কোনো দলের কাছেই কি সাংবাদিকরা নিরাপদ?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলা নতুন করে মনে করিয়ে দিলো, সরকার বদলালেও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার সংকট একই আছে। গতকাল রাতের ওই হামলায় দ্য ডেইলি স্টারের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুলসহ চারজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।
কয়েক মাস আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জামায়াতের কর্মীদের বিরুদ্ধে এক সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। ঘটনা দুটি আলাদা, হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয়ও আলাদা। তবে সাংবাদিকদের কাছে বার্তাটা একই। রাজনৈতিক কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিক নিজেই হামলার শিকার হতে পারেন।
রাজশাহীর ঘটনায় ছাত্রদল তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ধানমন্ডির ঘটনায় জামায়াত তদন্তের পর চারজনকে বহিষ্কার করেছে। এসব পদক্ষেপ নিতান্তই লোক দেখানো, তা আমরা এখন জানি। আমাদের এত বছরের অভিজ্ঞতা বলে, তদন্ত কমিটি বা সাংগঠনিক শাস্তির ঘোষণায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
কারণ, সমস্যাটা এখন আর হাতেগোনা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হামলায় সীমাবদ্ধ নেই। পরিসংখ্যানেই তা স্পষ্ট।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের হয়রানি ও নির্যাতনের ৩৮১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ১১৮ জন। প্রকাশিত সংবাদের কারণে মামলা হয়েছে ৭১টি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতন, হয়রানি বা হুমকির ঘটনা ঘটেছে ২৩টি। মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন ২০ জন।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও ছবিটা খুব বদলায়নি। মানবাধিকার সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২০০টি ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে আহত ২৩৪ জন, হুমকি পেয়েছেন ৪৯ জন, আটক হয়েছেন ১১ জন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জুলাই অভ্যুত্থানের পরের ১৫ মাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের হিসাবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৪৭৬টি ঘটনায় ১ হাজার ৭৩ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী হামলা, মামলা, হুমকি, হয়রানি, আটক কিংবা চাকরি হারানোর মতো ঘটনার শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে এ সময়ে ছয়জন সাংবাদিক নিহত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
একেক সংগঠনের হিসাবের পদ্ধতি একেক রকম, তাই সংখ্যায় ফারাক থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবু সব হিসাব থেকেই একটা কথা পরিষ্কার: সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং চাপ কোনোটিই কমেনি।
এ প্রসঙ্গে সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনির কথা না এসে পারে না। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় এই সাংবাদিক দম্পতি খুন হন। ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই হত্যার বিচার শেষ হয়নি।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তাদের পরিবারের আবেদনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দেখছে, মামলাটি তাদের এখতিয়ারে পড়ে কি না। মামলার তদন্ত এখনো পিবিআইয়ের হাতে।
এই বিচারহীনতা রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার জন্য যেমন লজ্জার, সাংবাদিকদের জন্যও তেমনি উদ্বেগের। হামলা বা হত্যার বিচার না হলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় হারায়। আর সেই ভয় একবার চলে গেলে পরের হামলাটা আরও সহজ হয়ে যায়।
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ কম ছিল না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা আইনের ব্যবহার করে সাংবাদিকদের চাপে রাখা হয়েছিল। এই সরকারের আমলেও একই রকম আইন হচ্ছে। অর্থাৎ পুরোনো জিনিস নতুন মোড়কে। সরকার বদলেছে, আওয়ামী লীগের সেই সময়ও শেষ হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির প্রবণতা শেষ হয়নি।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলার তথ্য সামনে এসেছে, তা–ও উদ্বেগজনক। দ্য ডেইলি স্টারের একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চার জেলায় ৩২টি মামলায় অন্তত ১৩৭ জন সাংবাদিকের নাম আছে। পরে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধানে জানা যায়, অন্তত ২৯৬ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী জুলাইয়ের ঘটনাসংক্রান্ত মামলায় আসামি হয়েছেন।
কোনো সাংবাদিক অপরাধ করলে অবশ্যই তার বিচার হবে। সাংবাদিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তোলে না। কিন্তু পেশাগত কাজের কারণে কাউকে রাজনৈতিক মামলায় জড়ানো আর নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগে আইনের আওতায় আনা এক জিনিস নয়। এই ফারাকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়। ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে তখন ২৯ জন সাংবাদিক ও কর্মী ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। ছয় মাস পরও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। ইতোমধ্যে অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে গেছেন।
সংবাদপত্রের অফিসে হামলা হলে ক্ষতি শুধু একটি কর্মস্থলের হয় না। সেখানে থাকা সংবাদ, নথি, যন্ত্রপাতি আর কাজের পরিবেশও আক্রান্ত হয়। তার চেয়েও বড় ক্ষতি, সাংবাদিকদের মনে ভয় ঢুকে যায়। পরদিন কোন খবরটি করবেন, তা তখন নিরাপত্তার হিসাব কষে ঠিক করতে হয়।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গোড়ার সমস্যাটা এখানেই। সাংবাদিককে রাজনীতিবিদরা স্বাধীন পেশাজীবী হিসেবে দেখতে পারেন না। দলের পক্ষে লিখলে তিনি ভালো, সমালোচনা করলে খারাপ। কোনো খবর অপছন্দ হলে তথ্য নিয়ে কথা বলার বদলে খোঁজা হয় সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয়। ধানমন্ডির ঘটনায় সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান শিশিরকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ বলা হয়েছিল। রাজশাহীর ঘটনাতেও সাংবাদিকদের রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠেছে।
এতে সাংবাদিকতার কাজটাই সন্দেহের চোখে পড়ে যায়। অথচ সাংবাদিক কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নন, কোনো দলের হয়ে মাঠেও নামেননি। তিনি যা দেখেন তা নথিবদ্ধ করেন, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করেন, আর যা ঘটছে তা পাঠককে জানান।
এ কাজ কারও পছন্দ না–ও হতে পারে। কোনো প্রতিবেদন ভুল মনে হলে প্রতিবাদ করা যায়, তথ্যের ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায়, দরকার হলে আদালতেও যাওয়া যায়। কিন্তু তার বদলে এখানে সাংবাদিককে মারধর করা, হুমকি দেওয়া কিংবা মামলা দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা শুধু সাংবাদিকদের বিষয় নয়। মানুষ কী জানবে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে মত গড়বে, ক্ষমতাবানদের কীভাবে জবাবদিহির মধ্যে রাখবে, সবকিছুর সঙ্গে এর সরাসরি যোগ আছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে কাজটা খুব কঠিনও নয়। নিজেদের কর্মীদের তাদের বোঝাতে হবে, সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়ে দলের ভাবমূর্তি বাঁচানো যায় না। এমন ঘটনা ঘটলে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াই দলের জন্য বেশি জরুরি।
কারণ, হামলার পর একটি বিবৃতি দিয়ে দায় সারলে সাংবাদিকদের ভয় কাটে না। উল্টো তারা বুঝে যান, পরের বারও একই ঘটনা ঘটতে পারে।
সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক সমীকরণও বদলেছে। কিন্তু সাংবাদিককে প্রতিপক্ষ ভাবার অভ্যাস কি বদলেছে? বাস্তবতা বলে বদলায়নি।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোনো দলের অনুগ্রহের ব্যাপার নয়। একজন সাংবাদিককে কাজ করার মতো নিরাপদ পরিবেশ দিতে না পারলে ক্ষতি শুধু সাংবাদিকতার হয় না, গণতন্ত্রও দুর্বল হয়।
দল বদলাবে, সরকারও বদলাবে। কিন্তু সাংবাদিকের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে অবস্থান যদি একই থেকে যায়, তাহলে পরিবর্তনটা আসলে কোথায়?
মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও যোগাযোগ পেশাজীবী।
abdulla180395@gmail.com