চট্টগ্রামের ক্রিকেট কার্যত থমকে আছে

সামসুল আরেফীন খান
সামসুল আরেফীন খান

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের নিয়মিত ভেন্যু এবং চলমান বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টি-টোয়েন্টি সিরিজের আয়োজক চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম প্রধান ক্রিকেট কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় দর্শকেরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক ম্যাচ উপভোগের সুযোগ পেলেও, বন্দরনগরীর ক্রিকেট সংস্কৃতির প্রাণ থাকা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাগুলোর রেশ এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার বাইরে খুব কম জেলাই নিয়মিত ঘরোয়া লিগ চালু রাখতে পেরেছিল। কিন্তু আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আফতাব আহমেদ, নাফীস ইকবাল, তামিম ইকবাল ও মুমিনুল হকের মতো তারকা ক্রিকেটারদের গড়ে তোলা চট্টগ্রাম ছিল এদিক থেকে ব্যতিক্রম। দশকের পর দশক ধরে শহরটি সফলভাবে নিজস্ব প্রিমিয়ার লিগ ও নিচের স্তরের প্রতিযোগিতা আয়োজন করে আসছিল নিরবচ্ছিন্নভাবে। তবে সেই ঐতিহ্য এখন থেমে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে চট্টগ্রামের ক্রিকেট কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এ বছর শহরের প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন করা যায়নি। এমনকি দ্বিতীয় বিভাগ লিগ, যা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মাঝপথে বন্ধ হয়েছিল, তাও এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু এখনো পুনরায় শুরু হয়নি।

যদিও এ বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার অংশগ্রহণে একটি আঞ্চলিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, সেটি স্থানীয় খেলোয়াড়, আয়োজক ও সমর্থকদের ক্ষুধা মেটাতে পারেনি।

শহরের ক্রিকেট অঙ্গনের সঙ্গে যুক্তদের মতে, সাবেক জেলা প্রশাসক ও ক্লাব কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন ক্রিকেট কার্যক্রম বন্ধের বড় কারণ। সরকার পরিবর্তনের পর জেলা ক্রীড়া সংস্থার পুরনো কমিটি বিলুপ্ত হওয়া এবং বর্তমান অ্যাড-হক কমিটির নিষ্ক্রিয়তাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এক ক্লাব কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'আগের ডিসি সাহেবের খেলাধুলায় তেমন আগ্রহ ছিল না। ক্লাবগুলো লিগগুলো পুনরায় চালুর জন্য অনুরোধ করলেও তিনি তেমন গুরুত্ব দেননি।'

খেলা বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রিকেটাররাই—অনেকে এখন মারাত্মক আর্থিক সংকটে ভুগছেন। বন্দর স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে শেষ প্রিমিয়ার লিগে খেলা ও ঢাকার লিগেও নিয়মিত অংশ নেওয়া উইকেটকিপার-ব্যাটার জসিম উদ্দিন বলেন, 'খেলোয়াড়দের বড় আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। চট্টগ্রামে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক ঢাকার চেয়ে ভালো—শীর্ষ খেলোয়াড়রা মাত্র ১২ ম্যাচের জন্য ৯-১০ লাখ টাকা পান। এত বড় ক্ষতি স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য ভয়াবহ।'

তিনি আরও বলেন, 'ইরফান শুক্কুর, ইয়াসির আলীর মতো খেলোয়াড়রাও এখানে খেলে। প্রিমিয়ার লিগে ১২টি দলের হয়ে প্রায় ২৪০ জন ক্রিকেটার খেলে, নিচের বিভাগগুলোয় আরও অনেকে। ৫ আগস্টের পর আর্থিক সমস্যার কারণে কয়েকজন ক্লাব কর্মকর্তা পর্যন্ত লুকিয়ে ছিলেন।'

এখন শহরের ক্রিকেট পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ চলছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সহায়তায় চট্টগ্রামের ক্লাব কর্মকর্তারা বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। সে লক্ষ্যে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল আজ চট্টগ্রাম সফরে যাচ্ছেন।

বুলবুল এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে মেয়র চ্যালেঞ্জ কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনে যোগ দেবেন এবং এ সময় তিনি জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করে সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের দুই পরিবাচালকের একজন ও স্থানীয় অভিজ্ঞ সংগঠক আহসান ইকবাল চৌধুরী বুলবুলের সফর নিয়ে আশাবাদী। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা আশা করছি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে। আমার প্রথম লক্ষ্য জেলা ক্লাব ক্রিকেট চালু করা এবং জানুয়ারিতে প্রিমিয়ার লিগ শুরু করা। আমাদের এখন আম্পায়ার ও কোচের ঘাটতি আছে, তাই বোর্ডকে অনুরোধ করেছি চট্টগ্রামে তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করতে।'

তিনি আরও বলেন, 'আমাদের পুরো বিভাগে ক্রিকেট পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। দশটি জেলার প্রতিটিতে লিগ চালু করা দরকার। নোয়াখালীতে তো একটি ঠিকঠাক ক্রিকেট মাঠও নেই, অন্য জেলাগুলোরও অবকাঠামো নেই। চট্টগ্রামের বাইরে শুধু কক্সবাজারে একটি লিগ হয়—যেটাকে ওরা মজা করে "বিশ্বকাপ" বলে, কারণ চার বছর পরপর একবার হয়।'

'লিগগুলো পুনরায় শুরু করার আগে আমাদের মৌলিক অবকাঠামো ও অনুশীলন সুবিধা তৈরি করতে হবে, না হলে টেকসই উন্নতি সম্ভব নয়।'

যদিও চট্টগ্রামে অন্যান্য জেলার মতো মাঠসংকট নেই, এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বয় ও আস্থা ফিরিয়ে আনা। শহরটি আবার ক্রিকেটের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, সেটিই এখন প্রশ্ন।