জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ?

একুশ তাপাদার
একুশ তাপাদার

খেলা হবে—এই আশায় গুটিকয়েক দর্শক গ্যালারিতে বসে অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই তাদের বের করে দেন বিসিবির নিরাপত্তাকর্মীরা। এরপর ফাঁকা মাঠে শুরু হয় লাইট শো। তবে আলোর সেই ঝলকানির চেয়ে অন্ধকারের প্রাধান্যই যেন বেশি ফুটে উঠছিল। নজিরবিহীন এক অচলাবস্থায় বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন দেখল এক অন্ধকার দিন।

ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগেই ঘটনার সূত্রপাত। 'হোম অব ক্রিকেট'-এর আঙিনাতেই ক্রিকেটারদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। এরপর কয়েক ঘণ্টা দেশের ক্রিকেটে চলে চরম উত্তেজনা। রাতেই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) কঠোর অবস্থান নেয়। নাজমুল পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ক্রিকেটাররা মাঠে না নামার ঘোষণা দেন।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় শেষ ধাপের খেলা শুরুর প্রথম দিনেও অনড় থাকেন দেশের ক্রিকেটাররা। সারাদিন অপেক্ষার পর কোনো দলই মাঠে আসেনি। অগত্যা খেলা বাতিল করে ফিরে যেতে হয় সংশ্লিষ্টদের। দুপুর ১টায় যখন প্রথম ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা, ঠিক তখন নগরের অন্য প্রান্তে টিম হোটেলে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন ক্রিকেটাররা। সেই সংবাদ সম্মেলন শুরু হয় দুপুর আড়াইটায়।

পরে দেখা গেল, কেবল নাজমুল ইস্যু নয়, ক্রিকেটাররা আরও কয়েকটি বিষয় সামনে নিয়ে এসেছেন। যেগুলোর সমাধান না পেয়ে তাদের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। অনেকটা সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই যেন বহিঃপ্রকাশ ঘটল এদিন।

বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা সব ক্রিকেটার তো ছিলেনই, পাশাপাশি তিন সংস্করণের তিন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, মেহেদী হাসান মিরাজ ও লিটন দাস ছিলেন বেশ উচ্চকিত। কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন তাদের সিদ্ধান্ত তুলে ধরলেও আলাদা আলাদা ইস্যুতে কথা বলেছেন শীর্ষ তারকারা। এতে বর্তমান বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের দূরত্ব যে স্পষ্ট, তা বেরিয়ে এলো। এমন নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে আগে কোনো বোর্ডই পড়েনি। দূরত্বের ব্যাপারটা আরও বেরিয়ে আসে ক্রিকেটারদের এক তথ্যে। ক্রিকেটারদের আন্দোলনে যাওয়ার পুরো পরিস্থিতিতে একবারও যোগাযোগ করেননি বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। এমনকি ফোনও ধরেননি তিনি।

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে নতুন বোর্ড গঠিত হওয়ার পর ঢাকার ক্লাব সংগঠকদের সঙ্গে তৈরি হয় চরম বিরোধ। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রিকেটাররা। প্রথম বিভাগে ৮টি ক্লাব অংশ না নেওয়ায় রুটিরুজি বন্ধ হয়ে আছে বিপুল সংখ্যক ক্রিকেটারের। এমনকি আসন্ন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ হবে কি না, বা হলেও সব ক্লাব অংশ নেবে কি না—তা নিয়েও রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। বর্তমান বোর্ড এই সংকটের কোনো কার্যকর সমাধান করতে পারেনি।

মোহাম্মদ মিঠুন আক্ষেপ করে বলেন, সমাধানের আন্তরিকতাও তারা দেখতে পাচ্ছেন না। বোর্ডের একেকজন দায় চাপান আরেকজনের ওপর; এভাবেই চলতে থাকে স্থবিরতা। তিনি বলেন, 'একজন বলে উনাকে পাচ্ছি না, এই-সেই। অনেক ঘটনা ঘটে, কিন্তু প্লেয়ারদের কোনো সমস্যা সমাধান করতে গেলে কাউকে পাওয়া যায় না।'

নাজমুল হোসেন শান্ত নারী ক্রিকেটে সাম্প্রতিক হয়রানির ইস্যুটি তুলে ধরেন। নারী ক্রিকেটার জাহানারা আলম সাবেক নির্বাচক মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি কোনো প্রতিবেদন। শান্ত বলেন, 'আমরা সবাই আশা করেছিলাম যে দ্রুততার সঙ্গে সঠিক একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে সুষ্ঠু বিচার করা হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এই জিনিসটা বারবার পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। এই ঘটনার পরে আমি দেখেছি যে, অনেকে ফ্যামিলি থেকে বা নিজে থেকে আসার সাহস পাচ্ছে না। অথচ ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের অর্জন বেশি।'

নারী ক্রিকেটের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো নিয়ে কথা বলেন লিটন দাস। অন্যদিকে শামসুর রহমান শুভ তুলে ধরেন ফিক্সিং ইস্যু। ফিক্সিং সন্দেহে এবার বিপিএলের আগে ৯ জন ক্রিকেটারকে নিলাম থেকে বাদ দেওয়া হয়। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বিপিএল থেকে বাদ দিলেও অন্য ঘরোয়া লিগে খেলার জন্য তাঁদের বিবেচিত রাখা হয়েছে। বিষয়টিকে বিসিবি পরিষ্কার না করে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে বলে দাবি ক্রিকেটারদের।

বেশিরভাগ ক্রীড়া সংগঠকের বয়কটের মাঝে বর্তমান বোর্ড দায়িত্ব নেয় ৬ অক্টোবর। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তারা বিপিএলের পুরোনো বিতর্ক অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আগের বছরের অনিয়ম তদন্তে কমিটির রিপোর্টও আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো নতুন শুরুর কথা বললেও পুরোনো বিতর্কই ফিরে এসেছে। প্রথমে পাঁচটি দল নিয়ে বিপিএল আয়োজনের সিদ্ধান্ত হলেও পরে আরেকটি দল বাড়ানো হয়। অথচ টুর্নামেন্টের আগের দিন নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি সরে গেলে বিপাকে পড়ে বিসিবি; শেষ পর্যন্ত একটি দলের দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হয় তাদের।

এরই মধ্যে বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও ভেন্যু বদল নিয়ে আইসিসির সঙ্গে দর-কষাকষিতে বিপাকে আছে বোর্ড। যে মোস্তাফিজুর রহমানের 'সম্মান' রক্ষার কথা বলে ভেন্যু বদলের লড়াই করছে বিসিবি, সেই মোস্তাফিজুর রহমানও এদিন ক্রিকেটারদের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। খোদ বিসিবির পরিচালকের কটূক্তিতে নিজেদের সম্মানহানির প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন এই বাঁহাতি পেসার।

বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার আঁচও ক্রিকেটারদের প্রভাবিত করছে। কোয়াব নেতৃত্ব দুদিন আগে বলেছিল, 'নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই আগে, সেটা বিসিবি দেখবে। তবে বিশ্বকাপ না খেলার বিকল্প নেই। আমরা চাই দল যেন খেলতে যায়।'

সব মিলিয়ে এক গুমোট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালক নাজমুল ইসলাম, যিনি কিছুদিন আগে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে 'ভারতীয় দালাল' বলে কটূক্তি করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি বিসিবির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এর কোনো নিন্দাও জানানো হয়নি। পরে আরও একজন পরিচালকও বিতর্কিত মন্তব্য করতে থাকেন। পরিচালকদের লাগাম টেনে ধরতে পারেননি বিসিবি সভাপতি; বরং তাদের মন্তব্যকে 'ব্যক্তিগত মত' বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

এই সামগ্রিক অচলাবস্থায় নিশ্চিতভাবেই ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশের ক্রিকেট। প্রতিকূল আবহাওয়া ছাড়া অন্য কোনো কারণে বিপিএলের খেলা না হওয়া ব্রডকাস্টার ও স্পন্সরদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।