিয়েছি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চিকিৎসার ঠিকানা দেশের হাসপাতাল নয়, বিদেশ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন?
উত্তরটি সবাই জানে, যদিও খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে বলতে চান। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শয্যা সংকট, চিকিৎসক সংকট, অব্যবস্থাপনা, যন্ত্রপাতির অভাব এবং সেবার মান নিয়ে নানা সমালোচনার মুখে। সামর্থ্যবান মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল বা বিদেশে চিকিৎসা নেন। আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তারা বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান।
কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এ দেশ থেকে বহু মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে। এর ফলে প্রতি বছর পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে চিকিৎসার খরচে। দেশের মানুষের চিকিৎসা আমরা কেন দেশে করাতে পারব না? আমরা কেন মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারব না? এটা আইন প্রয়োগ করে হবে না। কেবল চিকিৎসকরাই পারবেন তাদের মানবিক এপ্রোচ আর সঠিক চিকিৎসা দানের মাধ্যমে দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ ফিরিয়ে আনতে। তাই চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান থাকবে রোগীর আস্থা অর্জনে আরও মানবিক হোন।’ (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ১১ জুলাই ২০২৬)
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, সেটি হলো মানুষের আস্থা। কিন্তু আস্থা কি শুধু চিকিৎসকের মানবিক আচরণে তৈরি হয়? একজন রোগী যখন হাসপাতালে গিয়ে শয্যা পান না, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক খুঁজে পান না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন কিংবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বাইরে করাতে বাধ্য হন, তখন তার আস্থা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। আবার যখন তিনি দেখেন দেশের নীতিনির্ধারকেরা নিজেরাই চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন, তখন সেই আস্থা আরও ভেঙে পড়ে।
দেশের ৫৯টি জেলা হাসপাতালে ২০২৪ সালে গড় শয্যা ব্যবহার হার ছিল ১৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে ১৭৮ জন রোগীকে। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর গড় শয্যা ব্যবহার হার ছিল ১৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ হাসপাতালগুলো ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগীর চাপ সামলাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব, সেটি সহজেই অনুমান করা যায়। (দ্য ডেইলি স্টার, ২৬ জুলাই ২০২৬)
শুধু শয্যা সংকটই নয়, সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের প্রায় ২৩ শতাংশ এখনও শূন্য। সংখ্যায় যা ৯ হাজার ৪০৭টি পদ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শয্যা বাড়িয়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে অবকাঠামো সম্প্রসারণের সুফল রোগীরা পাবেন না। অথচ সরকার দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু জনবল ছাড়া বড় ভবন কখনোই ভালো স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। (দ্য ডেইলি স্টার, ২২ জুলাই ২০২৬)
এই বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ আমলা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য কি দেশে যে চিকিৎসা সম্ভব, সেই চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার ওপর একটি কঠোর নীতিমালা বা আইন থাকা উচিত?
অনেকে বলতে পারেন, বাংলাদেশে তো অনেক আইনই আছে, সেগুলো ঠিকমতো মানা হয় না। তাহলে নতুন আইন করে কী হবে?
প্রশ্নটি যৌক্তিক। কিন্তু এখানে আইনের উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আজ কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিদেশে চিকিৎসা নিতে চাইলে তাকে কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না। অথচ একটি নীতিমালা থাকলে তাকে দেখাতে হবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটি দেশে সম্ভব নয়। সেই সিদ্ধান্ত একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড নিতে পারে। অর্থাৎ দেশে যে চিকিৎসা সম্ভব, শুধু সেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হবে। আর দেশে যে চিকিৎসা নেই, সেখানে অবশ্যই ব্যতিক্রমের সুযোগ থাকবে।
আইনের শক্তি শুধু শাস্তি দেওয়ায় নয়, আচরণ পরিবর্তনের পথ তৈরি করায়। একসময় সিটবেল্ট ব্যবহার, কিংবা মোটরসাইকেলে হেলমেট পরার নিয়মও নতুন ছিল। প্রথম দিকে অনেকেই মানতে চাননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সামাজিক আচরণের অংশ হয়ে উঠেছে। একইভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রেও একটি জবাবদিহিমূলক নীতিমালা ধীরে ধীরে নতুন সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, যে ব্যক্তি স্বাস্থ্যখাতের বাজেট অনুমোদন করবেন, হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেবেন কিংবা চিকিৎসা ব্যবস্থার সংস্কার করবেন, তিনি যদি নিজেই জানেন যে প্রয়োজনে তাকেও এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে হবে, তাহলে হাসপাতালের মান উন্নয়নে তার আগ্রহ ও দায়বদ্ধতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। কারণ তখন স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা আর শুধু জনগণের সমস্যা থাকবে না, সেটি তার নিজের সমস্যাও হয়ে দাঁড়াবে।
অবশ্য শুধু আইন করলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়ে যাবে—এমন দাবি করা বাস্তবসম্মত নয়। হাসপাতাল উন্নত করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। কিন্তু নীতিনির্ধারকেরা যখন নিজেরাও সেখানে যাবেন, তখন এসব পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক চাপ এবং জনদাবি দুটোই অনেক বেশি শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে ব্যয় করেন। এর একটি বড় অংশ যদি দেশের হাসপাতালগুলোতেই ব্যয় হতো, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যখাতও আরও শক্তিশালী হতো। কিন্তু সেই আস্থা তৈরি করতে হলে শুধু চিকিৎসকদের মানবিক হওয়ার আহ্বান যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রকেও উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
জনগণের প্রতিনিধি যদি জনগণের মতোই একই হাসপাতালের সেবা নেন, তাহলে হাসপাতালের সমস্যাগুলো আর কাগজের প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সেগুলো নীতিনির্ধারকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে। আর ইতিহাস বলে, যেসব সমস্যার মুখোমুখি ক্ষমতাবানরা নিজেরা হন, সেসব সমস্যার সমাধানই সবচেয়ে দ্রুত হয়।
তাই বিদেশে চিকিৎসা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি নয়, বরং দেশে সম্ভব এমন চিকিৎসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক নীতিমালা প্রণয়নের সময় এসেছে। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু কথায় নয়, কাজে দেখাতে হবে যে দেশের হাসপাতাল জনগণের জন্য যেমন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষের জন্যও তেমনই।
মো. আব্বাস: করপোরেট কমিউনিকেশনসে কর্মরত।
abdulla180395@gmail.com