ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টিকা বা ভ্যাকসিন কতটা কার্যকরী
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। বাংলাদেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব অনেক আগে থেকেই। প্রায় প্রতি বছরেই কমবেশি ডেঙ্গুজ্বর হয়ে থাকে।
এই শতাব্দীর শুরুতে ২০০০ সালে ডেঙ্গুজ্বর বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সবার নজরে আসে। মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা আর অনেক মৃত্যু সাধারণ জনগণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ডেঙ্গুজ্বর বলতে অনেকেই নিশ্চিত মৃত্যু মনে করতে থাকে। শুরু হয় রক্ত ও প্লাটিলেট দেওয়া আর এন্টিবডি পরীক্ষার হিড়িক।
চলতি বছর সারা দেশে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু রোগের পরিস্থিতি ভয়াবহতার আভাস দিচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে রাজধানীসহ সারা দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টির ধরন পালটে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়নসহ নানা কারণে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল এবং প্রাইভেট ক্লিনিকে অসংখ্য রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে, এমনকি অনেক রোগী ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমবেশি সারা বছর চলছে এবং আমরা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছি। ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়, আমরা ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়ছি। তবে ২০১৯, ২০২০, ২০২১, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ থেকে এর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে টিকা বা ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা। ডেঙ্গুজ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, নেই কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও। টিকা বা ভ্যাকসিনই ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকরী ব্যবস্থা। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, করোনা মহামারি শুরুর মাত্র এক বছরের মাথায় আমরা এর টিকা পেয়ে গেলাম। সারা বিশ্বের মানুষই করোনা টিকার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডেঙ্গু এত বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রকোপ ছড়ালেও কেন এখনো এর টিকা সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া অনেকেই জানতে চায়, আমাদের দেশে ডেঙ্গুর কোনো টিকা দেওয়া হয় কি না বা আসলেই অতি দ্রুত সময়ে টিকা দেওয়া হবে কিনা।
আসলে ডেঙ্গুর টিকা যে একেবারে নেই তা নয়।ডেঙ্গু ভাইরাসে চার ধরনের সেরোটাইপ রয়েছে, ডেন ১, ২, ৩ ও ৪। ইতোপূর্বে এমন কোনো কার্যকরী টিকা বা ভ্যাকসিন বের হয়নি, যা এই চারটা সেরোটাইপের বিপক্ষেই কাজ করবে। যদিও ডেঙ্গুর টিকা তৈরি করতে অনেক বছর ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দুটি টিকা কিন্তু বের হয়েছে, ডেংভ্যাক্সিয়া এবং কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন।
ডেংভ্যাক্সিয়া: এই টিকাটি বের করেছে ফ্রান্সের একটি ওষুধ কোম্পানি। টিকাটির প্রয়োগে শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু সেল মেডিয়েটেড ইমিউনিটি তৈরি হয়না। ফলে এই টিকাটি নেওয়ার পরে ডেঙ্গু ভাইরাসে সংক্রমিত হলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এর কারণ পরিষ্কার নয়, তবে এই ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াকে বলে এন্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহান্সমেন্ট।
এই টিকার তিনটা ডোজ দিতে হয় ছয় মাস পরপর। টিকাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাধারণত ৯ থেকে ১৬ বছরের বাচ্চাদের দেওয়া হয়, অর্থাৎ ৯ বছরের নিচে এবং ১৬ বছরের ওপরে কেউ এই টিকা নিতে পারবে না। এছাড়া এই টিকা সবাইকে দেওয়া যায় না। যাদের একবারও ডেঙ্গু হয়নি, তাদের এই টিকা দেওয়া যাবে না। যাদের রক্ত টেস্ট করে ডেঙ্গু পজিটিভ এন্টিবডি পাওয়া যায় বা আগে কখনো ডেঙ্গু হয়েছিল, এমন মানুষদেরই টিকাটি দেওয়া যায়।
আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হলে এবং ভুলক্রমে তাকে এই টিকা দেওয়া হলে মারাত্মক জটিলতার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই যারা পূর্বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়নি তাদের জন্য এই টিকাটি নিরাপদ নয়। কম বয়সী শিশু ও যাদের পূর্বে ডেঙ্গু হয়নি তাদের এই টিকা দিলে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এর কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহের কথা শোনা যায়। কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণে তা নিয়ে জনমনে শঙ্কা রয়েছে।
কিউডেঙ্গা: এই টিকাটি জাপানের একটি কোম্পানির তৈরি। টিকাটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকুক বা না থাকুক, উভয় ক্ষেত্রেই এটি দেওয়া যায়। টিকা দেওয়ার আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ৪ চার বছর বয়সী শিশু থেকে ৬০ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ টিকাটি নিতে পারবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ইতোমধ্যে টিকাটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। দুটি ডোজ দিতে হয় তিন মাস পরপর। এই টিকা ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকরী বলে প্রমাণিত। শুধু তাই নয়, কিউডেঙ্গার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া খুবই কম।
পৃথিবীর প্রায় ২০টা দেশে টিকাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়াতে কিউডেঙ্গা টিকাটি প্রচুর পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে। কিউডেঙ্গা টিকাটি চার বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয় প্রায় ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই। এই টিকা একদিকে ৭০ ভাগ কার্যকরী এবং যারা এটি একবার গ্রহণ করে, তাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে ৯০ ভাগ রোগীকে হাসপাতালে যেতে হয়না।
ডেংভ্যাক্সিয়া এখনো স্বীকৃতি পায়নি ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের, তবে কিউডেঙ্গার অনুমোদন দিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন।
আমাদের দেশে অনেকেই কিউডেঙ্গা টিকা ব্যবহারের পক্ষপাতী, বিশেষ করে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের একটি বড় অংশ শিশু ও কিশোর। তাই ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের ডেঙ্গুর সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য টিকা দেওয়া উচিত বলে অনেকে মনে করেন।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। অনেক দেশে টিকাটি ব্যবহৃত হচ্ছে, যদি ফলাফলটা ইতিবাচক, কার্যকরী ও ভালো হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের দেশেও এই টিকা দেওয়ার বিষয়টি চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।
সম্প্রতি একটি খবরে জানা যায়, ডেঙ্গু মোকাবেলায় নতুন একটি ঢাল পেতে যাচ্ছে ভারত। কিউডেঙ্গা ভারতে বাজারজাত ও বিতরণের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করেছে ডক্টর রেড্ডিস ল্যাবরেটরি। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ডেঙ্গুর নিশ্চিত সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাটি কার্যকারিতা দেখিয়েছে।
দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার এক বছর পর নিশ্চিত ডেঙ্গু সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা ছিল ৮০.২ শতাংশ, আর ১৮ মাস পর ডেঙ্গুর কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ৯০.৪ শতাংশ। ভারতের ঔষধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা চলতি বছরের জুলাইয়ে কিউডেঙ্গার অনুমোদন দিয়েছে। তবে বাজারে আসার আগে আরও কিছু নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ডেঙ্গুর আরেকটা টিকা আছে ‘টেট্রাভালেন’ নামের, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের আবিষ্কার করা ডেঙ্গু টিকার দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চালিয়েছিল আইসিডিডিআরবি,র গবেষকরা। ওই টিকার নাম টিভি০০৫। যেটার পরীক্ষা প্রথম দুই ধাপ শেষ হয়েছে এবং সফলতা পেয়েছে। পরবর্তী ধাপগুলোর পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা চলছে।
এই টিকার সুবিধা হলো একটি ডোজ নিলেই ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকরী হবে। শিশুসহ যেকোনো বয়সের মানুষের জন্যই টিকাটি কার্যকরী। ভারতেও এই টিকার পরীক্ষা চলছে।
মনে রাখতে হবে যতদিন কার্যকরী টিকা আমরা না পাই, ততদিন ডেঙ্গু থেকে নিরাপদে থাকতে আমাদের প্রতিকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করাটাই আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাস্তবতা হলো ডেঙ্গু শুধু আর শহরকেন্দ্রিক রোগ নয়, সারা দেশে গ্রামগঞ্জে বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়ছে কম বেশি। সুতরাং আমাদের সবাইকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি টেকসই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বাস্তব সম্মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জনসাধারণকেও এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ডেঙ্গু সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে।