নারী ক্রিকেটারদের বেতন বাড়লেও সমতা এখনো অনেক দূরে

সামসুল আরেফীন খান
সামসুল আরেফীন খান

মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক তীব্র বৈপরীত্য। পার্কিং লটে সারি সারি ঝকঝকে গাড়ি — অধিকাংশই পুরুষ ক্রিকেটার, বোর্ড পরিচালক, কোচ ও কর্মকর্তাদের মালিকানাধীন। তার মধ্যে নারীদের ক্রিকেটারদের গাড়ির উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য। এই দৃশ্যই বাস্তবতাকে এমনভাবে তুলে ধরে, যা কোনো পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি জোরালো।

বছরের পর বছর দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেও বেশিরভাগ নারী ক্রিকেটার এখনো সেই আরামের জীবনযাপন করতে পারেন না, যা তাদের পুরুষ সহকর্মীদের কাছে বেশ স্বাভাবিক ও প্রাপ্য বলে মনে হয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নারী ক্রিকেটারদের বেতনে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি ঘোষণা করেছে এবং তাদের দৈনিক ভাতা ও সফর খরচ পুরুষ দলের সমান করেছে। চারটি ক্যাটাগরির খেলোয়াড় এখন মাসে ৮০,০০০ থেকে ১,৬০,০০০ টাকা পর্যন্ত পাবেন। এছাড়া, বিসিবি নারী ক্রিকেটারদের কেন্দ্রীয় চুক্তির তালিকা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করেছে, যদিও তাদের মাসিক বেতন আগের মতোই ৩০,০০০ টাকা রয়ে গেছে। অন্যদিকে, ২১ জন পুরুষ ক্রিকেটার কেন্দ্রীয় চুক্তির আওতায় মাসে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পান, এবং আরও ১০০ জন প্রথম শ্রেণির খেলোয়াড় পান ৩০,০০০–৪০,০০০ টাকা।

বেতনের বৈষম্য শুধু বাংলাদেশের নয়, তবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড ইতিমধ্যেই পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের সমান ম্যাচ ফি কার্যকর করেছে। বাংলাদেশে যেখানে পুরুষরা আন্তর্জাতিক ম্যাচপ্রতি ২ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত পান, নারীরা পান মাত্র ৫০,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা।

হাইলাটস 

  • বর্তমানে বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে রয়েছে ২১ জন পুরুষ ও ১৫ জন নারী ক্রিকেটার। সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির পুরুষ ক্রিকেটাররা যেখানে মাসে পান ১০ লাখ টাকা। নারীদের বেলায় একই ক্যাটাগরির ক্রিকেটার বেতন বাড়ার পরও পান ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
  • ঘরোয়া ক্রিকেটে ১০০ জন পুরুষ ক্রিকেটারের জন্য তিনটি শ্রেণি (এ, বি, ও সি) নির্ধারিত রয়েছে — যেখানে মাসিক বেতন যথাক্রমে ৪০,০০০, ৩৫,০০০ ও ৩০,০০০ টাকা। কিন্তু ৩৫ জন নারী ক্রিকেটারকে কোনো শ্রেণিতে ভাগ করা হয়নি, এবং প্রত্যেকে পান মাসে ৩০,০০০ টাকা করে।
  • সাম্প্রতিক এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে পুরুষ ক্রিকেটাররা ম্যাচ ফি হিসেবে পেয়েছেন ৪০,০০০ টাকা, অথচ গত নারীদের এনসিএলে খেলোয়াড়রা পেয়েছেন মাত্র ৩,০০০ টাকা।
  • সম্প্রতি বিসিবি পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের দৈনিক ভাতা ও সফর খরচ সমান করেছে। এখন থেকে দুজনেই আন্তর্জাতিক দায়িত্বের সময় প্রতিদিন ৭৫ মার্কিন ডলার ভাতা এবং ৫০ মার্কিন ডলার সফর খরচ পাবেন, তবে তা আইসিসি ও এসিসি ইভেন্ট ব্যতীত।
  • গত বছরের নারী ডিপিএলে অনেক নারী ক্রিকেটারই তাদের ক্লাবের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিক পাননি। কিছু শীর্ষ খেলোয়াড় ৯-১০ লাখ টাকার মতো আয় করলেও, অনেকেই মাত্র ২০-৩০ হাজার টাকায় খেলেছেন বলে জানা যায়।

বিসিবি যে অগ্রগতি দেখিয়েছে, তা প্রশংসনীয় — কিন্তু এখনো তা আদর্শ নয়। নারীদের ক্রিকেট কমিটির প্রধান ও সাবেক জাতীয় স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তারা 'ধীরে ধীরে ম্যাচ ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।'

তবু অনেক খেলোয়াড়ের জন্য বেঁচে থাকাটাই এখনো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কেউ কেউ কেন্দ্রীয় চুক্তি হারানোর পর ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছেন। এক খেলোয়াড় বলেন, তার আয় 'টিকে থাকার জন্য খুব কষ্টের।'

সীমিত ম্যাচ সুযোগ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তিনি বলেন, 'দেশীয় ক্রিকেটে তো অবস্থা আরও খারাপ — পুরুষরা এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে ম্যাচপ্রতি ৪০,০০০ টাকা পেয়েছে, আমরা গত বছর পেয়েছি ৩,০০০ টাকা।'

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট এখনো পুরুষদের ছায়াতেই পরিচালিত হয়। মাঠ, সুবিধা ও সূচি প্রায়ই নির্ধারিত হয় পুরুষ দলের প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর। অথচ এই সীমিত সুযোগের মধ্যেও তারা ২০১৮ সালে দেশকে এনে দিয়েছিল প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি — এশিয়া কাপের শিরোপা।

এরপরের সময়ে সেই আসরের রানার্স-আপ ভারত জয় করেছে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ, আর বাংলাদেশের 'টাইগ্রেসরা' এখনো সংগ্রামের পথে — সুযোগ, স্বীকৃতি ও প্রাপ্য সম্মানের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।