মানসিকতায় অজেয়, কৌশলে নির্ভুল
নাজমুল হোসেন শান্ত মোস্ট ভ্যালুয়েবল বাংলাদেশি প্লেয়ার হিসেবে পাওয়া ইলেকট্রিক বাইক নিয়ে ছুটলেন মাঠের চারপাশে; আনন্দে চিৎকার করে অনেকটা যেন উড়তে চাইলেন তিনি। বাইক নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে যেতে চাইলেও পরে অবশ্য উদযাপনের তীব্রতা কমিয়ে স্থির হলেন। ‘আরে ভাই, শেষ দিকে তো টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম। সেজন্য একটু বেশি আনন্দ লাগছে।’
১০ দিন ধরে কোয়ালিটি ক্রিকেট খেলা, ধৈর্য রাখা, মানসিকতার প্রবল পরীক্ষায় জেতা—সব মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে উত্তরণের পথে এক পা এগোনার তৃপ্তি ধরা দিল তার কণ্ঠে।
২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে গিয়ে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার পর এবার ঘরের মাঠেও একই দাপট, একই ফল। প্রথম কোনো টেস্ট দল হিসেবে পাকিস্তানকে হোম ও অ্যাওয়েতে হোয়াইটওয়াশ করার অর্জন ধরা দিল। স্বাভাবিকভাবেই টেস্টে পাকিস্তানের চেয়ে স্পষ্ট এগিয়ে যাওয়ার প্রমাণ দেখিয়ে র্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবার সাতে উঠে এল বাংলাদেশ।

টেস্টে কন্ডিশন অনেক বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে; রাওয়ালপিন্ডিতে দুই জয়ের পেছনে টস জেতাকেও অনেকে বড় সুবিধা হিসেবে দেখছিলেন। এবার মজার ব্যাপার হলো, দুই টেস্টেই টস হেরে ম্যাচ জিতে দেখিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ কঠিন পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ নিয়ে দক্ষতা ও কৌশলে উঁচু মান দেখানো গেছে।
টেস্টে ব্যাটে-বলে খেলার বাইরেও থাকে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে বাংলাদেশ সেখানেও দেখিয়েছে দাপট। এক বিন্দু ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা ছিল স্পষ্ট। একজন তো মজা করেই বলছিলেন, এই সিরিজের সেরা হচ্ছে ‘স্টাম্প মাইক’। স্টাম্প মাইকের সৌজন্যেই তো জানা গেল লড়াইয়ের ভেতরে আরও কত লড়াই।
এসব লড়াইয়ে জেতার পেছনে সব পজিশনে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো ক্রিকেটার থাকাকেই কারণ মনে করেন শান্ত, ‘আমরাও এখন জবাব দিতে পারছি, আস্তে আস্তে। ওই জায়গাটা থেকে যখন এই ব্যাটেলগুলো হয়, তখন আমি বলব যে আমরা একটু এগিয়ে থাকি। কারণ আমাদের হাতে ওই ধরনের অস্ত্র আছে; আমরা বোলিং বা ফিল্ড প্লেসমেন্ট করে ওই অ্যাটাকটা ওদেরকে করতে পারি। পাশাপাশি টেস্ট ক্রিকেটে এই জিনিসগুলো হয়, এটাই আসলে সৌন্দর্য। কাজেই ওই জায়গাটাতে, ওই মোমেন্টগুলোতে যারা মেন্টালি জিতবে, আমার মনে হয় তখন বোলাররা বাড়তি একটা সুবিধা পায়।’
গোটা সিরিজে বাংলাদেশ ক্রিকেটীয় মুন্সিয়ানা ও মস্তিষ্কের ব্যবহারে নিখাদ থেকেই তফাৎ গড়েছে। নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদদের গতি ও স্কিলের কাছে পিছিয়ে ছিল পাকিস্তানের পেস আক্রমণ। স্পিন বিভাগে তো ফারাক আরও বেশি।
ব্যাটিংয়ের দিক থেকেও প্রয়োজনের সময়ে বাংলাদেশের জ্বলে ওঠা পারফর্মার ছিল বেশি। প্রথম টেস্টে যেমন দুই ইনিংসেই সফরকারীদের ভুগিয়েছেন শান্ত, রানে ছিলেন মুমিনুল হক। দ্বিতীয় টেস্টের চরম বিপদে দাঁড়িয়ে গেছেন লিটন দাস। অভিজ্ঞ মোস্তাফিজুর রহমান তার দায়িত্বটা বুঝে নিয়েছেন ঠিকঠাক।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বিগত চক্রে সাতে শেষ করেছিল বাংলাদেশ। এবারও সাতের নিচে নামার সম্ভাবনা কম। পাকিস্তানকে সিরিজে হারানোর পর টেবিলে পাঁচে ওঠা গেছে আপাতত। আরও অনেকগুলো খেলা বাকি থাকায় এই অবস্থান হয়তো ধরে রাখা কঠিন। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের উপরে টেস্টে জায়গা করে নেওয়াটা এক ধাপ উত্তরণ।
বাংলাদেশ অধিনায়কের চোখ এখন এই উন্নতির ধারা ধরে রেখে এগিয়ে চলার দিকে। বিশ্বের সেরা টেস্ট দলগুলোর সঙ্গে বেশি করে খেলা ও আরও কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে নিজেদের বাস্তবতা যাচাই করতে চান তিনি, ‘গত দুই-তিন বছর ধরে আমরা ধীরে ধীরে উন্নতি করছি। আমি বলব, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে আমি সবসময়ই বলে আসছি, আমাদের উন্নতির আরও অনেক জায়গা আছে। সব মিলিয়ে বলতে গেলে, আমরা এখন বেশ ভালো অবস্থানে আছি এবং সঠিক পথেই এগোচ্ছি।’
‘এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধারাবাহিকতা আমরা কীভাবে ধরে রাখি এবং এই সময়ে আমরা কীভাবে আরও ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি। বিশেষ করে সামনে আমাদের দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলা রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জের মুখে আমরা কতটা প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলতে পারি, সেটিই এখন বড় বিষয়। ম্যাচ জেতা বা হারার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পাঁচ দিন লড়াই করার মানসিকতা ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলা। অধিনায়ক হিসেবে আমি সবসময় চিন্তা করি, কীভাবে এই উন্নতি অব্যাহত রাখা যায়।’