'মোস্তাফিজের বিশেষ দক্ষতাই এই চাহিদা তৈরি করেছে'

আব্দুল্লাহ আল মেহেদী

দীর্ঘদিন ধরেই একটি ধারণা প্রচলিত যে, ২০১৬ সালে কাঁধে অস্ত্রোপচারের পর মোস্তাফিজুর রহমান আর আগের মতো নেই।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম বছরে বাঁহাতি এই পেসার সবাইকে বোকা বানিয়ে দিয়েছিলেন। তবে নতুনত্বের চমক কেটে যাওয়া এবং অস্ত্রোপচারের কারণে তার অনন্য দক্ষতা কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কার্যকারিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

তবুও এখন ৩০ বছর বয়সী মোস্তাফিজুর রহমান বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন ক্রিকেটার হিসেবেই রয়ে গেছেন। এর প্রমাণ মিলেছে চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার, যখন কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) তাকে ৯.২ কোটি রুপিতে দলে টেনে নেয়, আইপিএলে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের জন্য এটিই সর্বোচ্চ দর।

এ বছরের আইপিএল মিনি-নিলামে আরও ছয়জন বাংলাদেশি ক্রিকেটারের নাম ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন রিশাদ হোসেন, যিনি গত ১২ মাসে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টাইগারদের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি এবং বর্তমানে বিগ ব্যাশ লিগে নিজের প্রথম মৌসুমে হোবার্ট হারিকেন্সের হয়ে খেলছেন।

এই তালিকায় ছিলেন পেসার তাসকিন আহমেদও। একই সময়ে মোস্তাফিজের চেয়ে তিনটি বেশি উইকেট নিয়েছেন তিনি, পাশাপাশি তার স্ট্রাইক রেটও ছিল অনেক ভালো -১১.৬, যেখানে বাঁহাতি এই পেসারের স্ট্রাইক রেট ১৭.৩।

তারপরও নিলামে আগ্রহ কাড়তে পেরেছেন একমাত্র মোস্তাফিজুর রহমানই। তাহলে বাকিদের থেকে তাকে আলাদা করে কী?

বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলের মতে, তার অনন্য অস্ত্র স্লোয়ার ও কাটার। এবং আইপিএলের উইকেটে প্রমাণিত সাফল্যই কেকেআরের কাছ থেকে এত বড় অঙ্কের প্রস্তাব এনে দিয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টারকে আশরাফুল বলেন, 'তার একটা বিশেষ দক্ষতা আছে, এটা স্পষ্ট। আর সেটাই এই চাহিদা তৈরি করে। সে আলাদা, এবং বলা যায়, তার মতো বোলার বিশ্বে আর নেই।'

'আমি নিজে মুত্তিয়া মুরালিধরনের বিপক্ষে খেলেছি, তিনি একজন ডানহাতি অফস্পিনার। মোস্তাফিজ যদিও একজন ফাস্ট বোলার, তবু সে বলের ওপর মুরালির মতোই অনেক রেভোলিউশন তৈরি করে… তাকে খেলা খুবই কঠিন, আর উইকেটে যদি সামান্য সহায়তাও থাকে, তাহলে বল গ্রিপ করায় কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়,' যোগ করেন তিনি।

২০১৬ সালে আইপিএলে অভিষেক হওয়া মোস্তাফিজ এ পর্যন্ত লিগের আট মৌসুমে পাঁচটি ভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছেন। শেষ পাঁচ মৌসুমে তিনি ৩৬ ম্যাচে নিয়েছেন ৪১টি উইকেট।

গত ১২ মাসে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার ইকোনমি রেট মাত্র ৬.০৯। আর আগের আইপিএল মৌসুমে দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে খেলা তিন ম্যাচে তিনি প্রতি ওভারে আট রানেরও কম দিয়েছেন।

আশরাফুল বলেন, 'যেহেতু ম্যাচগুলো ভারতীয় উইকেটে হয়, আমরা দেখি হাই-স্কোরিং গেম, ২৮০ রানের মতো স্কোর হচ্ছে, আবার সেগুলো তাড়া করেও জেতা হচ্ছে। এমন ম্যাচগুলোতে মোস্তাফিজই অনেক সময় পার্থক্য গড়ে দেয়।'

'একটি মৌসুমে ১৪ ম্যাচের মধ্যে অন্তত ৫–৬টি ম্যাচ এমন উইকেটে হয়, যেখানে মোস্তাফিজ একাই একটি দলকে হারিয়ে দিতে পারে। তাই যে খেলোয়াড় এটা পারে, সে সব সময়ই চাহিদায় থাকবে,' বলেন তিনি।

তবে আইপিএলে পুরো সময়ের জন্য মুস্তাফিজ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে পূর্ণ এনওসি পাচ্ছেন না। ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ফাহিমের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের জন্য আইপিএলের মাঝপথে তাকে ৮–১০ দিনের জন্য বাংলাদেশে ফিরতে হবে।

আশরাফুল মনে করেন, আইপিএলে নিজেকে মেলে ধরার জন্য বোর্ডের উচিত মোস্তাফিজকে যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে তিনি আক্ষেপ করেন, মোস্তাফিজের মতো অনন্য দক্ষতার খেলোয়াড়রা কীভাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে উপেক্ষিত হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, 'আমাদের এমন খেলোয়াড় আছে যারা আলাদা, কিন্তু শুধু অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের তৈরি করা যায় না, তারা যথেষ্ট ম্যাচ খেলছে না। চট্টগ্রামে খেলতে গেলে নেটে অনেক ধরনের প্রতিভা দেখা যায়, কিন্তু তারা খেলতে পারে না। আমি এখনও বুঝতে পারি না, এই প্রতিভাগুলো আসলে কীভাবে সামনে আসবে।'