‘আমি পর্তুগিজ, তবে আমি সৌদি আরবের’— রোনালদোর অন্যরকম রাত
গোল করাটা পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর জন্য নিত্যদিনের সাধারণ এক অভ্যাস। কিন্তু নেফতচি ফারগানার বিপক্ষে আল-নাসরের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এলিটের ম্যাচে মাঠের বুকে ভেসে উঠল এক ভিন্ন আবেগ।
সোমবার রাতে রিয়াদে উজবেকিস্তানের ক্লাবটিকে ৩-১ গোলে হারায় রোনালদোর আল-নাসর। দারুণ এই জয়ে অবদান রেখে ম্যাচের ৪২তম মিনিটে জাল কাঁপান রোনালদো। পেশাদার ফুটবলে এক হাজার গোলের মাইলফলক ছোঁয়ার অনন্য কীর্তির দিকে ছুটতে থাকা এই ফরোয়ার্ডের এটি ৯৮১তম গোল।
ম্যাচটি শুরু হওয়ার আগে ও শেষ হওয়ার পর ভালোবাসার এক অকৃত্রিম ছবি আঁকেন রোনালদো। কিক-অফের আগে সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরের জার্সির পেছনের অংশে থাকা দেশটির জাতীয় প্রতীক— একটি খেজুর গাছ ও দুটি তলোয়ারের খোদাই করা অংশে ভক্তিভরে চুমু খেতে দেখা যায় তাকে। আর শেষ বাঁশি বাজার পর তিনি হাতে তুলে নেন সৌদি পতাকা সংবলিত একটি স্কার্ফ। সেটা কাঁধে জড়িয়ে তিনি দলের জয় উদযাপনে মেতে ওঠেন ভক্ত-সমর্থকদের সাথে। এই বিশেষ মুহূর্তগুলোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে।
এক্সে রোনালদোর উদযাপনের একটি ভিডিও পোস্ট করে আল-নাসরের আরবি ভাষার অ্যাকাউন্ট থেকে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আমি পর্তুগিজ, তবে আমি সৌদি আরবের।’ এটি মূলত ২০২৫ সালের জুনে চুক্তি নবায়নের সময় রোনালদোর একটি স্মরণীয় উক্তি, যা নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। আর ইংরেজি ভাষার অ্যাকাউন্টে রোনালদোর একটি ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘সৌদির এক টুকরো, যা হৃদয়ের খুব কাছে রাখা।’
অথচ এই ঝলমলে রাতের আবহটা একদম সহজ ছিল না। রিয়াদে ইয়েমেনভিত্তিক হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কার কারণে পুরো শহরে জারি করা হয়েছিল বিশেষ সতর্কতা। নিরাপত্তার ঝুঁকি কাটিয়ে ম্যাচটি মাঠে গড়াতে এক ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। চারপাশের থমথমে পরিবেশের মাঝেই শেষ পর্যন্ত দুই দল ফুটবলের লড়াই ছড়াতে নামে।
প্রথমার্ধের ৩৩তম মিনিটে আল-নাসরকে এগিয়ে দেন অ্যাঞ্জেলো গ্যাব্রিয়েল। নয় মিনিট পর নিখুঁত নিপুণতায় বল জালে পাঠান রোনালদো। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে প্রতিপক্ষ একটি গোল শোধ করলেও ৭৮তম মিনিটে আত্মঘাতী গোলে জয় নিশ্চিত হয় আল-নাসরের। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এলিটের চলমান আসরে দুই ম্যাচ খেলে এটি তাদের প্রথম জয়।
এই রোমাঞ্চকর রাতের আড়ালে পর্তুগাল জাতীয় দলে ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জন স্তিমিত হয়ে যায়নি। গত সেপ্টেম্বরে কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ায় জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে রিয়াদে চলে আসেন তিনি। বিতর্কিত ওই ঘটনার পর দেশটির ফুটবল ফেডারেশন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করার পাশাপাশি তাকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
তবে মেঘ কেটে গিয়ে ইতোমধ্যে আবার নতুন আলোর রেখা দেখা দিতে শুরু করেছে। সম্প্রতি পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের (এফপিএফ) সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসা প্রকাশ্যেই বলেছেন, আগামী নভেম্বরের আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে রোনালদোকে তারা ফিরিয়ে আনতে চান। শারীরিক সক্ষমতা ঠিক থাকলে এবং গোল করার ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে জাতীয় দলের জার্সিতে তার ফেরার দরজা যে বন্ধ হয়নি, কোচ জেসুসও তেমন ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন।
আপাতত ১০০০ গোলের অনন্য ইতিহাস স্পর্শ করা থেকে মাত্র ১৯ কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছেন রোনালদো। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে সৌদি প্রো লিগের আল-নাসরকে নিজের নতুন ঠিকানা বানিয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। মরুর বুকে যেমন তিনি দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছেন, তেমনি নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছেন এক নতুন সংস্কৃতির আবেগ ও শ্রদ্ধায়।

