শতবর্ষে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন

‘শিখা’ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বাঙালি মুসলমানের জনপরিসরে যুক্তির খোঁজে

রাজীব নন্দী
রাজীব নন্দী

বাংলার ঢাকায় আজি হতে শতবর্ষ আগে ‘অজ্ঞান-তিমিরান্ধস্য’ মুসলিম বাঙালি জাতির চক্ষুন্মীলনের জন্য যে ‘জ্ঞানাঞ্জন’ প্রজ্বলিত হয়েছিল, আজ সেই আলোর কাছেই আমাদের আত্মসমালোচনার সময়। ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’র শতবর্ষ তাই নিছক স্মরণোৎসব নয়; এটি বাঙালি মুসলমান সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রার এক কঠিন হিসাব-নিকাশ।

১৯২৬ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠা এবং পরের বছর তার মুখপত্র ‘শিখা’র প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, শত বছর পরও তা আমাদের পিছু ছাড়েনি—আমরা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখেছি? নাকি কেবল আনুগত্যের পুরোনো ভাষা, গোঁড়ামির পুরোনো কাঠামো এবং সংস্কারের পুরোনো শৃঙ্খলকে প্রযুক্তির নতুন পর্দায় স্থানান্তর করেছি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-শাসিত এই ডিজিটাল সমাজে তথ্যের বিস্তার ঘটেছে বিস্ফোরণের মতো, কিন্তু চিন্তার পরিসর কি একইভাবে প্রসারিত হয়েছে? আমরা কি যুক্তিবোধকে জীবনের চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছি, নাকি অ্যালগরিদম, গুজব, আবেগ ও দলীয় আনুগত্যের কাছে নিজেদের বিচারবুদ্ধিকে আরও সহজে সমর্পণ করেছি?

‘অজ্ঞান-তিমির’ ভেদ করে যে আজি হতে শতবর্ষ আগে ‘চক্ষুন্মীলন’-এর যজ্ঞ শুরু হয়েছিল, আজ আমরা সেই আলোর সামনেই দাঁড়িয়ে। তাই প্রশ্নটা শুধু অতীতের নয়। প্রশ্নটা আমাদের বর্তমানের। আমাদের ভবিষ্যতেরও। বুদ্ধির মুক্তির যে আন্দোলন একদিন শুরু হয়েছিল, আমরা কি সত্যিই তার উত্তরাধিকার বহন করছি? নাকি আমাদের সময়ই বলে দিচ্ছে—সেই আন্দোলনের প্রয়োজন আজ আরও গভীর, আরও জরুরি?

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ কোনো নিছক সাহিত্যিক আড্ডা ছিল না। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহের হোসেন, আবদুল কাদির, আবুল ফজল ও তাদের সহযাত্রীরা সাহিত্যকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন সমাজের চিন্তার পদ্ধতি বদলানোর মাধ্যম হিসেবে। তাদের কাছে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ মানে ধর্মবিরোধিতা ছিল না; বরং ধর্ম, শাস্ত্র, ঐতিহ্য ও সামাজিক বিধানকে অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে বিচারবুদ্ধি, ইতিহাস ও পরিবর্তিত মানবিক প্রয়োজনের আলোকে বোঝা। মুসলিম সাহিত্য সমাজের ঘোষিত লক্ষ্যই ছিল মানুষের বুদ্ধিকে অন্ধ বিশ্বাস ও শাস্ত্রানুগতার অধীনতা থেকে মুক্ত করা।

এই আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে রাজনীতিকে শুধু দল, নির্বাচন ও রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখলে চলবে না। রাজনৈতিক যোগাযোগের দৃষ্টিতে ক্ষমতার একটি বড় অংশ কাজ করে মানুষের ভাষা, বিশ্বাস, পরিচয় ও ‘স্বাভাবিক বোধ’ নির্মাণের মাধ্যমে। কোন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হবে, কে কথা বলার অধিকার পাবে, কোন প্রশ্নকে ধর্মদ্রোহিতা বলা হবে এবং কোন নীরবতাকে সামাজিক শালীনতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে—এসবই রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন। এই অর্থে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ছিল সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিচালিত এক ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রাম। এর নেতারা সমকালীন দলীয় রাজনীতির অভিন্ন কর্মসূচিতে আবদ্ধ ছিলেন না। তাদের বড় উপলব্ধি ছিল, শুধু শাসক বদলালেই সমাজ মুক্ত হয় না; মানুষের চিন্তার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুরোনো কর্তৃত্বকেই পুনরুৎপাদন করে।

কিন্তু এখানেই আন্দোলনের একটি সীমাবদ্ধতাও ছিল। তারা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে রাজনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে যথার্থভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন, অথচ সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পেছনে সক্রিয় শ্রেণিশক্তি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠিত রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে পর্যাপ্ত সাংগঠনিক মোকাবিলা গড়ে তুলতে পারেননি।

যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় মুসলিম সাহিত্য সমাজকে একটি প্রাথমিক ‘বিকল্প জনপরিসর’ বা কাউন্টারপাবলিক হিসেবে দেখা যায়। হাবারমাসের জনপরিসরের ধারণা অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক সমাজে এমন একটি ক্ষেত্র প্রয়োজন, যেখানে নাগরিকেরা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বাইরে দাঁড়িয়ে সাধারণ স্বার্থের বিষয় নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা করবেন। কিন্তু ন্যান্সি ফ্রেজার দেখিয়েছেন, বাস্তবে একটি একক ও সমতাভিত্তিক জনপরিসর সচরাচর থাকে না; প্রান্তিক ও অধস্তন জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা, প্রয়োজন ও বিরোধী ব্যাখ্যা প্রকাশের জন্য পৃথক বিকল্প পরিসর তৈরি করে। ঔপনিবেশিক বাংলায় কলকাতাকেন্দ্রিক অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তি এবং ঢাকার রক্ষণশীল মুসলিম সামাজিক নেতৃত্বের মাঝখানে ‘শিখা’ তেমনই একটি বিকল্প পরিসর নির্মাণের চেষ্টা করেছিল।

‘শিখা’র পাতায় সাহিত্য, ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, নারী, ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা মূলত প্রশ্ন করার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—এই বাক্য তাই কোনো অলংকারমাত্র নয়। এটি ছিল জ্ঞান ও ব্যাখ্যার ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ঘোষণা। কে ধর্ম ব্যাখ্যা করবেন, কে সমাজের নৈতিক সীমা নির্ধারণ করবেন এবং কোন জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছাবে—আন্দোলনটি এসব ক্ষমতার কেন্দ্রেই আঘাত করেছিল।

ফলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধও শুধু ধর্মতাত্ত্বিক ছিল না; সেটি ছিল ক্ষমতা রক্ষার যোগাযোগ-কৌশল। কাজী আবদুল ওদুদের ‘সম্মোহিত মুসলমান’, আবুল হুসেনের ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’, ‘আদেশের নিগ্রহ’ ও তার অন্যান্য ‘বিতর্কিত রচনা’ নিয়ে যুক্তির মাধ্যমে আলোচনা করার পরিবর্তে লেখকদের ‘নাস্তিক’, ‘ধর্মদ্রোহী’ কিংবা ‘ইসলামবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিরোধীদের এই কৌশলকে রাজনৈতিক যোগাযোগের ‘ফ্রেমিং’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

রবার্ট এন্টম্যানের ভাষায়, ফ্রেমিং হলো বাস্তবতার কিছু দিক নির্বাচন করে সেগুলোকে এমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া, যাতে সমস্যার সংজ্ঞা, কারণ, নৈতিক মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য সমাধান একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত হয়। এখানে মূল প্রশ্ন, ধর্মীয় ব্যাখ্যা কি ইতিহাস ও যুক্তির আলোকে পুনর্বিবেচ্য, সেটা আড়াল করে আলোচনাটিকে ‘ইসলামের পক্ষে না বিপক্ষে’ এই পরিচয়ভিত্তিক দ্বন্দ্বে নামিয়ে আনা হয়েছিল?

এটি ছিল কার্যকর একটি এজেন্ডা নির্ধারণের কৌশলও। গণমাধ্যম ও প্রভাবশালী যোগাযোগকারীরা সবসময় মানুষকে সরাসরি কী ভাবতে হবে তা নির্ধারণ না করলেও, কোন বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে এবং কোন বিষয়কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে হবে—তা অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে। বুদ্ধির মুক্তির বিরোধীরা তাই ওদুদ বা আবুল হুসেনের যুক্তির সত্যতা নিয়ে জনআলোচনা হতে দেননি; বরং তাদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক আনুগত্য ও পরিচয়ের বৈধতাকেই আলোচনার প্রধান বিষয় বানিয়েছিলেন।

ফলে সংস্কার, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রশ্ন হারিয়ে গিয়ে ‘কে প্রকৃত মুসলমান’—এই প্রতীকী প্রতিযোগিতা সামনে চলে আসে। কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতি এই বিরোধকে আরও তীব্র করেছিল। কারণ, নজরুলের সাহিত্য ও রাজনৈতিক ভাষা একইসঙ্গে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় ভণ্ডামিকে চ্যালেঞ্জ করছিল। তার বিরুদ্ধে ‘কাফের’ বা ‘নাস্তিক’ অভিধার ব্যবহারও ছিল যুক্তির জবাবে সামাজিক পরিচয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ।

রাজনৈতিক যোগাযোগে একে চরিত্রহননমূলক বৈধতা-হরণ বলা যায়—বক্তব্যের মোকাবিলা না করে বক্তার কথা বলার নৈতিক অধিকারটিই অস্বীকার করা। তবে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে নিছক বীরত্বগাথায় পরিণত করাও সমালোচনামূলক ইতিহাসচর্চা নয়। আন্দোলনটি প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক, শিক্ষিত ও পুরুষ মধ্যবিত্তের বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ ছিল। নারীর মুক্তি নিয়ে প্রগতিশীল অবস্থান থাকলেও বেগম রোকেয়ার মতো সমকালীন শক্তিশালী নারীবাদী চিন্তকের সঙ্গে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দৃশ্যমান সম্পর্ক তৈরি না হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শূন্যতা। কৃষক, শ্রমিক, গ্রামীণ নারী ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের ভাষায় মুক্তবুদ্ধির ধারণা অনুবাদ করার দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিও গড়ে ওঠেনি। সংগঠনটির সভায় নারীদের অংশগ্রহণ ও সংগীত পরিবেশনের অগ্রসর নজির থাকলেও এর বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে নারী প্রায় অনুপস্থিত ছিল।

আরও বড় দুর্বলতা ছিল প্রতিষ্ঠান নির্মাণে। একটি বার্ষিক পত্রিকা, কিছু সভা ও কয়েকজন উজ্জ্বল লেখকের ওপর নির্ভরশীল আন্দোলন সামাজিক ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। ‘শিখা’র মাত্র পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় এবং মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যক্রমও ১৯৩৮ সালের পর টেকেনি। বিরোধীপক্ষের হাতে ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সালিশ, পারিবারিক কর্তৃত্ব ও স্থানীয় প্রভাবের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক; বিপরীতে মুক্তবুদ্ধির পক্ষের যোগাযোগ ছিল নগরকেন্দ্রিক ও সীমিত। এমনকি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলন ও দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ধারায় প্রভাবিত হয়ে আগের মুক্তবুদ্ধির অবস্থান থেকে দূরে সরে যান। অতএব, আন্দোলনের ইতিহাস শুধু প্রতিরোধের ইতিহাস নয়; এটি সংগঠনহীন প্রগতিবাদের ভঙ্গুরতার ইতিহাসও।

এক শতাব্দী পর প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু যোগাযোগের মৌলিক ক্ষমতা-সম্পর্ক খুব বেশি বদলায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সব কণ্ঠকে সমান দৃশ্যমানতা দেয়নি। ডিজিটাল জনপরিসরে যুক্তির চেয়ে পরিচয়, তথ্যের চেয়ে আবেগ এবং সংলাপের চেয়ে দলগত আনুগত্য দ্রুত সংগঠিত হয়। এখানে কোনো বক্তব্যের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের আগেই বক্তার ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয় যাচাই করা হয়। প্রশ্নটির উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারীকে ‘কোন পক্ষের লোক’ হিসেবে শনাক্ত করাই হয়ে ওঠে প্রধান যোগাযোগ-কৌশল।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘স্পাইরাল অব সাইলেন্স’ বা নীরবতার সর্পিল প্রক্রিয়া। এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যানের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন মনে করে তার মতামত সামাজিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরোধী এবং তা প্রকাশ করলে বিচ্ছিন্নতা বা শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে, তখন সে নীরব থাকে। এই নীরবতা আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ মতকে বাস্তবের চেয়ে আরও শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান করে। বাঙালি মুসলমানের বর্তমান জনপরিসরে ধর্মীয় পুনর্ব্যাখ্যা, ইতিহাসের সমালোচনামূলক পাঠ কিংবা সংখ্যালঘু মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সামাজিক বর্জন, চাকরিগত ক্ষতি, অনলাইন আক্রমণ বা চরিত্রহননের আশঙ্কা একই ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করে।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বক্তব্যের ব্যাপক উপস্থিতিকে সরলভাবে ধর্মীয় জাগরণ বা সামাজিক পশ্চাৎপদতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এখানে বিশ্বাস, বাজার, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, জনপ্রিয়তার অর্থনীতি এবং অ্যালগরিদমিক দৃশ্যমানতা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। ধর্মীয় আবেগ যেমন আন্তরিক বিশ্বাসের প্রকাশ হতে পারে, তেমনি তা অনুসারী সংগ্রহ, রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণ এবং বিরোধী কণ্ঠকে চাপে রাখার যোগাযোগ-পুঁজিও হতে পারে। সমালোচনার লক্ষ্য বিশ্বাসী মানুষ নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই ক্ষমতাকাঠামো, যা বিশ্বাসকে প্রশ্নহীন আনুগত্যে এবং ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক নীরবতা তৈরির অস্ত্রে পরিণত করে।

এখানে বুদ্ধির মুক্তির প্রবক্তাদের কাছ থেকেও একটি শিক্ষা নিতে হবে। মুক্তবুদ্ধি মানে ধর্মকে অপমান করা নয়, আবার ধর্মীয় অনুভূতির নামে সব প্রশ্ন বন্ধ করে দেওয়াও নয়। যুক্তিবাদ যদি সাধারণ মানুষের জীবন, ভাষা ও বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করে কেবল শিক্ষিত অভিজাতের শ্রেষ্ঠত্ববোধে পরিণত হয়, তবে সেটিও মুক্তির পথ নয়। কার্যকর মুক্তবুদ্ধির জন্য প্রয়োজন এমন যোগাযোগ, যা মানুষের বিশ্বাসকে বুঝবে, কিন্তু ভয় পেয়ে সত্য গোপন করবে না; ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপ করবে, কিন্তু ঐতিহ্যকে ইতিহাসের ঊর্ধ্বে স্থান দেবে না।

বুদ্ধির মুক্তির প্রকল্প তাই শুধু কয়েকজন প্রাবন্ধিক বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের দায়িত্ব হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে প্রশ্ন, প্রমাণ ও বিতর্কের চর্চা; সংবাদমাধ্যমে উত্তেজনানির্ভর ধর্মীয় ফ্রেমের পরিবর্তে প্রেক্ষাপটভিত্তিক সাংবাদিকতা; বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ও ধর্মীয় চাপমুক্ত গবেষণা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই ও মিডিয়া সাক্ষরতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে বহুমাত্রিক ব্যাখ্যার সুযোগ—এসব ছাড়া মুক্তবুদ্ধি কেবল বার্ষিক বক্তৃতার বিষয় হয়েই থাকবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শুধু নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে না দেখে বিরুদ্ধমত শোনার নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, মুক্ত জনপরিসর তৈরি হয় তখনই, যখন কোনো বক্তব্যের মূল্য বক্তার পরিচয় দিয়ে নয়, তার যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে বিচার করা হয়।

শতবর্ষ পরে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রকল্পকে তাই সফল বা ব্যর্থ—এই দুই সরল শ্রেণিতে ফেলা যায় না। এটি ভাষা আন্দোলন, বাঙালি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং পরবর্তী অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। একইসঙ্গে এটি গণভিত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব এবং রাজনৈতিক সংগঠনের অভাবে সমাজের গভীরে স্থায়ী যুক্তিবাদী সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারেনি।

আজকের প্রশ্ন তাই এই নয় যে আমরা কাজী আবদুল ওদুদ বা আবুল হুসেনকে যথেষ্ট স্মরণ করছি কি না। প্রশ্ন হলো, তারা যে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, আমরা সেগুলো করার সামাজিক অধিকার রক্ষা করছি কি না। কোনো সমাজে বই, ডিগ্রি, প্রযুক্তি ও তথ্যের পরিমাণ বাড়তে পারে; কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হলে তাকে জ্ঞানী সমাজ বলা যায় না।

বুদ্ধির মুক্তির প্রকৃত পরীক্ষা কোনো স্মারকসভায় নয়—তার পরীক্ষা হয় তখন, যখন অজনপ্রিয় একটি মতকে যুক্তি দিয়ে বলার সুযোগ দেওয়া হয়; যখন ধর্মের নামে ক্ষমতা চর্চাকে ধর্মবিদ্বেষ ছাড়াই সমালোচনা করা যায়; যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার আবেগ সত্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে ওঠে না। সেই পরীক্ষায় বাঙালি মুসলমান সমাজ কতটা উত্তীর্ণ হয়েছে? সম্ভবত এই কারণেই শতবর্ষ পূর্তিতে আন্দোলনটির বিজয় ঘোষণা করার চেয়ে তার অসমাপ্তির স্বীকারোক্তিই বেশি সৎ। কারণ, জ্ঞান এখন আর আগের মতো দুষ্প্রাপ্য নয়, কিন্তু বুদ্ধি এখনো নানাভাবে আড়ষ্ট। আর বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও মানসিক মুক্তি অসম্ভব।

তবে এই আত্মসমালোচনাকে কোনোভাবেই বাঙালি মুসলমান সমাজের একক ব্যর্থতার বয়ান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাংলার নবজাগরণে রাজা রামমোহন রায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যুক্তিবাদ, মানবমর্যাদা, নারীশিক্ষা, ধর্মীয় সংস্কার ও স্বাধীন চিন্তার পক্ষে যে বিপুল শ্রম, সামাজিক ঝুঁকি ও ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তার উত্তরাধিকার বাঙালি হিন্দু সমাজও সমানভাবে ধারণ করতে পারেনি। শতবর্ষের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও সেখানে জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পৌরাণিক অতীতের রাজনৈতিক ব্যবহার, ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক পুনর্লিখন এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতার নতুন উত্থান স্পষ্ট। অর্থাৎ যুক্তির সংকট কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি ক্ষমতা, পরিচয় ও সামাজিক অনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর বাঙালি সংকট।

অবশ্য দুই সমাজের ইতিহাস, ক্ষমতার অবস্থান ও আধুনিকতার অভিজ্ঞতা এক নয়। তাই তাদের ব্যর্থতাকেও যান্ত্রিকভাবে সমান করে দেখা অনুচিত। ঔপনিবেশিক শিক্ষা, শ্রেণিগঠন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘুতা, রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—সবক্ষেত্রেই বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের পথ ছিল ভিন্ন। তবু একটি জায়গায় তাদের বর্তমান সংকট আশ্চর্যজনকভাবে মিলিত হয়েছে—উভয় সমাজেই মনীষীদের নাম উচ্চারিত হয়, কিন্তু তাদের মতো প্রশ্ন করার সাহস অনুসরণ করা হয় না; তাদের প্রতিকৃতি টাঙানো হয়, অথচ তাদের চিন্তার বিপজ্জনক ধারটি ভোঁতা করে দেওয়া হয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ কিংবা আবদুল ওদুদ—সবাইকে নিরাপদ স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত করার মধ্য দিয়েই আমরা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সমাজকে পুনর্গঠন করছি। বাঙালি হিন্দু সমাজের এই বুদ্ধিবৃত্তিক পশ্চাদপসরণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা অবশ্যই আরেকটি স্বতন্ত্র পরিসর দাবি করে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই মুসলমান না হিন্দু, কে বেশি যুক্তিবাদী, তা নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা আদৌ যুক্তির সমাজ হতে চেয়েছি কি না। যে সমাজ মনীষীদের জন্মদিন পালন করে, কিন্তু তাদের প্রশ্ন সহ্য করে না; বইমেলা করে, কিন্তু বইয়ের ভাবনা ভয় পায়; বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ায়, কিন্তু স্বাধীন বিচারবুদ্ধি সংকুচিত করে; ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে সত্যকে এবং সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষার নামে মানুষকে নীরব করে—সে সমাজ আসলে জ্ঞানের নয়, স্মারক ও স্লোগানের সমাজ। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কি এই নয় যে, আমরা মুক্তবুদ্ধির শহীদদের সম্মান করতে শিখেছি, কিন্তু মুক্তবুদ্ধিকে এখনো সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দিইনি?

 

রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।
rajibnandy@cu.ac.bd